রাহিতুল ইসলাম: ধানমন্ডির ১ নম্বর সড়কের ১৩৯/৪-এ বাড়িটির সামনে এসে দাঁড়ালেই বুকটা একটু দুরুদুরু করত। ওটা শুধু একটা বাড়ি নয়, কবিতার পাঠশালা; কবি রফিক আজাদের ডেরা। আমি তখন ছাত্র। পকেটে টান থাকলেও মনে ছিল লেখক হওয়ার অদম্য জেদ। কবির সান্নিধ্য পাওয়া মানেই যেন শব্দের মায়াজালে আটকা পড়া। সেদিন সকালে গেট দিয়ে ঢুকতেই দেখলাম, স্যার বারান্দার একটা টুলে বসে আছেন। রোদটা এসে পড়েছে তার চুলে। আমাকে দেখেই সহাস্যে বললেন, ‘রাহিতুল আসছ?’
আমি কুণ্ঠিত স্বরে বললাম, ‘জি স্যার।’
তিনি হঠাৎ আঙুল উঁচিয়ে বাগানের এক কোণে গাছটার তলা দেখালেন। বললেন, ‘যাও তো, ওই জুতাটা নিয়ে সেলাই আর রং করিয়ে নিয়ে আসো।’
আমি এগিয়ে গিয়ে দেখলাম—একজোড়া জুতা। কাদা মাটিতে এমনভাবে মাখামাখি হয়ে আছে যে চেনা দায়। হাতে তুলতেই মনে হলো মস্ত ভার। মনে মনে ভাবলাম, স্যার এই পরিত্যক্ত জুতা দিয়ে কী করবেন? চারদিকে তাকালাম একটা প্লাস্টিক বা ব্যাগের খোঁজে। স্যার দূর থেকেই ধরে ফেললেন আমার মনের কথা। বজ্রকণ্ঠে বললেন, ‘কী খোঁজো? ব্যাগ লাগবে না। ওভাবেই হাতে করে নিয়ে যাও।’
আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে কাদামাখা জুতাগুলো হাতে ঝুলিয়েই হাঁটতে শুরু করলাম। ধানমন্ডি ২ নম্বর রোড দিয়ে সিটি কলেজের পাশ দিয়ে যখন হাঁটছি, মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সব চোখ আমার হাতের ওই কদাকার জুতাজোড়ার দিকে। কলেজের ছেলেমেয়েরা ফিসফাস করছে, কেউ কেউ টিপ্পনী কাটছে। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছিল আমার।
সিটি কলেজের মোড়ে এক মুচিকে ধরলাম। তিনি তো জুতার অবস্থা দেখে বিরক্ত।
‘মামা, এটা কোত্থেকে আনছেন? এত কাদা!’
‘একটু কষ্ট করে করে দেন না, মামা।’
‘৩০ টাকা লাগব।’
হিসাব করে চলা ছাত্রজীবন। পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম, হাত প্রায় খালি। অনেক দরদাম করে ২৫ টাকায় রফা হলো। চকচকে পালিশ আর সেলাই শেষে জুতাজোড়া যখন হাতে নিলাম, তখন সেগুলো নতুনের মতো দেখাচ্ছে।

ফিরে এলাম কবির কাছে। স্যার তখনো ওভাবেই বসে। আমাকে দেখে বললেন, ‘নিয়ে আসছ? বেশ। এবার যাও, আগের মতো ওই গাছের গোড়ায় ফেলে দিয়ে এসো।’
আমি থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। এত কষ্ট, এত লজ্জা, নিজের পকেটের শেষ সম্বলটুকু খরচ করে এটাকে ঠিক করলাম, আর এখন স্যার বলছেন ফেলে দিতে? বিস্ময় নিয়ে স্যারের দিকে তাকাতেই তিনি ইশারায় কাছে ডাকলেন।
‘রাহিতুল, শোনো,’ স্যারের কণ্ঠস্বর তখন একদম নিচু, কিন্তু তীক্ষ্ণ। ‘তুমি যখন খালি হাতে আমার বাসায় আসলে, কেউ কি তোমার দিকে তাকিয়েছিল?’
আমি মাথা নাড়লাম, ‘না স্যার, কেউ ওভাবে তাকায়নি।’
‘আর যখন জুতাটা হাতে নিয়ে গেলে?’
‘স্যার, মনে হচ্ছিল রাস্তার সবাই আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। সিটি কলেজের ছেলেমেয়েরা পর্যন্ত হাসাহাসি করছিল।’
স্যার আমার কাঁধে হাত রাখলেন। এক মরমী হাসিতে ভরে উঠল তার মুখ। তিনি বললেন, ‘শোনো, লেখা এভাবে লিখতে হবে, যাতে তোমার লেখার দিকে মানুষ তাকিয়ে থাকে। সাধারণ পথে সবাই হাঁটে, কেউ ফিরে তাকায় না। কিন্তু যখন তুমি অসাধারণ কিছু—তা সে কাদামাখা জুতাই হোক—সবার সামনে তুলে ধরবে, তখনই মানুষ বাধ্য হবে থামতে। লেখাটা হতে হবে ঠিক ওই জুতাটার মতো, যা মানুষের নজর কাড়বে।’
সেদিন সেই গাছের গোড়ায় জুতার সাথে আমার ভেতরের আমিত্বকেও ফেলে দিয়েছিলাম। রফিক আজাদ স্যার আমাকে শিখিয়েছিলেন—বইয়ের তাক সাজানোর জন্য নয়, মানুষের চোখ আর মন কেড়ে নেওয়ার জন্যই কলম ধরতে হয়। আজ যখন পাঠকেরা আমার লেখার দিকে তাকিয়ে থাকে, আমি মনে মনে সেই ২৫ টাকা আর একজোড়া কাদামাখা জুতার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই।
আজ কবি রফিক আজাদের জন্মদিন। এই বিশেষ দিনে তাঁকে স্মরণ করি। আমার সমগ্র জীবনের সাথে তিনি মিশে থাকবেন। তার ওই ছোট্ট কিন্তু সুগভীর শিক্ষা বহন করে যাব আজীবন। শুভ জন্মদিন, স্যার।
লেখক : রাহিতুল ইসলাম, সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক