‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিষিদ্ধ নয়, তবু ইউপিএল বিক্রয়কেন্দ্রে তালা

ঢাকা: শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রিকে কেন্দ্র করে ঢাকার বাংলাবাজারে দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) বিক্রয়কেন্দ্রে তালা দেওয়া এবং দুই কর্মীকে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনার জনম দিয়েছে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বইটি নিষিদ্ধ নয় এবং এর বিক্রি বন্ধ করার বিষয়ে সরকার বা আদালতের কোনো নির্দেশ তারা পায়নি। পুলিশের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, বইটির বিক্রিতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।

ইউপিএলের দেওয়া বিবৃতি অনুযায়ী, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে দুই ব্যক্তি বাংলাবাজারে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ কিনতে চান। কর্মীরা বইটি বের করার পর তারা বইটি বিক্রির বিষয়ে আপত্তি জানান এবং দাবি করেন, বইটি নিষিদ্ধ।

ইউপিএলের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের বোঝানো হয় যে বইটি নিষিদ্ধ নয়। এরপরও ওই ব্যক্তিরা সেখানে হট্টগোল করেন এবং আশপাশের লোকজনকে জড়ো করেন। একপর্যায়ে বিক্রয়কেন্দ্রের শাটার নামিয়ে তাতে তালা দেওয়া হয়। ইউপিএলের দুই কর্মী আমিনুল ইসলাম ও হুমায়ূন কবীরকেও নিয়ে যাওয়া হয় ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শুভ বড়ই জানান, দুই পক্ষের মধ্যে বিষয়টি মীমাংসা হয়েছে এবং পরে বিক্রয়কেন্দ্রটি খুলে দেওয়া হয়।

বইটি নিষিদ্ধ করার বিষয়ে কোনো সরকারি আদেশ বা আদালতের নির্দেশের তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ইউপিএলও জানিয়েছে, বইটি নিষিদ্ধ করার বিষয়ে তারা কোনো সরকারি বা আদালতের সিদ্ধান্তের কথা জানে না। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, কোনো বই নিষিদ্ধ করতে হলে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয় এবং কোনো দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে নিষেধাজ্ঞা দিলে তারা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।

লালবাগ বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিষিদ্ধ নয় এবং এর বিক্রিতেও কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কর্মীদের বইটি বিক্রি না করার শর্তে ছেড়ে দেওয়া হয়ে থাকলে সেটিও যথাযথ হয়নি বলে ওই কর্মকর্তা মন্তব্য করেন।

সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান জানান, ইউপিএলের দুই কর্মীকে থানায় নেওয়া হয়নি; তাদের ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয়েছিল এবং পরে সেখান থেকেই ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ২০২৪ সালের পর আর পুনর্মুদ্রিত হয়নি। বইটি আর বিক্রি করা হবে না—এমন শর্তে কর্মীদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি জানান। এ ঘটনায় থানায় কোনো অভিযোগ করা হয়নি বলেও জানান তিনি।

ইউপিএল বলেছে, বিভিন্ন সরকারের সময়ে বিভিন্ন বই নিয়ে তারা চাপের মুখে পড়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা প্রকাশনার ক্ষেত্রে তাদের পেশাগত মান ও নীতির সঙ্গে আপস করেনি। কোনো বই প্রকাশ বা বাজারজাত করার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয় বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ইউপিএলের মতে, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বাংলাদেশের ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ। কোনো দায়িত্বশীল সরকারি কর্তৃপক্ষ বা আদালত যথাযথ প্রক্রিয়ায় বইটি নিষিদ্ধ করলে তারা আইন মেনে চলবে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ঘটনার পর বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) তদন্তের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, ২৮ সেপ্টেম্বর ইউপিএলের বাংলাবাজার শোরুমে বইটির বিক্রি বন্ধের দাবিতে কয়েকজন ব্যক্তি আক্রমণাত্মক আচরণ করেন, শাটার নামিয়ে দেন এবং দুই বিক্রয়কর্মীকে হয়রানি করেন। কর্মীদের পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আটকে রাখার অভিযোগে পুলিশের ভূমিকা তদন্তেরও দাবি জানিয়েছে ব্লাস্ট। একই সঙ্গে ইউপিএলের কর্মীসহ প্রকাশক ও বই বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

ব্লাস্ট বলছে, কোনো বইয়ের বক্তব্য বা বিষয়বস্তুর সঙ্গে দ্বিমত, আপত্তি বা সমালোচনা থাকলে তা শান্তিপূর্ণ, যুক্তিনির্ভর ও আইনসম্মত উপায়ে প্রকাশের সুযোগ রয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হুমকি, চাপ বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কোনো বইয়ের প্রকাশ, প্রচার বা বিক্রি বাধাগ্রস্ত করা উচিত নয়। কোনো প্রকাশনা নিষিদ্ধ, প্রত্যাহার বা সীমিত করার প্রয়োজন হলে তা সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি ও যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হবে।

ঘটনাটিকে ঘিরে এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো বই আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ না হয়ে থাকলে ব্যক্তিগত ব্যক্তি বা কোনো গোষ্ঠী কী আইনি ভিত্তিতে তার বিক্রি বন্ধ করার দাবি করতে পারে। একই সঙ্গে ইউপিএলের দুই কর্মীকে কেন পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয়েছিল এবং তাদের মুক্তির ক্ষেত্রে বইটি বিক্রি না করার কোনো শর্ত আরোপ করা হয়েছিল কি না, সেটিও আলোচনায় এসেছে।

যারা বইটিকে ‘নিষিদ্ধ’ বলে দাবি করেছিলেন, তারা কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপন, আদালতের আদেশ বা অন্য কোনো আইনি নথির ভিত্তিতে এমন দাবি করেছিলেন কি না, সেটিও এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্য থেকে পরিষ্কার নয়।

লেখক আসিফ বিন আলী এই ঘটনাকে আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই একটি বইয়ের প্রচলন বাধাগ্রস্ত হওয়ার উদাহরণ হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন তার একটি নিবন্ধে। তিনি যুক্তি দেন, কোনো বই আইনগতভাবে বৈধ থাকলেও প্রকাশক বা বিক্রেতা যদি চাপ বা সম্ভাব্য ঝামেলার কারণে সেটি রাখা বা বিক্রি করা বন্ধ করে দেন, তাহলে বাস্তবে আত্ম-নিয়ন্ত্রণের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এটি লেখকের বিশ্লেষণ, কোনো সরকারি তদন্তের সিদ্ধান্ত নয়।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ। ইউপিএল বইটির বাংলা সংস্করণ প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত এবং বইটি ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ইউপিএল জানিয়েছে, বইটির সর্বশেষ পুনর্মুদ্রণ ২০২৪ সালে হয়েছিল। প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিষিদ্ধ করার কোনো সরকারি আদেশ বা আদালতের নির্দেশের তথ্য পাওয়া যায়নি।