হারুন মোল্লার বিবিধ জীবন – তাসরুজ্জামান বাবু

উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের তৃতীয় তলার একটি ধূসর কম্পিউটারের সামনে বসে হারুন মোল্লা প্রথম জানতে পারলেন, তিনি ইতোমধ্যেই মারা গেছেন। তার বয়স তখন সাতষট্টি, দাঁতের মধ্যে পান লেগে ছিল, ডান হাঁটুতে ব্যথা ছিল এবং বাইরের জুন মাসের বৃষ্টি থেকে বাঁচতে তিনি যে কালো ছাতা হাতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন, ফিরে দুপুরের খাবার খাবেন বলে, সেই ছাতাটি ভাঁজ করে চেয়ারটির পাশে রাখা ছিল। জীবিত থাকার পক্ষে এতগুলো প্রমাণ তার কাছে যথেষ্ট মনে হয়েছিল।

কিন্তু কম্পিউটারের সামনে বসা কর্মচারীটি মাউস নাড়াতে নাড়াতে বলল, ‘চাচা, আপনি তো মৃত।’

কথাটি বলার সময় তার মুখে কোনো বিস্ময় ছিল না; যেন সে বলছে, আপনার আবেদনপত্রে দুই কপি ছবি কম। হারুন মোল্লা হাসলেন। তিনি ভেবেছিলেন হাসলেই ভুল ভেঙে যাবে। কিন্তু কর্মচারীটি স্ক্রিন ঘুরিয়ে দিল। সেখানে তার মৃত্যু-তারিখ, এমনকি মৃত্যুর কারণও লেখা-বার্ধক্যজনিত।

হারুন মোল্লা তার দিকে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ‘কিন্তু বাবা, দেখতেই তো পাচ্ছ আমি মরিনি।’

কর্মচারীটি এবার খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘সিস্টেমে যেটা আছে, সেটাই ধরতে হবে। আপনার জীবিত থাকার প্রত্যয়নপত্র ছাড়া আর পেনশন উঠাতে পারবেন না।’

তা তুলতে তিনি নির্বাচন অফিসে গিয়ে দেখলেন, তার জাতীয় পরিচয়পত্র পুরোপুরি সচল। আঙুলের ছাপ মেলানো হলো, চোখের মণি স্ক্যান করা হলো এবং যন্ত্রটি ছোট্ট সবুজ আলো জ্বালিয়ে বলল : ম্যাচড।

ততক্ষণে হারুন মোল্লা কিছুটা মুষড়ে পড়েছিলেন বলেই সম্ভবত নির্বাচন কর্মকর্তা তাকে চাঙা করার চেষ্টা করলেন। তিনি হাসিমুখে জানালেন, ‘আপনি একশ ভাগ জীবিত ভোটার।’

হারুন মোল্লার মন কিছুটা ভালো হলো। তিনিও পালটা হেসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘একশ ভাগের বেশি জীবিত হওয়া যায়, স্যার?’

কিন্তু কর্মকর্তা তার সঙ্গে রসিকতায় যোগ না দিয়ে দরাজ গলায় হাঁক ছাড়লেন, ‘নেক্সট।’

হারুন মোল্লা বাইরে দণ্ডায়মানদের সুযোগ দিতে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে জন্মনিবন্ধন অফিসে গেলেন। সেখানে গিয়ে আরেক বিপরীত ‘সত্য’-এর মুখোমুখি হলেন। সেখানকার নথি অনুসারে দেখা গেল তিনি কখনো জন্মানইনি। ইউনিয়ন পরিষদের পুরোনো খাতায় তার বাবার নাম আছে, ভাইয়ের নাম আছে, এমনকি তার থেকে তিন বছর আগে মারা যাওয়া এক বোনের জন্মও আছে; শুধু মাঝখানের যে পাতায় তার নাম থাকার কথা, সেটি অস্বাভাবিকভাবে সাদা।

ইউপি সচিবকে এই নিয়ে জিজ্ঞেস করতে গেলে তিনি বললেন, ‘লাঞ্চের পরে আসেন।’

হারুন মোল্লার আর বাসায় লাঞ্চ করা হলো না। স্ত্রী হালিমা বেগমকে ফোন দিয়ে বললেন, ফিরতে দেরি হবে, তারা যেন খেয়ে নেয়। লাঞ্চের পর ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের রুমে ঢুকে তিনি কসম কেটে বললেন যে তিনি জন্মেছেন। প্রমাণ হিসাবে মায়ের বর্ণিত কথাও উদ্ধৃত করতে বাদ রাখলেন না : তার জন্ম হয়েছিল অমাবস্যার রাতে। সেরাতে ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ছিল, আর দাইমা তাকে কাপড়ে জড়িয়ে বলেছিল, ‘এ ছেলে জেদি হবে।’

ইউপি সচিব জানালেন, তিনি হারুন মোল্লার কথা অবিশ্বাস করছেন না, কিন্তু সমস্যা হলো সরকারি কাগজে দাইমার ভবিষ্যদ্বাণী লেখার জন্য কোনো পৃথক ঘর বরাদ্দ নেই।

এরপর ভূমি অফিসে সমস্যা আরও গভীর হলো। সেখানে হারুন মোল্লার বাবার নামের ঘরে লেখা : হারুন মোল্লা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের কাছে তিনি নিজের বাবা। তহশিলদার অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘ডেটা মাইগ্রেশনের সময় লুপ হয়েছে মনে হয়।’

হারুন মোল্লা বললেন, ‘আমি কি তাইলে নিজের উত্তরাধিকারী হইতে পারুম, স্যার?’

তহশিলদার বলল, ‘আইনের লোক ছাড়া বলা কঠিন।’

সেদিন বিকাল ৫টার পরে বাড়ি ফিরে তিনি দেখলেন তার স্ত্রী হালিমা বারান্দায় বসে কাঁদছে। হারুন মোল্লা অবাক হয়ে কী হয়েছে জানতে চাইলেন।

হালিমা মাথা তুলে তার দিকে তাকাল, কিন্তু চোখে স্বামীকে চেনার বদলে মৃত মানুষের ছবি দেখার মতো আতঙ্ক। বলল, ‘তুমি জিন্দা আছ? এত বছর পর কোত্থেকে আইলা? আইলা তো আইলা, তয় এমন ঝাপসা ক্যান?’

হারুন মোল্লা বুঝলেন, হিসাবরক্ষণ অফিস তার যে মৃত পরিচয় সৃষ্টি করে দিয়েছে, সেটি তার ঘরে ঢুকে পড়েছে। পরদিন নির্বাচন অফিস থেকে জীবিত ভোটার হওয়ার প্রত্যয়নপত্র এনে তিনি হালিমার সামনে রাখলেন।

হালিমা তার সঙ্গে অতি স্বাভাবিকভাবে বাতচিৎ করতে লাগল। হারুন মোল্লা কাগজটির ক্ষমতা পরীক্ষা করতে সেটি আবার ভাঁজ করে পকেটে রাখলেন। কয়েক মিনিট পর হালিমা জানাল, তার চোখে হারুন মোল্লা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছেন।

তিনি তাড়াতাড়ি কাগজটি টেবিলে খুলে রাখতেই হালিমা বলল, ‘এবার ঠিক আছে।’

সেই রাত থেকে তাদের সংসারে একটি নতুন নিয়ম চালু হলো; হারুন মোল্লা ঘুমোতে গেলে জাতীয় পরিচয়পত্রটি বালিশের নিচে রাখতেন।

নিজের জন্ম ফেরত আনার জন্য তিনি ইউনিয়ন পরিষদে আবেদন করলেন। সাক্ষী হিসাবে এলেন তার বড় ভাই, স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, আর গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক দাইমা জরিনা বেওয়া। সাক্ষীসাবুদের পর তার নতুন জন্মনিবন্ধন তৈরি হলো। তারিখ বসানো হলো স্কুলের পুরোনো সনদ অনুযায়ী। সনদে সিল পড়ার সঙ্গে সঙ্গে হারুন মোল্লার হাঁটুর ব্যথা এক মুহূর্তের মধ্যে চলে গেল, তিনি চমকে উঠে দাঁড়ালেন। বাড়ি গিয়ে দেখলেন তার বড় মেয়ে নাজমা তার থেকে বয়সে মাত্র বছর দশেকের ছোট হয়ে গেছে। কারণ নাজমার জন্মতারিখ অপরিবর্তিত, কিন্তু বাবার নতুন জন্মতারিখ পনেরো বছর এগিয়ে গেছে।

পরদিন তাকে আবার জন্মতারিখ সংশোধন করতে যেতে হলো। এবার স্কুলের সনদ, ভোটার তালিকা, চাকরির বহি এবং দুটি পুরোনো রেশন কার্ড মিলিয়ে ‘সম্ভাব্য’ জন্মদিন নির্ধারণ করা হলো। প্রতিবার তারিখ বদলানোর সঙ্গে হারুন মোল্লার শরীর কয়েক মাস বা কয়েক বছর এগিয়ে-পিছিয়ে যাচ্ছিল। একবার তিনি অফিস থেকে বের হয়ে দেখলেন তার চুল কালো; আরেকবার সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামতেই আবিষ্কার করলেন দাঁতের একটি মাড়ি ফাঁকা। তিনি বুঝলেন, রাষ্ট্র তার বয়স গণনা করছে না, বয়স নির্মাণ করছে। শেষমেশ তার এমন একটি বয়স ধার্য হলো যেটিতে তার চুল কালো রইল, মাড়িতে সবকটি দাঁতও টিকল, তবে হাঁটুর ব্যথা বাদ দেওয়া সম্ভব হলো না।

ওদিকে ভূমি অফিসে নিজের বাবা হওয়ার ভুলটি সংশোধন করতে গিয়ে আরেক বিপদ হলো। তার পিতার প্রকৃত নাম আবদুল গনি মোল্লা। পুরোনো খতিয়ানে তা-ই ছিল। কিন্তু ডিজিটাল রেকর্ডে বহু বছর ধরে হারুন নিজেই নিজের পিতা হিসাবে থেকে যাওয়ায় জমির উত্তরাধিকার শৃঙ্খলা একটি বৃত্তে পরিণত হয়েছিল। কম্পিউটার বলছিল : হারুন মোল্লা উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পেয়েছেন হারুন মোল্লার কাছ থেকে; এবং তার মৃত্যুর পর জমি আবার যাবে হারুন মোল্লার কাছেই।

সংশোধনের আবেদনপত্র জমা দিয়ে তিনি বাড়ি ফিরে দেখলেন তার ছেলে রফিক তাকে ‘আব্বা’ বলতে গিয়ে থেমে যাচ্ছে। একবার ‘দাদা’, একবার ‘আব্বা’, তারপর আবার নাম ধরে ডাকছে। পারিবারিক অ্যালবামে তিন প্রজন্মের মুখগুলো অদলবদল হয়ে গেছে। এক ছবিতে হারুন নিজের শৈশবের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন বৃদ্ধ হয়ে; আরেক ছবিতে তিনি তার বাবাকে কোলে নিয়ে আছেন।

হালিমা ছবিগুলো দেখে বলল, ‘কাগজের ভুল ঘরে ঢুকে গেছে।’

হারুন মোল্লা আর চুপ থাকতে পারলেন না। উকিল মারফত হাইকোর্টে রিট করলেন; হারুন মোল্লা বনাম রাষ্ট্র। প্রথম শুনানিতেই রাষ্ট্রপক্ষ আপত্তি তুলল এই বলে যে আবেদনকারী আইনগতভাবে কে, সেটাই নির্ধারিত নয়। মৃত ব্যক্তি রিট করতে পারেন না, অজন্মা ব্যক্তি লোকাস স্ট্যান্ডি অর্জন করেন না, আর নিজ পিতা নিজেই হলে উত্তরাধিকার সম্পর্কও অস্পষ্ট।’

বিচারপতি চশমা খুলে কিছুক্ষণ হারুনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি নিজে কী বলেন, আপনি আসলে কে?’

হারুন মোল্লা এতদিন এই প্রশ্নের উত্তর সহজ ভাবতেন। তিনি বলতেন, আমি হারুন। আবদুল গনির ছেলে, হালিমার স্বামী, নাজমা আর রফিকের বাবা, অবসরপ্রাপ্ত হিসাব সহকারী, চর কুকরি-মুকরির বাসিন্দা।

কিন্তু আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, ‘হুজুর, আমার চার-পাঁচটা অস্তিত্বের মধ্যে কোনটা যে এই মুহূর্তে আপনার সামনে দাঁড়াইছে তা আমি নিজেও গুলায়ে ফেলতেছি।’

বিচারপতি হতাশ হয়ে বললেন, ‘রাষ্ট্র একজন মানুষের একাধিক পরিচয় স্বীকার করে না, আপনাকে যে কোনো একটি বেছে নিতে হবে।’

এরপর আদালত চার দপ্তরকে মূল নথি হাজির করতে বলল। এক মাস পরে টেবিলের ওপর চারটি সত্য এসে জমা হলো। হিসাবরক্ষণ দপ্তরের সত্য হারুন মৃত, নির্বাচন কমিশনের সত্য তিনি জীবিত, জন্মনিবন্ধনের সত্য তিনি বিলম্বে জন্মেছেন, ভূমি দপ্তরের সত্য তিনি নিজের পিতা। প্রত্যেক নথিতেই সিল ছিল, স্বাক্ষরও ছিল।

অতঃপর বিজ্ঞ বিচারপতির নির্দেশে সরকার হারুন মোল্লার একটি মাত্র সরকারি জীবন নির্ধারণ করতে ‘একক নাগরিক সত্যায়ন কমিটি’ গঠন করল। সাত দিনের মধ্যে সব প্রমাণ চাওয়া হলো। হারুন একটি লোহার ট্রাঙ্কে করে নিয়ে গেলেন বাবার হাতের লেখা চিঠি, মায়ের পুরোনো তসবিহর থলে, কাবিন, প্রথম বেতনের রসিদ, ছেলের জন্মের হাসপাতাল স্লিপ, হালিমার সঙ্গে সাদা-কালো ছবি এবং নিজের মৃত্যুসনদের সত্যায়িত ফটোকপি।

কমিটির চেয়ারম্যান বললেন, ‘এগুলোর মধ্যে কোনটা আসল? সিস্টেমে একটি মাস্টার রেকর্ড লাগবে।’

হারুন মোল্লা বসলেন, ‘আমি আর পারতেছি না স্যার, আপনারাই আসলটা ধার্য করে দেন।’

কমিটি একে একে ভুলগুলো সংশোধন করতে শুরু করল। প্রথমে মৃত্যুসনদ বাতিল হলো। পরে হালিমা বলেছিল, সেসময় তার বুকটা হালকা লেগেছিল। হারুন বুঝলেন, ভুল নথিটিও এতদিন একটি গুমোট শোকানুভূতি সৃষ্টি করে রেখেছিল।

এরপর জন্মতারিখ এক করা হলো। তার মুখে বয়স স্থির হলো। ভূমি রেকর্ডে পিতার নাম ঠিক হলে অ্যালবামের অসম্ভব ছবিগুলো স্বাভাবিক হয়ে গেল, অথচ হারুন সেই ছবিগুলোর জন্য হঠাৎ শোক অনুভব করলেন। কারণ সেখানে তিনি একবার নিজের বাবাকে কোলে নিয়েছিলেন-অসম্ভব হলেও সেই মুহূর্তটি তার স্মৃতিতে সত্য ছিল।

তিনি কমিটিকে বললেন, ‘থামেন। সব ঠিক কইরেন না।’

কমিটির সদস্যরা যেভাবে তার দিকে তাকালেন তাতে হারুন মোল্লা বুঝলেন তারা তাকে উ™£ান্ত ঠাউরাচ্ছেন।

হারুন বললেন, ‘আপনারা ভুল ঠিক করতে করতে আমার জীবনের যেসব অংশ ভুলের ভেতর জন্মাইছিল, সেগুলাও মাইরা ফেলতেছেন। কিন্তু এতদিনে সেসবও তো আমি!’

একজন সদস্য বললেন, ‘কিন্তু প্রশাসন মানুষের কন্ট্রাডিকশন রাখতে পারে না।’

হারুন উত্তর দিলেন, ‘তাইলে আমারে তেঁতুলিয়া নদী মনে করেন স্যার। তার মতো আমারে ডাকেন, ইলশা, বুড়াগৌরাঙ্গ-যা মন চায়। তবু আমারে মাইরেন না।’

‘তাহলে আপনি রিট করলেন কেন?’

‘রিট করে ভুল করছি স্যার, রিট তুইলা নিমু। তবু দোহায় লাগে, আমারে মাইরেন না।’