শিব্বীর আহমেদঃ নিউ ইয়র্কের আকাশটা আজ অন্যরকম। মার্চের শেষে হলেও শীতের কামড় এখনো পুরোপুরি যায়নি। তবে বাতাসে কেমন যেনো একটা অস্থির চঞ্চলতা। এই চঞ্চলতাই বলে দিচ্ছে—বসন্ত সমাগত। আর কিছুদিন পরেই বাঙালির প্রাণের নববর্ষ উৎসব। নিউইয়র্ক সহ সারাবিশ্বে বর্ষবরণের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। কুইন্স প্যালেসের বিশাল হলরুমটি আজ সেজেছে রাজকীয় সাজে। প্রবেশপথেই বড় বড় করে লেখা ‘বসন্ত বাতাস মিউজিক্যাল নাইট’। আয়োজক প্রখ্যাত শিল্পী কামারুজ্জামান বকুল। নিউ ইয়র্কের বাঙালি কমিউনিটির কাছে এই অনুষ্ঠানটি বছরের অন্যতম আকর্ষণ। হলরুমের ভেতরে ঢুকলে মনেই হবে না এটি আমেরিকার কোনো শহর। চারদিকে বাসন্তী রঙের ছড়াছড়ি। গাঁদা ফুলের সুবাস আর আড্ডার কলকাকলিতে মনে হচ্ছে ঢাকার কোনো অভিজাত উৎসব।
২১ বছরের তরুণ ফারহান। দীর্ঘদেহী, সুঠাম গড়ন আর তীক্ষ্ণ চোখের মায়ায় সে সানিসাইডের বাঙালি পাড়ায় বেশ পরিচিত। ফারহান সাধারণত এসব হইহুল্লোড় থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করে। কিন্তু বন্ধুদের জোরাজুরিতে আজ তাকে আসতেই হয়েছে। পরনে তার হালকা আকাশি রঙের একটি ব্লেজার আর সাদা শার্ট। বন্ধুদের সাথে সে যখন কুইন্স প্যালেসের ভেতরে ঢুকল, তখন সন্ধ্যা নেমেছে। হলরুমের কৃত্রিম আলো আর মানুষের রঙিন পোশাক মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করেছে। ফারহানের বন্ধু সায়মন আর রাফাত ব্যস্ত কে কোথায় আছে তা দেখতে। সায়মন খোঁচা দিয়ে বলল,
‘কিরে ফারহান, তুই তো দেখি স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে আছিস! দেখ, আজ কত সুন্দরী মেয়েরা এসেছে। নিউ ইয়র্কের সব রূপবতী আজ এই কুইন্স প্যালেসেই হাজির।’
ফারহান মৃদু হাসল, কিন্তু তার মন যেন কিছু একটা খুঁজছে। এক ধরণের অপূর্ণতা কাজ করছে তার ভেতরে। অনুষ্ঠান শুরু হতে এখনো কিছুটা দেরি। মঞ্চের এক কোণে মিউজিশিয়ানরা তাদের যন্ত্রগুলো টিউন করছেন। গিটারের টুংটাং আর তবলার চাঁটি শোনা যাচ্ছে মাঝে মাঝে। সাউন্ডগেয়ারের সায়েম সাউন্ড সিস্টেমের সাথে মিউজিশিযানদর সাথে তাল মিলিয়ে ঠিক করে নিচ্ছে শব্দের সঠিক নিয়ন্ত্রন। ঠিক সেই সময় হলরুমের এক কোণে ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসছিলেন জনপ্রিয় ফটোগ্রাফার নিহার সিদ্দিকী। তার হাতে দামী ডিএসএলআর ক্যামেরা। তিনি বেছে বেছে সুন্দর মুখগুলোকে তার ফ্রেমে বন্দী করছেন। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইট ঝলসে উঠছে মুহূর্তে মুহূর্তে। আর ঠিক সেই ক্ষণিক আলোতে উদ্ভাসিত হচ্ছে একেকটি মুখ।
হঠাৎ একটি নির্দিষ্ট দিকে নিহার সিদ্দিকীর ক্যামেরা স্থির হলো। ক্যামেরার দিক লক্ষ্য করতেই ফারহানের জগতটা যেন থমকে গেল। ফারহান দেখল, নিহার সিদ্দিকীর লেন্সের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী। যে মুহূর্তটিতে ফারহানের চোখ তার ওপর পড়ল, মনে হলো চারদিকের সব কোলাহল নিঃশব্দ হয়ে গেছে। কামারুজ্জামান বকুলের মিউজিক টিমের সুর আর কানে আসছে না, বন্ধুদের হাসি-ঠাট্টাও আর শোনা যাচ্ছে না। শুধু এক জোড়া চোখ আর এক অসামান্য রূপসী তার দৃষ্টিসীমানায় রাজত্ব করতে শুরু করছে।
মেয়েটির নাম ফারহা। বয়স বড়জোর ১৯। কিন্তু এই অল্প বয়সেই তার মধ্যে এক ধরণের ধ্রুপদী আভিজাত্য খেলা করছে। ফারহার গায়ের রঙ ধপধপে সাদা, যাকে বলে তুষারশুভ্র। সেই ধবধবে সাদা ত্বকের ওপর বাসন্তী রঙের একটি জামদানি শাড়ি জড়িয়ে আছে সে। শাড়ির পাড়ে সোনালী সুতোর কাজগুলো হলরুমের আলোয় চিকচিক করছে। ফারহা খুব সাধারণ সাজে থাকলেও তার উপস্থিতি ছিল অসাধারণ। তার অবয়বটি অত্যন্ত স্লিম এবং দীর্ঘাঙ্গী। যেন কোনো দক্ষ শিল্পী তার নিপুণ তুলির আঁচড়ে তাকে তিলে তিলে গড়েছেন।
সবচেয়ে বেশি যা ফারহানকে বিমোহিত করল, তা হলো ফারহার চুল। এক ঢল লম্বা কুচকুচে কালো চুল তার পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে। চুলে কোনো কৃত্রিমতা নেই, নেই কোনো উগ্র সাজ। শুধু কানের পাশে একটি ছোট বেলী ফুলের মালা গোঁজা। নিহার সিদ্দিকী যখনই ক্লিক করছেন, ফারহা একটু লাজুক হাসছে। সেই হাসিতে তার গালে টোল পড়ছে ষ্পষ্ট দেখতে পেল। তার চোখের মণিগুলো হীরের মতো জ্বলজ্বল করছিল।
ফটোগ্রাফার নিহার সিদ্দিকী বলছিলেন,
‘চমৎকার! ফারহা আপু, একটু ডান দিকে ঘাড়টা কাত করুন তো। হ্যাঁ, ঠিক আছে। এবার একটু নিচের দিকে তাকান।’
ফারহা যখন নির্দেশমতো নিচের দিকে তাকাল, তার কালো চোখের পলকগুলো ফারহানের মনে তীরের মতো বিঁধল। ফারহান নিজেকে সামলাতে পারছিল না। সে তার জীবনে অনেক মডেল দেখেছে। হলিউড-বলিউডের নায়িকাদের পর্দায় দেখেছে। কিন্তু রক্ত-মাংসের কোনো মানবী যে এত সুন্দর হতে পারে, তা তার কল্পনার বাইরে ছিল। তার মনে হলো, এই মেয়েটি যেন এই যান্ত্রিক নিউ ইয়র্কের নাগরিক নয়। সে যেনো কোনো এক রূপকথার রাজ্য থেকে ভুল করে এই কুইন্স প্যালেসে চলে এসেছে।
সায়মন ফারহানের কাঁধে হাত দিয়ে ঝাঁকুনি দিল। ‘কিরে? তুই তো পুরো ফ্রিজ হয়ে গেলি! ওদিকে কী দেখছিস?’
ফারহান ঘোরের মধ্যে থেকেই অস্ফুট স্বরে বলল, ‘অপূর্ব… সত্যিই অপূর্ব।’
সায়মন ফারহানের দৃষ্টি অনুসরণ করে ফারহাকে দেখল। তারপর শিস দিয়ে বলল, ‘ওরে বাবা! তুই তো দেখি একদম জহুরি। ও তো ফারহা। আমাদের কমিউনিটির বড় ব্যবসায়ী রফিক সাহেবের ছোট মেয়ে। ওকে ছোঁয়া তো দূরের কথা, ওর সাথে কথা বলাই কঠিন। ওর চারদিকে সব সময় একটা অদৃশ্য দেয়াল থাকে।’
ফারহান কোনো কথা বলল না। সে শুধু ভাবছে, বিধাতা মানুষকে এত সুন্দর করে কেনো গড়েন? ফারহা যখন কথা বলছিল তার পাশে থাকা এক বান্ধবীর সাথে, তখন তার হাতের ভঙ্গি, তার ঘাড় হেলানো—সবকিছুতেই যেন এক মায়াবী ছন্দ ছিল। সে যেন একটি জীবন্ত কবিতা। তার স্লিম ফিগার আর বাসন্তী শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে বসন্তের আগাম বার্তা লুকিয়ে আছে।
নিহার সিদ্দিকীর ফটোসেশন শেষ হলে ফারহা তার বান্ধবীর হাত ধরে হলের সামনের সারির দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করল। সে যখন হেঁটে যাচ্ছিল, তার লম্বা কালো চুলগুলো বাতাসে দুলছিল। ফারহান অপলক চোখে সেই দৃশ্য দেখল। তার মনে হলো, আজ কামারুজ্জামান বকুলের এই অনুষ্ঠানে আর কেউ গান গাইতে আসুক আর না আসুক, ফারহানের ‘মিউজিক্যাল নাইট’ শুরু হয়ে গেছে। তার হৃদস্পন্দনে এখন যে সুর বাজছে, তা কোনো বাদ্যযন্ত্রের নয়, তা এক চিরন্তন আকুলতার সুর।
চোখ বন্ধ করে বুক ভরে শ্বাস নিল ফারহান। মনে হল ফারহার শরীরের গন্ধ ওর নাকে উপর এসে আছড়ে পড়ছে। ঠিক করল, আজ তাকে অন্তত একবার ফারহার কাছাকাছি যেতে হবে। অন্তত তার নামটা একবার তার নিজের কানে শুনতে হবে। যদিও সে জানে, ফারহার মতো মেয়েরা সচরাচর অপরিচিত কারো সাথে কথা বলে না, তবুও বসন্তের এই মাতাল হাওয়ায় তার মন আজ বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। কুইন্স প্যালেসের ভেতরকার ভ্যাপসা গরম আর মানুষের ভিড় ছাপিয়ে তার কাছে শুধু ফারহার সেই শান্ত, শীতল আর ধপধপে সাদা মুখচ্ছবিটাই সত্য হয়ে ধরা দিল।
অনুষ্ঠান শুরুর ঘোষণা এলো নিউইয়র্কের জনপ্রিয় উপস্থাপিকা শারমিনা সিরাজের কাছ থেকে। আলো কমে এলো। কিন্তু ফারহানের মনের ভেতরে তখন হাজারটা ফ্ল্যাশ লাইট একসাথে জ্বলছে। সে জানে, আজ এই বসন্তের রাতে তার জীবনে এক নতুন গল্পের সূচনা হতে যাচ্ছে। যে গল্পের নায়িকা ফারহা—লম্বা চুলের, বাসন্তী শাড়ির এক মায়াবী রাজকন্যা।
কুইন্স প্যালেসের মূল অডিটোরিয়ামের আলো নিভে আসতেই এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। মঞ্চের ওপর নীল আর বেগুনি আলোর খেলা। কামারুজ্জামান বকুল মাইক্রোফোনের সামনে এসে দাঁড়ালেন। কীবোর্ডের রিডে মিউজিশিয়ানদের আঙুল ছোঁয়াতেই চারদিকে এক মায়াবী সুর ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু ফারহানের কান সেই সুর শুনলেও তার চোখ খুঁজছে সামনের সারিতে বসে থাকা সেই বাসন্তী রঙের মানবীকে। ফারহা তার বান্ধবীর সাথে তিন নম্বর সারিতে বসেছে। পেছন থেকে তার সেই লম্বা কালো চুলের বিনুনিটা দেখা যাচ্ছে, যা ফারহানের হৃদয়ে ঢেউ তুলছে বারবার।
ফারহান তার বন্ধুদের থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে ফারহার ঠিক দুই সারি পেছনের একটি খালি সিটে গিয়ে বসল। সেখান থেকে ফারহার ঘাড়ের একপাশ আর কানের লতিটা স্পষ্ট দেখা যায়। ধপধপে সাদা গায়ের রঙে হীরের ছোট একটি দুল চিকচিক করছে। ফারহান ভাবছে, কীভাবে কথা শুরু করা যায়? নিউ ইয়র্কের এই যান্ত্রিক জীবনে হুট করে কারো সাথে কথা বলাটা অভদ্রতা হতে পারে, আবার সুযোগ হাতছাড়া করলে হয়তো এই বসন্তের রাতটা কেবল আক্ষেপেই কাটবে।
মঞ্চে তখন গান চলছে—“বসন্ত বাতাসে সই গো, বসন্ত বাতাসে…”। পুরো হলরুম তালি আর ছন্দে মেতে উঠেছে। ফারহান খেয়াল করল, ফারহা গানের তালে তালে খুব ধীরলয়ে মাথা দোলাচ্ছে। তার ডান হাতটি সিটের হাতলে রাখা। লম্বা চম্পক আঙুলগুলো যেন কোনো দক্ষ শিল্পীর কারুকাজ। ফারহানের মনে হলো, এই মেয়েটি কেবল রূপসী নয়, সে সুরের কদর করতে জানে।
একে একে নিউইয়র্কের জনপ্রিয় শিল্পীদের গান হতে লাগল মঞ্চে। বিরতির সময় যখন ঘোষণা করা হলো, তখন হলের বাতিগুলো জ্বলে উঠল। ফারহা তার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ফোন বের করার সময় ভুলবশত তার হাতে থাকা একটি ছোট ডায়েরি আর কলম ফ্লোরে পড়ে গেল। ফারহা নিচু হয়ে সেগুলো তোলার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার শাড়ির আঁচল বারবার বাধা দিচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে ফারহান বিদ্যুৎগতিতে উঠে দাঁড়াল। সে দ্রুত নিচু হয়ে ফারহার ডায়েরি আর কলমটি কুড়িয়ে নিল।
ফারহা সোজা হয়ে দাঁড়াতেই ফারহানের সাথে তার চোখাচোখি হলো। একদম কাছ থেকে ফারহাকে দেখে ফারহানের মনে হলো সে কোনো স্বর্গীয় অপ্সরীকে দেখছে। ফারহার গায়ের সেই ধপধপে সাদা চামড়া যেন কাঁচের মতো স্বচ্ছ। তার চোখের মণিগুলো গাঢ় বাদামী, যা দূর থেকে কালো মনে হয়েছিল।
‘আপনার জিনিসগুলো…।’ ফারহান হাত বাড়িয়ে ডায়েরিটা দিল। তার কণ্ঠস্বর কিছুটা কাঁপছিল।
ফারহা একটু অবাক হয়ে ফারহানের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটে এক চিলতে অমায়িক হাসি ফুটে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে ডায়েরিটা নিল।
‘ওহ, থ্যাংক ইউ সো মাচ! আমি তো খেয়ালই করিনি। আসলে ভিড়ের মধ্যে ব্যাগ থেকে কিছু বের করা খুব মুশকিল।’ -ফারহার কণ্ঠস্বর যেন সেতারের ঝংকার। অত্যন্ত মিষ্টি আর মার্জিত।
‘আমি ফারহান। সানিসাইড থেকে এসেছি।’ -ফারহান সাহস করে নিজের পরিচয় দিল।
ফারহা একটু লাজুক হেসে বলল, ‘আমি ফারহা। আমি জ্যামাইকাতে থাকি। আপনি কি কামারুজ্জামান বকুল সাহেবের ফ্যান?’
ফারহান মাথা নেড়ে বলল, ‘না। তবে আজ এখানে আসার পর মনে হচ্ছে গান ছাড়াও দেখার মতো সুন্দর কিছু এই কুইন্স প্যালেসে আছে।’
ফারহা ফারহানের কথার ইঙ্গিত বুঝতে পারল। কিছুটা লাজুক হতেই তার ফর্সা গালে টোল পড়ে হালকা গোলাপী আভা ছড়িয়ে পড়ল। মুগ্ধ হয়ে গেল ফারহান। মনে হল দমটা আটকে আছে বুকে। ফারহা ওর দিকে তাকিয়ে বিষয়টি যেন বুঝতে পার। সে একটু আড়ষ্ট হয়ে তার লম্বা কালো চুলগুলো সামনে নিয়ে এসে আঙুলে জড়াতে লাগল। ১৯ বছরের এই তরুণী জানে সে সুন্দরী। কিন্তু ফারহানের দেখার ভঙ্গিতে এমন এক ধরণের বিশুদ্ধতা ছিল যে ফারহা অস্বস্তি বোধ করল না। বরং তার মনে হলো, এই ছেলেটি আর সবার মতো তাকে কেবল পণ্য হিসেবে দেখছে না।
‘আপনার শাড়িটা খুব সুন্দর। একদম বসন্তের মতো।’ -বড় একটা দম ফেলে ফারহান প্রশংসা করল।
ফারহা একটু সহজ হয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ। আসলে আম্মু জোর করে এই শাড়িটা পরিয়ে দিয়েছেন। আমি তো থ্রি-পিস পরতে চেয়েছিলাম। উনি বললেন—নিউ ইয়র্কের বসন্ত উৎসবে বাঙালি সাজ না থাকলে চলে না।’
দুজন কথা বলতে বলতে হলের পেছনের দিকে ফুড কর্নারের দিকে এগিয়ে গেল। ফারহান দুই কাপ চায়ের অর্ডার করল। বাইরে তখনো বসন্তের হিমেল হাওয়া। কিন্তু কুইন্স প্যালেসের ভেতরে তাদের দুজনের হৃদয়ে তখন উষ্ণতার হাওয়া বইছে। ফারহা জানাল সে কুইন্স কলেজে প্রি-মেডিকেলে পড়ছে। তার স্বপ্ন ভবিষ্যতে একজন ভালো ডাক্তার হওয়া। ফারহান জানাল সে আইটি সেক্টরে কাজ করে। মাঝে মধ্যে টুকটাক লেখালেখির চেষ্টা করে। কথা বলতে বলতে দুজন দুজনার কাছে সহজ হয়ে উঠতে শুরু করল। ফারহা তার জীবনের ছোটখাটো স্বপ্নের কথা বলছিল। ফারহান মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। সে দেখল ফারহা যখন কথা বলে, তখন তার চোখগুলো নেচে ওঠে। তার স্লিম ফিগার আর লম্বা গড়নের কারণে তাকে যে কোনো দামী মডেলের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় লাগছিল। বিশেষ করে যখন সে হাসছে, তখন তার ঠোঁটের পাশের ভাঁজগুলো, গালের টোল ফারহানের বুকের ভেতর হাহাকার তুলে দিচ্ছে।
‘আপনি কি সব সময় এত শান্ত?’ -ফারহা হঠাৎ প্রশ্ন করল।
ফারহান হাসল। ‘না। আসলে আজ আপনার সৌন্দর্যের সামনে আমার সব শব্দ হারিয়ে গেছে। বিশ্বাস করুন ফারহা, নিহার সিদ্দিকী যখন আপনার ছবি তুলছিলেন, তখন থেকে আমার চোখ আপনার ওপর আটকে আছে।’
ফারহা একটু হেসে নিচু স্বরে বলল, ‘ফটোগ্রাফাররা তো সবারই ছবি তোলে। আপনি কি সবার সাথেই এমন করে কথা বলেন?’
‘না, সবার সাথে কথা বলার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে মনে হলো—কথা না বললে আমি আজ রাতে ঘুমাতে পারব না।’
ফারহার মধ্যে এক ধরণের চপলতাও আছে। সে হুট করে বলল, ‘আচ্ছা ফারহান, আপনি কি জানেন নিউ ইয়র্কের এই বসন্তের বাতাস খুব বিষাক্ত হতে পারে? একবার কারো মনে জায়গা করে নিলে তাকে আর বের করা যায় না।’
ফারহান ফারহার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, ‘যদি সেই বিষ ফারহার মতো সুন্দর কারো কাছ থেকে আসে, তবে আমি বারবার নীল হতে রাজি আছি।’
ফারহা খিলখিল করে হেসে উঠল। তার হাসির শব্দে আশেপাশের মানুষ তাকাচ্ছিল, কিন্তু তাদের সেদিকে খেয়াল নেই। ফারহার সেই লম্বা কালো চুলগুলো বারবার তার কাঁধ থেকে সামনের দিকে পড়ে যাচ্ছিল, আর সে অবলীলায় সেগুলো আবার পেছনে সরিয়ে দিচ্ছিল। ফারহানের মনে হলো, এই দৃশ্যটি সে সারা জীবন দেখলেও তার তৃষ্ণা মিটবে না।
বিরতি শেষ হওয়ার ঘণ্টা বাজল। ফারহা বলল, ‘আমাকে এখন যেতে হবে। আমার বান্ধবীরা খুঁজছে।’
ফারহান পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করে একটু ইতস্তত করে বলল, ‘আবার কি দেখা হবে আমাদের? বা আপনার নাম্বারটা কি পেতে পারি?’
ফারহা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখে এক ধরণের রহস্যময় খেলা। সে ফারহানের ফোনটা নিজের হাতে নিল এবং দ্রুত একটি নাম্বার ডায়াল করে কেটে দিল।
‘নাম্বারটা রেখে দিলাম। তবে ফোন করবেন কি না, সেটা আপনার সাহসের ওপর নির্ভর করছে।’ -বলে ফারহা দ্রুত হেঁটে তার আসনের দিকে চলে গেল।
ফারহান তার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। সেখানে একটি নতুন নাম্বার জ্বলজ্বল করছে। তার মনে হলো, আজ কামারুজ্জামান বকুলের বসন্ত বাতাস শুধু অনুষ্ঠান নয়, তার জীবনের সার্থকতা হয়ে ধরা দিয়েছে। কুইন্স প্যালেসের কৃত্রিম আলোর নিচে ফারহান দাঁড়িয়ে রইল, আর তার হৃদয়ে তখন বসন্তের পূর্ণিমার জোয়ার বইছে। সে জানে, এই ১৯ বছরের কিশোরী তার জীবনে এক নতুন ঝড়ের নাম—যে ঝড় কেবল ধ্বংস করে না, বরং নতুন করে বাঁচতে শেখায়।
কুইন্স প্যালেসের অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে রাত প্রায় একটা বেজে গেল। রন্টি দাসের শেষ গানটি ছিল একটি বিরহী সুরের। কিন্তু ফারহানের মনে তখন বসন্তের রঙিন কোকিল ডাকছে। হলরুম থেকে মানুষ একে একে বেরিয়ে আসছে। নিউ ইয়র্কের বাইরের বাতাস এখন বেশ ঠান্ডা, হালকা কুয়াশা জমতে শুরু করেছে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলোর নিচে। ফারহান হলরুমের এক্সিট গেটের পাশে দাঁড়িয়ে অস্থিরভাবে অপেক্ষা করছে। তার হাতে থাকা ফোনের স্ক্রিনে ফারহার নাম্বারটা বারবার দেখছে সে। তার মনে হচ্ছে, যদি এখনই ফারহাকে একবার দেখতে না পায়, তবে এই রাতটি তার কাছে অনন্তকাল মনে হবে।
ভিড়ের মাঝখান থেকে হঠাৎ সেই পরিচিত বাসন্তী রঙের আভা দেখা গেল। ফারহা তার বান্ধবীর সাথে বেরিয়ে আসছে। গায়ের ওপর একটি পাতলা সাদা শাল জড়িয়ে নিয়েছে সে, যার ফলে তার লম্বা কালো চুলগুলো শালের নিচ দিয়ে পিঠের মাঝখান পর্যন্ত দুলছে। ফারহার সেই ধপধপে সাদা মুখটি কুয়াশায় আরও মায়াবী লাগছে। সে যখন গেটের কাছে এল, ফারহান এক পা এগিয়ে গেল।
‘ফারহা!’ -ফারহানের ডাকে ফারহা থমকে দাঁড়াল। তার চোখে এক চিলতে দুষ্টুমি মেশানো হাসি।
‘আপনি এখনো যাননি? আমি ভেবেছিলাম আপনার বন্ধুরা আপনাকে নিয়ে সানিসাইডে চলে গেছে।’ -ফারহা বলল।
ফারহান মাথা নেড়ে বলল, ‘বন্ধুরা চলে গেছে। কিন্তু আমার মন তো আপনার কাছে পড়ে আছে। তাই আপনাকে না দেখে কীভাবে যাই?’
ফারহা একটু লজ্জা পেল। সে তার বান্ধবীর দিকে তাকিয়ে ইশারায় কিছু একটা বলল। তারপর ফারহানের দিকে ফিরে বলল, ‘আমার বড় ভাই গাড়ি নিয়ে আসতে একটু দেরি করবেন। জ্যামাইকা থেকে আসতে উনার একটু সময় লাগছে। আপনি চাইলে আমরা এই ফুটপাতে একটু হাঁটতে পারি?’
ফারহানের জন্য এটি ছিল এক অভাবনীয় প্রস্তাব। নিউ ইয়র্কের নির্জন রাস্তায়, বসন্তের এই কুয়াশাভেজা রাতে ফারহার মতো এক অপার্থিব সুন্দরীর পাশে হাঁটা—এ যেন স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু। দুজনে ৩৭ এভিনিউর ফুটপাত ধরে জ্যাকসন হাইটসের দিকে হাঁটতে শুরু করল। রাস্তার ধারের গাছগুলোতে ছোট ছোট কুঁড়ি আসতে শুরু করেছে। ফারহার স্লিম ফিগার আর তার রাজকীয় হাঁটার ভঙ্গি ফারহানকে বারবার মুগ্ধ করছিল।
‘জানেন ফারহান’ -ফারহা কথা শুরু করল, ‘আমি অনেক ছেলেই দেখেছি যারা রূপের প্রশংসা করে। কিন্তু আপনার চোখের মধ্যে আমি এক ধরণের সততা দেখেছি। আপনি যখন নিহার চাচার ক্যামেরার সামনে আমাকে দেখছিলেন, তখন আমি খুব অস্বস্তি বোধ করছিলাম প্রথমে। পরে মনে হলো, এই ছেলেটি হয়তো আমাকে অন্য চোখে দেখছে।’

ফারহান থামল। ফারহার সামনে এসে দাঁড়াল। স্ট্রিট লাইটের হলদেটে আলোয় ফারহার গায়ের রঙ যেন সোনার মতো চিকচিক করছে। ফারহান বলল, ‘ফারহা, আমি জানি আমরা মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে পরিচিত হয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমার ২১ বছরের জীবনে আমি এত বড় ধাক্কা আগে কখনো খাইনি। আপনার ওই লম্বা কালো চুল, আপনার ওই কাজল কালো চোখ—সবকিছুই যেন আমাকে বলছে যে আপনিই সেই মানুষ যাকে আমি সারাজীবন খুঁজেছি।’
ফারহা নিচের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। ‘আপনি কি সব মেয়েকেই এমন কবিতা শোনান?’
ফারহান গম্ভীর হয়ে বলল, ‘কবিতা তো সবার জন্য আসে না ফারহা। কবিতা আসে আপনার মতো কারো জন্য। যার হাসিতে পুরো কুইন্স প্যালেস উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।’
কথা বলতে বলতে দুজন জেনারেল হার্ট প্লে গ্রাউন্ডের একটি বেঞ্চের কাছে এসে বসল। ফারহা তার শালটি একটু ভালো করে জড়িয়ে নিল। ফারহান দেখল ফারহার লম্বা আঙুলগুলো ঠান্ডায় একটু লালচে হয়ে গেছে। সে খুব সাবধানে ফারহার একটি হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। ফারহা চমকে উঠল না, বরং তার হাতের উষ্ণতায় ফারহান এক ধরণের নির্ভরতা খুঁজে পেল।
‘ফারহা, আমি কি আপনার জীবনে স্থায়ী ভাবে আসতে পারি?’ -ফারহান সরাসরি প্রশ্ন করল।
ফারহা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আকাশের দিকে তাকাল। কুয়াশার আড়ালে চাঁদটা দেখা যাচ্ছে না, তবে তার আলো ঠিকই চারদিকে ছড়িয়ে আছে। ফারহা বলল, ‘আমি অনেক ছোট ফারহান। মাত্র ১৯। পড়াশোনা শেষ করতে হবে, বাবা-মায়ের অনেক স্বপ্ন আছে আমাকে নিয়ে। কিন্তু আজ এই বসন্তের রাতে আপনার সাথে কথা বলে মনে হচ্ছে, জীবনের সব স্বপ্ন আপনার সাথে ভাগ করে নিলে হয়তো মন্দ হবে না।’
ফারহানের খুশিতে চিৎকার করতে ইচ্ছে করছিল। সে ফারহার হাতের ওপর আরেকটু চাপ দিয়ে বলল, ‘আমি আপনার সব স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করব। আমি কথা দিচ্ছি, এই বসন্তের বাতাস সাক্ষী রেখে বলছি—আমি আপনার সারাজীবনের সাথী হতে চাই।’
ঠিক তখনই ফারহার ফোনের রিংটোন বেজে উঠল। বড় ভাইয়ের ফোন এসেছে। ফারহা ধরেই ফারহা বলল, ‘ভাইয়া তুমি কত দূরে?’
‘এইতো কাছেই। তবে আরো দশ বারো মিনিট লেগে যেতে পারে। তুই কোথায়?’
‘আমি জ্যাকসন হাইটসের কাছাকাছি।’
‘তুই একা? নাকি তোর সাথে কেউ আছে?’
‘আমার সাথে একজন আছে।’
‘ভালো হয়েছে। এক কাজ কর, তুই জ্যাকসন হাইটসের আলাউদ্দীন রেস্টুরেন্টে চলে আয়। আমি ওখানে আসছি।’
‘ঠিক আছে ভাইয়া।’
‘ওখানে নমি, শফি ভাই আছে। ওরা আমার পরিচিত। তোরা গিয়ে ওখানে বস। কিছু খেয়ে নে। আমি এই এলাম বলে।’
‘ঠিক আছে ভাইয়া। তুমি কোন চিন্তা করোনা।’
ফোন রেখে ফারহানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল ফারহা। ‘আপনার কপালটা বোধহয় বেশ ভালো।’ -বলল ফারহা।
ফারহান বলল, ‘কেনো কি হয়েছে আমার কপালের।’
‘ভাইয়ার আসতে দশ বারো মিনিট দেরি হতে পারে। বলল, জ্যাকসন হাইটসের আলাউদ্দীন রেস্টুরেন্টে গিয়ে অপেক্ষা করতে।’
‘তাই নাকি। এটাতো সত্যিই ভালো খবর। আপনার সাথে আরো কিছুটা সময় কাটানো যাবে। চলুন জ্যাকসন হাইটসের দিকে হাঁটতে শুরু করি।’
‘ঠিক আছে চলুন।’
রাত প্রায় দুইটা বাজে। জ্যাকসন হাইটস এখনো প্রানবন্ত হয়ে আছে। কুইন্স প্যালেসের অনুষ্ঠান শেষে একে একে সবাই আসতে শুরু করেছে জ্যাকসন হাইটসে। রেস্টুরেন্টগুলোতে মানুষের আড্ডা জমে আছে।
‘চা কফি খাবেন?’ -ফারহাকে বলল ফারহান।
‘চা খাওয়া যায়। কিন্তু রেস্টুরেন্টে এত ভিড়ের মাঝে যেতে চাইনা।’
‘চলুন রাস্তার ওপারে। ফ্রেশ বেকারি থেকে চা খাওয়াবো আপনাকে।’
চলে এল দুজন ফ্রেশ বেকারিতে। বাইরে দাঁড়িয়ে রইল ফারহা। ফারহান গিয়ে দুকাপ চা নিয়ে এল। চা শেষ হতেই ফারহার ভাইয়ের গাড়ি এসে দাঁড়াল ফ্রেশ বেকারির সামনে। ফারহা তার লম্বা চুলগুলো একবার ঝাপটা দিয়ে পিঠের ওপর ঠিক করে নিল। ফারহানের মনে হলো, এই চুলের প্রতিটি ভাঁজে যেন এক একটি কবিতা লুকিয়ে আছে।
‘ভাইয়া চলে এসেছেন। আজ আসি ফারহান।’ -ফারহা বলল।
‘ঠিক আছে। ভালো থাকবেন। কথা হবে আবার।’
গাড়ির দিকে যেতে যেতে ফারহা হঠাৎ ফিরে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে ফারহানের খুব কাছে এসে দাঁড়াল। ফারহানের নাকে ফারহার গায়ের সেই ধপধপে সাদা চন্দনের সুবাস আর চুলের বকুল ফুলের ঘ্রাণ ঝাপটা দিল।
ফারহা ফিসফিস করে বলল, ‘নববর্ষে কি করবেন বলে ভাবছেন।’
‘আমার ভাবনা তো এখন তোমাকে ঘিরেই।’
ফারহানের কথায় হেসে ফেলল ফারহা। ও হেসে উঠতেই ওর গালে টোল পড়ে মুখের চারিদিকে গোলাপি আকার ধারন করতে শুরু করল। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকল ফারহান।
‘তাহলে নববর্ষে সারদিন একসাথে কাটাবো, পারবেন?’ -মুচকি হেসে ফারহানের দিকে তাকিয়ে বলল ফারহা।
খুশিতে উচ্ছল হয়ে উঠল ফারহান। কিন্তু মুহুর্তে আবারো ম্লান হয়ে উঠল ওর মুখ। ওর চোখে মুখে বিষন্নতা ফুটে উঠতে দেখে ফারহা বলল, ‘কি হল আপনি খুশি হননি? নববর্ষে আমাদের দেখা হোক চাননা আপনি?’
‘খুশি হবনা কেন? কিন্তু নববর্ষ আসতে আরো দশ বারোদিন! এতদিন আমাদের দেখা হবেনা?’
‘ও এই কথা!’ -হাসতে হাসতে বলল ফারহা। ‘আপনি চাইলে দেখা হতেও পারে। তবে অপেক্ষার মধ্যেও সুখ বা শান্তি আছে।’
‘তা ঠিক। ঠিক আছে। তবে তাই হোক।’
‘আমার ফোন নাম্বার তো আছেই। প্রয়োজনে ফোনে কথা হবে। দেখা করবার ইচ্ছে হলে দেখাও হতে পারে।’
‘তাহলে তো ঠিকই আছে।’
‘তাহলে এই কথাই রইল।’
ফারহান মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। ফারহা গাড়িতে উঠতে গিয়েও আবারো দাঁড়িয়ে পড়ল ফারহা। ফারহানের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘একটা বিষয় খেয়াল করেছেন?’
‘কি?’
‘আমার আর আপনার নামের মধ্যে একটা মিল রয়েছে।’
ফারহানের মনে হল সত্যি তো। ফারহা ফারহান দুজনের নাম প্রায়ই কাছাকাছি, একই। ‘ফারহা, তোমার আমার জীবন একই সুতোয় বাঁধা পড়ে আছে।’ -বলল ফারহান।
‘আমিও তাই ভাবছি। তা নাহলে যে আমি কারো সাথেই কথা বলিনা, সেই আমি কত সহজেই আপনার সাথে মিশে গিয়েছি। ভাবতেই অবাক লাগছে।’
‘সবই উপরওয়ালার ইচ্ছা।’ -বলল ফারহান।
‘আজ তাহলে আসি। দেখা হবে নববর্ষে। আগাম নববর্ষের শুভেচ্ছা তোমাকে। শুভ নববর্ষ ফারহান।’
‘তোমাকেও শুভ নববর্ষ। দেখা হবে নববর্ষে।’
‘আসি।’
‘সাবধানে যেও।’
গাড়িটি যখন চলে যাচ্ছিল, ফারহা জানালা দিয়ে হাত নাড়ল। ফারহান ফ্রেশ বেকারির সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে তখনো ফারহার সেই মায়াবী অবয়বটি ভাসছে।
নিউ ইয়র্কের রাত এখন অনেক গভীর। কুয়াশা আরও ঘন হয়েছে। কিন্তু ফারহানের মনে এখন রৌদ্রোজ্জ্বল বসন্তের দিন। ঠিক এই সময় ওর বন্ধু রাফাত আর সায়মান ওর বিমডব্লিউ এক্সএম সাব নিয়ে হাজির হল ফ্রেশ বেকারির সামনে। দ্রুত পেছনে উঠে বসল। দুই বন্ধু ওকে নিয়ে হাসাহাসি করতে শুরু করল।
‘কিরে, তুই তো আসতে চাসনি অনুষ্ঠানে। আর আসার পর আমাদেরকেই ভুলে গেলি।’ -বলল সায়মন।
রাফাত বলল, ‘ভুলে গেছিস ঠিক আছে। কিন্তু মেয়েটি কি সাড়া দিল।’
ফারহান কোন কথা বললনা। তার কানে তখনো বাজছে কামারুজ্জামান বকুলের সেই গানের সুর—‘বসন্ত বাতাসে প্রেমের গন্ধ…’। ফারহান বুঝতে পারল, আজ রাতে সে কেবল একটি সুন্দর মেয়েকে দেখেনি, সে তার জীবনের গন্তব্য খুঁজে পেয়েছে।
এই বসন্তের হাওয়া ফারহানের জীবনে নিয়ে এসেছে ১৯ বছরের সেই মায়াবী রাজকন্যাকে। যার লম্বা কালো চুল আর ধপধপে সাদা গায়ের রঙ তার হৃদয়ে এক চিরস্থায়ী দাগ কেটে দিয়েছে। কুইন্স প্যালেসের সেই মিউজিকেল নাইট শেষ হয়ে গেলেও, ফারহান আর ফারহার প্রেমের মিউজিক আজ থেকে শুরু হলো—যা আর কখনোই থামবে না।
রাফাত আর সায়মনকে ওদের বাসায় নামিয়ে দিয়ে গাড়ি নিয়ে ছুটে চলল সানিসাইডের নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে। নিউ ইয়র্কের রাজপথের বসন্ত বাতাসে আজ সত্যিই প্রেমের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। ড্রাইভিং সিটের জানালার কাঁচ নামিয়ে ফারহান আকাশের দিকে তাকিয়ে এক লম্বা দীর্ঘশ্বাস নিল, যা ছিল প্রাপ্তির এবং এক অসীম সুখের। সে জানে, তার পৃথিবীটা আর আগের মতো নেই। ফারহা ওকে তুমি করে ডেকেছে। আহা! কী শান্তি! নববর্ষে ফারহার সাথে আবারো মিলিত হবে। নতুন বছর নতুন প্রাণ নতুন করে শুরু হবে জীবন। নববর্ষেই আরো বদলে যাবে। সেখানে কেবল ফারহা থাকবে, আর থাকবে এই বসন্তের চিরন্তন বাতাসের মাদকতা। এখন অপেক্ষা শুধু শুভ নববর্ষের। (সমাপ্ত)
-কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক, নিউইয়র্ক|