ফেনীর এদিকটায় আকাশ বিকেলের দিকে অদ্ভুত রকম নরম হয়ে আসে। রোদ তখন আর চোখ ঝলসায় না, বরং মনে হয়, ভরদুপুরের সব ক্লান্তি মুছে দিয়ে একটু শান্তি দিতে এসেছে এ রোদ। সেই নরম রোদে ইমরান সাহেব প্রতিদিন বিকেলে কলেজের পুরোনো মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটেন। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর এই হাঁটাই তার একমাত্র নিয়মিত অভ্যাস। হাঁটার মাঝেই তিনি জীবনের সব হিসাব মিলিয়ে নেন – কোথায় কী পেলেন, কোথায় কী হারালেন।
এক সরকারি কলেজের ইতিহাসের শিক্ষক ছিলেন ইমরান। তিনি খুব নামকরা কেউ নন, আবার অপরিচিতও নন। ছাত্ররা তাকে সম্মান করত, সহকর্মীরা দিতেন শ্রদ্ধা-ভালোবাসা। কিন্তু, আর্থিক বিবেচনায় তিনি কখনোই স্বচ্ছল ছিলেন না। শিক্ষকতার বেতন দিয়ে সংসার চালানো, সন্তানদের পড়ানো, আত্মীয়স্বজনের দায়িত্ব পালন – সব মিলিয়ে জীবনের নড়বড়ে গাড়িটা কোনোমতে চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি।
স্ত্রী রওশন আরা ছিলেন নীরব প্রকৃতির মানুষ। তাঁকে স্বামীর সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলতে কেউ কখনো শোনেনি। পরিশ্রমী মানুষ – সংসারের প্রতিটি কোণায় তার হাতের ছোঁয়া ছিল। সীমিত আয়ের মাঝেও কীভাবে সংসার সাজাতে হয় তা তিনি জানতেন। স্বামীর কষ্ট বুঝে কখনো তাঁর কাছে অপ্রয়োজনীয় আবদার করতেন না রওশন। নিজ আগ্রহে স্বামী কিছু কিনে না দিলে ঈদের বাজারেও যেতেন না রওশন।
এ দম্পতির দুই সন্তান – মেয়ে শীলা আর ছেলে আসিফ। ইমরান সাহেব স্বপ্ন দেখতেন, তার সন্তানরা পড়াশোনা করে এমন কিছু করবে যাতে তারা সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে; তাদের সংসারে অভাব বলে কিছু থাকবে না। কিন্তু, বাস্তবতা সব সময় স্বপ্নের অনুকূলে থাকে না।
শীলা পড়াশোনায় খুব একটা মনোযোগী ছিল না। এসএসসি পাশ করার পরই সে তার পছন্দের এক ছেলের সাথে বিয়ের আগ্রহ দেখায়। মা রওশন আরা এতো কম বয়সে বিবাহের সম্পর্কে না জড়াতে অনেক বোঝালেন, কিন্তু মেয়ের জেদ আর সমাজের চাপ – দুটো মিলিয়ে শেষমেশ তাকে ওই ছেলের সাথেই বিয়ে দিতে হলো। ইমরান সাহেব মনে মনে কষ্ট পেলেও কিছু বললেন না। মেয়ের সুখই তার কাছে বড় ছিল।
ছেলে আসিফেরও পড়াশোনায় আগ্রহ তেমন নেই। সে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেই ঢাকায় এক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির চাকরিতে যোগ দিলো। সেও তার পছন্দের এক মেয়েকে বিয়ে করে ঢাকা শহরেই থাকে। তার স্ত্রী এক বায়িং হাউজের রিসিপশনে কাজ করে। কাজের চাপের তুলনায় দুজনেরই বেতন কম। এ অবস্থায় মাস শেষে পরিবারের একমাত্র ছেলে হয়েও বাবাকে কিছু টাকা পাঠাতে পারত না বলে সে নিজেই লজ্জা পেত। ইমরান সাহেবও কখনো টাকা পাঠাতে ছেলেকে চাপ দেননি। বরং তিনি বলতেন, ‘তোমার নিজের সংসার ঠিক রাখো বাবা; তাতেই আমরা খুশি।’
এমনই জরাজীর্ণ অবস্থার মধ্যে ইমরান সাহেবের জীবনে আসে আরও বড় দায়িত্ব – তার বড়ো ভাইয়ের পরিবার। বড়ভাই হাশেম ছিলেন গ্রামের মাদ্রাসার শিক্ষক। একদিন হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। রেখে যান স্ত্রী আর একমাত্র ছেলে অরুনকে। অরুন কেবল ক্লাস ফাইভে পড়ে সে সময়।
বড়ো ভাইয়ের স্ত্রী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন পুরোপুরি। সে অবস্থায় কে কীভাবে এ পরিবারের দায়িত্ব নেবে তা নিয়ে বিস্তর শলাপরামর্শ চলছিল নিকটাত্মীয়দের মাঝে। কিন্তু আলোচনাই সার – কাজের কাজ খুব কিছু কেউ করেনি।
অরুনের তিন মামার একজন থাকেন আমেরিকায়। তিনি নিজেথেকেই বলেছিলেন, ভাগিনা, মানে অরুনকে, সহসাই তিনি আমেরিকা নিয়ে যাবেন। সবাই তাতে খুব খুশিও হয়েছিল। কিন্তু, মামীর বাধায় সে পরিকল্পনা হতে শেষতক মামাকে ফিরে আসতে হয়েছিল। মামী তার নিজের ভাগিনাকে আগে আমেরিকা নেবার দাবি তোলেন।
ইমরান সাহেব আর দেরি করলেন না। তিনি অরুনকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখে মানুষ করেছেন। নিজের সংসারে আর্থিক টানাপোড়েন থাকলেও তিনি অরুনের পড়াশোনায় কখনো কমতি রাখেননি। তাকে প্রয়োজনমতো প্রাইভেট টিউটরও দিয়েছেন। অরুনকে নিজের কাছে আনার পর সংসারে কিছু বাড়তি আয় জোগাতে তিনি কলেজের চাকুরীর পরে টিউশনিও করেছেন।
অরুন ছিল শান্তশিষ্ট, ভদ্র, আর বইপ্রেমী ছেলে। ইমরান সাহেব রাতে পড়তে বসলে অরুন পাশে এসে বসত। ইতিহাসের গল্প শুনতে তার খুব ভালো লাগত। বড়ো হয়ে কি হতে চাস? – চাচার তেমন প্রশ্নের উত্তরে একদিন অরুন বলেছিল, ‘আমি বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হব।’
উত্তর শুনে ইমরান সাহেব সেদিন মৃদু হেসে অরুনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন। নিজের সন্তানদের মধ্যে যে স্বপ্নটা দেখতে ব্যর্থ হয়েছেন সে স্বপ্নই দেখতে শুরু করলেন ভাতিজা অরুনের মধ্যে। অরুনের চোখেমুখেও ছিল ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা আর আত্মবিশ্বাস। ইমরান সাহেব নিশ্চিত জানতেন, এই ছেলে একদিন ঠিকই ইঞ্জিনিয়ার হবে, তাঁর আশা পূরণ করবে।
২.
অরুন বড় হলো। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় – একে একে সব ধাপ পেরিয়ে একদিন সে সত্যিই প্রকৌশলী হলো। ফেনীর যে গ্রামে তাদের বসবাস সেখানে রীতিমতো আনন্দের বন্যা বয়ে গেলো। গ্রামের সবাই বলাবলি করছে, ‘প্রফেসর ইমরানের ভাতিজা ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে।’
ওই এলাকায় অরুনের আগে কেউ ইঞ্জিনিয়ার হননি তা নয়, কিন্তু, খুব অল্প বয়সে বাবা মারা যাওয়ায় একপ্রকার অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি হওয়া অরুনের বিষয়টি বেশ আলোচনায়। ইমরান সাহেবেরও আনন্দের সীমাপরিসীমা নেই। কারন, তিনি তাকে নিজের ছেলেই মনে করতেন। সে অর্থে এ সফলতা তাঁর নিজেরও।
ভালোভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করায় অরুনের চাকুরী পেতে দেরি হলোনা। চাকুরীর বছর না পেরুতেই বিয়ে করল সহপাঠী রুমাকে। রুমা আধুনিক, শিক্ষিত, শহুরে মনমানসিকতার মেয়ে। সে অরুনের চাচা ইমরান সাহেবের প্রতি বেশ শ্রদ্ধা-ভালোবাসাই দেখাতো। ইমরান সাহেবও বরাবরই তাদের প্রাণঢালা স্নেহ ভালোবাসা দিতেন।
দিন যায়, মাস যায়, সময় গড়াতে থাকে। একসময় ইমরান সাহেব অবসর নিলেন। অবসরের পরপরই যেন জীবন তাকে আরেক দফা পরীক্ষায় ফেলল। স্ত্রী রওশন আরা ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেন। চিকিৎসা চলল মাসের পর মাস। একসময় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হলো, উন্নতি না হওয়ায় আবার ফেনীতে ফেরানো হলো। খরচ জোগাতে ইমরান সাহেব প্রায় সবকিছুই বিক্রি করে দিলেন – জমিজমা, এমনকি স্ত্রীর গয়নাও।
কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়না। এক বর্ষার রাতে রওশন আরা চলে গেলেন। ইমরান সাহেব প্রথমবার জীবনে এতটা অসহায় বোধ করলেন। ঘরের ভেতর কেবলই নীরবতা – ভাতের হাঁড়ি নামানোর শব্দ নেই, চা দেওয়ার ডাক নেই। দিনের বেলাটা কোনপ্রকারে পার করা গেলেও রাতগুলো সবচেয়ে কঠিন ছিল তার কাছে – কয়েকঘন্টার রাত যেন কয়েকবছর। বইপড়া তাঁর দীর্ঘ অভ্যাস, তাতেও মনে বসেনা আজকাল।
সন্তানরা বলল, তিনি যেন আবার বিয়ে করেন। প্রথমে তিনি রাজি হননি। কিন্তু বয়স যতই বাড়ছিল শরীরও ততো দুর্বল হতে থাকে। অন্যের সাহায্য তাঁর না হলেই নয়। বিবাহের প্রয়োজনীয়তা তিনিও ধীরে ধীরে অনুভব করতে লাগলেন।
অবসরের পরপর, পুনর্বিবাহের আগে, তিনি একবার ঢাকায় অরুনের বাসায় গিয়েছিলেন। সেই একবারই কেবল অরুন দম্পতির সাথে তাঁর দেখা। অরুনরা তাকে দেখতে একবার ফেনী এসেছিল তাদের বিবাহের কিছুদিন পর। তাদের আর ফেনী আসা হয়ে উঠেনি। আক্ষরিক অর্থেই তাঁর দেখভাল করার মতো কেউ বাসায় নেই। তিনি একেবারেই একা।
বোনের অনুরোধে শেষতক তিনি আবার বিবাহে রাজি হলেন। সালমা নামের এক বিধবাকে তিনি বিয়ে করলেন। সালমার বয়স ইমরান সাহেবের তুলনায় অনেক কম; মাত্র তেতাল্লিশ। ওদিকে ইমরান সাহেবের ষাট পেরিয়ে গেছে – চুলদাড়ি পেকে সাদা।
রাজধানীর ব্যস্ত জীবনের সাথে তাল মিলিয়ে অরুন-রুমা দম্পতিরও ব্যস্ততার শেষ নেই। দুজনই চাকুরী করে। কাজের বুয়া থাকলেও তার উপর পুরোপুরি নির্ভর করা যায়না। মাঝেমাঝে আগাম কিছু না বলেই অনুপস্থিত থাকে। বকা দেবারও সুযোগ নেই – রেগে গিয়ে পাছে চাকুরী ছেড়ে দে! ডিগ্রিধারীদের চেয়েও ঢাকা শহরে ওদের চাকুরী পাওয়া অনেক সহজ।
শত ব্যস্ততায়ও জীবন নিজ গতিতেই চলে। রুমা অন্তঃসত্ত্বা হয়। তিন কি চার মাসের মাথায় ডাক্তার জানালেন ওদের ছেলে সন্তান হবে। আনন্দে অরুন যেন আকাশে উড়ছিল। রুমা আরো বেশি খুশি। কারণ, তার বড়োবোনের একে একে চার কন্যা হয়েছে। রুমার মায়েরও কোন ভাই ছিল না। সবমিলিয়ে, ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়ে রুমা ওই পরিবারে রীতিমতো ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায়।
অরুন-রুমার এ উল্লাসের মাঝেই একদিন ইমরান সাহেব তাঁর নতুন স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় অরুনদের বাসায় গেলেন। অনেকদিন দেখা হয়নি তাদের। ধানমন্ডির বাসায় পৌঁছেই অরুণদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন ওদের নতুন চাচীকে। হাসিমুখে বললেন, ‘এই তোমাদের নতুন চাচী।’
৩.
তারা দুজনই চাচীকে সালাম দেয়। রুমা মৃদু হাসে, কিন্তু তার চোখেমুখে ছিল এক ধরণের অস্বস্তি। গর্ভাবস্থার ক্লান্তি, মানসিক চাপ – সব মিলিয়ে নিজেকে গুছিয়ে রাখতে পারছিল না রুমা। তার শরীরের এ অবস্থায় সে হয়তো নতুন কোন মেহমানের আগমন প্রত্যাশা করেনি তাদের বাসায়। সাতমাসের গর্ভাবস্থা তার।
চা-নাস্তা দেওয়া হলো তাদের; কিন্তু,পরিবেশটা ছিল কেমন যেন থমথমে। অরুন কয়েক মিনিট তাদের সাথে ড্রইং রুমে বসে তারপর ভেতরের রুমে চলে গেল। এর পর প্রায় আধঘন্টা তার খবর নেই। রুমা তো সালাম বলে সেই যে ভেতরে ঢুকল মেহমানদের দিকে আর ফিরেও তাকালো না। ইমরান-সালমা দম্পতি এক ধরণের অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন। দ্বিধায় পড়লেন তাঁরা বসবেন, না চলে যাবেন।
ভেতরের রুমে অরুন-রুমার মৃদু গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। রুমা অরুনকে বলে, ‘উনারা বেড়াবার আর সময় পেলেন না, আমার এই শারীরিক অবস্থায় কিভাবে তাদের আদর আপ্যায়ন করবো? তুমি বলে দাও, এখানে রাতের খাবারটা খেয়ে হোটেলে উঠতে।’
‘বলো কি রুমা, উনি আমার বাবার মতো, আমাকে পুত্রস্নেহে মানুষ করেছেন। তাকে এমন কথা বলি কি করে?’
‘ঠিক আছে, না বলতে চাইলে আমাকে উত্তরায় আমার বোনের বাসায় পাঠিয়ে দাও; আর, তুমি ওদের মাথায় নিয়ে নাচ। আমি কিচ্ছু করতে পারবো না বলে দিলাম।’
রুমা মেয়েটা সচরাচর চাপা এবং চুপচাপ স্বভাবের। হিসেবের বাইরে কথা বলে না, কারো সামনে সহজে মুখও খোলে না। এসব কারণে চারিদিকে তার বেশ সুনাম। কিন্তু, সে একইসাথে বেশ স্বার্থপর আর কৃপণ স্বভাবেরও। তার বাবাও একই প্রকৃতির – কাড়িকাড়ি টাকা, অথচ, দশ টাকা খরচ করতেও বিশবার ভাবেন।
অরুনের পক্ষের কেউ বেড়াতে এলে নানা কথা বলে রুমা স্বামীর কান ভারী করে। প্রেমে অন্ধ অরুনও ভালোমন্দ বাছবিচার না করে রুমার আদেশ নীরবে পালন করে যায় – যেন সে তার অধীনে চাকুরী করা গোলাম।
স্ত্রীর সমর্থন না পেয়ে অগত্যা অরুন তার ফুফু সাজুকে ফোন দিয়ে বলে, ‘ফুফু, আমাদের অবস্থা তো তুমি জানো, ওর এখন সাতমাস; তুমি চাচ্চুকে ফোনে বলে দাও কোন একটা হোটেলে উঠতে।’
ফুফু বললো, ‘কেন, তোদের কাজের বুয়া নেই? রান্না তো বুয়া করবে, সমস্যা কি? তোরা কি না খেয়ে আছিস? রুমার চাচা-মামাদের কেউ আসলে কি এভাবে তাড়িয়ে দিতে পারতি? তোর শশুর শাশুড়ি আর শ্যালিকা তো গতমাসেই তোদের ওখানে দশদিন থেকে এসেছে, আমরা কি ওসব জানিনা মনে করছিস? রুমাকে ফোনটা দে, ওর সাথে কথা বলি।’
অরুনের পাশেই শুয়ে থাকা রুমা অরুনকে ইশারায় কিছু একটা বলে। তার ইঙ্গিতগুলো এতটাই দুর্বোধ্য যে একমাত্র অরুন ছাড়া অন্য কেউ তা সহজে ধরতে পারেনা। রুমার বার্তা পেয়েই অরুন তার ফুফুকে জবাব দেয়, ‘রুমা ঘুমায়, ওর শরীর ভালো না।’
‘বলিস কি, বাসায় মেহমান বসে আছে, এ অবস্থায় ও ঘুমাবে কেন? বাচ্চাকাচ্চা কি পৃথিবীতে আর কারো হয়নি?’ – ওপ্রান্তে রাগে ফেটে পড়ে ফুফু সাজু।
‘তোমার সাথে তর্ক করতে ফোন করি নাই ফুফু, তুমি চাচ্চুকে না বললে আমি বলতে বাধ্য হবো – তুমি কি তা চাও?’ – রুমার স্ফীত পেট আর বক্ষমূলে আলতো করে ডান হাত বুলাতে বুলাতে অরুন ফুফুকে জবাব দেয়। রুমা মনোযোগ দিয়ে খুব কাছ থেকে ওদের ফোনালাপ শোনে।
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে; আমিই তোর চাচ্চুকে বলছি যেন তারা এক্ষুনি তোদের বাসা ছাড়ে। ‘
সাজু কথা না বাড়িয়ে সরাসরি বড়োভাই ইমরানকে ফোন করে বলে, ‘ভাইজান, আপনি এক্ষুনি ওদের বাসা ছেড়ে একটা হোটেলে উঠুন। অরুনের বউ অসুস্থ, এ অবস্থায় নতুন ভাবীকে নিয়ে ওদের ওখানে যাওয়া ঠিক হয়নি। … হাতে টাকা না থাকলে বলেন, আমি বিকাশ করে কিছু টাকা পাঠাই।’
ফোন রেখেই ইমরান সাহেব স্ত্রীকে নিয়ে চুপচাপ বেরিয়ে গেলেন। উঠলেন এক সস্তা হোটেলে। অরুন বা তার স্ত্রী রুমা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করলো – একবারও তাদের বাসা হতে বেরিয়ে যেতে বারণ করলো না। তাঁরা চলে যাবার সময় মাথায় ঘোমটা দিয়ে রুমা চাচাচাচির পা ছুঁয়ে সালাম করলো যদিও, যেন গরু মেরে জুতাদান।
৪.
হোটেলের বেডে ইমরান সাহেব শুয়ে ছিলেন নির্জীবের মতো। তাঁর চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল অরুনের ছোটবেলার নানা স্মৃতি। একইসাথে ভাবছিলেন, তিনি কি অতীতে কোথাও কোনো ভুল করেছিলেন, যে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত তাঁকে করতে হচ্ছে?
জানালার পর্দা গলে চাঁদের আলো এসে পড়েছে তাঁদের বেডরুমের সাদা দেয়ালে। লম্বা রশির মতো দুলছে সে আলো। দেয়ালের নিচের দিকে মেঝের কাছাকাছি ফিকে হয়ে যাওয়া সে আলোতে ইমরান সাহেবের চোখজোড়া আটকে আছে – নিজের নড়বড়ে জীবনের প্রতিচ্ছবি যেন সেখানে দেখতে পান তিনি। চারপাশে ঘন আঁধারের ভেতরেই তাঁর স্মৃতিগুলো জেগে আছে প্রদীপ শিখার মতো – নিভু নিভু, অথচ নেভে না।
এলোমেলো ভাবনাগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় আঁধারের সমুদ্রে। একসময় চোখ দুটো ভারী হয়ে আসে তাঁর। তবু ঘুমের আগমুহূর্তে ইমরান সাহেব অনুভব করেন, রাজধানীর জনসমুদ্রের মাঝেও আজকের এই ‘একাকী’ রাতটিই তার জীবনের সবচেয়ে সৎ সঙ্গী – যেখানে কোনো ভানভনিতা নেই, নেই তাড়াহুড়া; আছে শুধু নিঃশব্দ রাতের দীর্ঘ সংলাপ যার সাক্ষী তিনিই কেবল।
সালমাও যা বুঝার বুঝে নিয়েছেন। তিনি ইমরানের চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটাননি, বরং, ওপাশ ফিরে তার মতো একা হয়ে একসময় ঘুমিয়ে পড়েন।
৫.
এ ঘটনার মাস দুয়েকের মাথায় অরুন-রুমার ঘর আলো করে এক ফুটফুটে কন্যা সন্তান এলো।
অরুন হতবাক। রুমা নির্বাক। তারা একে অন্যের দিকে প্রশ্নবোধক চোখে তাকায়। হিসাব মেলাতে পারেনা তারা। এমনটি হবার তো কথা ছিল না!
যাক, যা হবার হয়ে গেছে। সন্তান তো সন্তানই। অবশেষে, মেয়েকে বরন করে নিলো এ তরুণ দম্পতি, যদিও অবাক করা প্রশ্নটি দুজনের মাথায় ঘুরপাক খেতেই থাকে।
একদিন রুমা ধীরে ধীরে অরুনের চাচা, মানে, ইমরান সাহেবের প্রসঙ্গ তুলে অরুনকে বলে, ‘চাচাকে সেদিন সেভাবে হোটেলে চলে যেতে না বললেও পারতে – উনি বোধ হয় মনে বেশ কষ্ট পেয়েছিলেন।’
‘এদ্দিন পর এসব বলছো কেন? ও ব্যাপারে তোমাকে কেউ কিছু বলেছে নাকি?’
‘না।’
‘তাহলে?’
‘কিছু না, এমনি বলছিলাম।’
রুমার চোখে চোখ রেখে অরুন বলে, ‘রুমা, তোমাকে চিনি অর্ধযুগেরও বেশি হয়ে গেলো, তুমি তো এমনি এমনি কিছু বলার মতো মেয়ে না; কিছু একটা কারন আছে যা আমাকে হয়তো বলতে চাইছো না।’
‘তা আছে বটে।’
‘তাহলে বলে ফেলো’
চুলের জোড়া বিনুনিতে ডানহাতের তর্জনী পেঁচাতে পেঁচাতে রুমা বলে, ‘ভাবছিলাম আমাদের বাবুর কথা। ছেলে বাবুটা কেমন করে মেয়ে বাবু হয়ে গেলো দেখলে তো।’
‘মানে?’
‘ভাবছি, চাচার মনে কষ্ট লেগে এমনকিছু হয়নি তো? .. আচ্ছা, চাচার অভিশাপে আমাদের যদি আমার আপার মতো মেয়ের পর মেয়েই হতে থাকে তবে কেমন হবে বলতো?’
চুপচাপ গম্ভীর হয়ে অরুন রুমার আশঙ্কাবাণীর মর্মার্থ বুঝার চেষ্টা করে।
৬.
তখন রোজার মাস। ঈদের ছুটির এক বিকেলে ফেনী শহরে চাচা ইমরান সাহেবের বাড়ি গিয়ে অরুন তাঁর পায়ে পড়ে অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকে। রুমার চোখেও পানি।
ঘটনার আকস্মিকতায় ইমরান সাহেব এবং তাঁর স্ত্রী কি বলবেন স্থির করতে পারেননা। তাঁরা ধরতে পারেননা এদের এতো কান্নাকাটির রহস্যটা কোথায়? তাঁরা বিচলিত হন যথারীতি।
অরুনের হাত ধরে মাটি থেকে তুলে নিয়ে ইমরান সাহেব তাকে চেয়ারে বসতে বললেন। কিন্তু, অরুন সহজে পা ছাড়েনা। সে বলে, ‘চাচ্চু, আমাদের মাফ করে দিন, আপনার বদদোয়া লেগেছে আমাদের উপর, আমরা অভিশপ্ত হয়েছি, আমাদের মাফ করে দিন প্লীজ।’
চাচা বলেন, ‘কিরে, এসব কি বলিস? আমি তোদের বদদোয়া দিতে যাবো কেন? তুই তো আমার ছেলের মতোই – তোকে না কোলেপিঠে করে মানুষ করেছি! তোর পেচ্ছাবের গন্ধ তো আজো আমার বুকে লেগে আছে।’
রুমা বলে, ‘চাচা, ডাক্তার বলেছিলেন আমাদের ছেলে বাবু হবে, কিন্তু কি হলো তো দেখলেন … আপনি নিশ্চয়ই সেদিন মনে কষ্ট পেয়েছিলেন।’
চাচা বলেন, ‘কী সব আজেবাজে কথা বলছো তোমরা? তোমরা না শিক্ষিত মানুষ – ইঞ্জিনিয়ার? ইঞ্জিনিয়াররা এতো বোকা হয় জানতাম না তো! … ডাক্তারের কি ভুল হতে পারেনা? তাছাড়া, ছেলে কি মেয়ে হবে সবই তো রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছা – তাতে তো মানুষের কোন হাত নেই। মেয়ে হয়েছে বলে তোমাদের অখুশি হবার কি আছে? যাই হয়েছে, বলো, আলহামদুলিল্লাহ! ছেলে হলো কি মেয়ে হলো তা বড়ো কথা নয় – আসল কথা একটা সুস্থ সবল বেবি হয়েছে কিনা সেটাই।’
তখনো ইমরান সাহেবের কোলে অরুন-রুমার ফুটফুটে বাচ্চামেয়েটি। তার ছোট্ট হাত-পা দুটির নড়াচড়া দেখে মনে হয় সে যেন পৃথিবীটাকে চেনার চেষ্টা করছে।
খানিক বিরতি নিয়ে তিনি আবার বলেন, ‘এই মেয়েটি যে জীবনে খুব বড়ো কিছু হবে না তা কি আমরা জানি? একটা সুস্থ সন্তান দিয়ে আল্লাহ তোমাদের আশীর্বাদ করেছে – মেয়ে নয়, ছেলের চোখেই তাকে মানুষ করো।’
বিকেলের আলো আরো প্রলম্বিত হয়ে ঘর ভরে ফেলেছে। সেই কোমল আলোয় যেন ইমরান সাহেবের জীবনের সব হিসাব মিটে গেল।
লেখক: কানাডীয় অভিবাসন পরামর্শক, প্রকৌশলী, কলামনিস্ট ও কথাসাহিত্যিক।