শিউলি… : আলী ইমরান

এগারো বছর ধরে মুদি দোকানটার বারান্দায় থাকে শিউলি। শুধু রাতটা। প্রথম প্রথম দোকানি নিষেধ করতো। কিন্তু পরে আর করেনি। এক হিসেবে দোকান পাহারাও দেয়া হয়। শিউলি ভিক্ষা করে। নিজের পুরো নাম মনে নাই বাবা মা কী নাম রেখেছিল। পৃথিবীতে কিছু মানুষের নামের দরকার হয় না। তাদের আপন কেউ থাকে না নাম ধরে ডাকার। এই নামটাই বা কে রেখেছিল।

gnewsদৈনিক ইত্তেফাকের সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
শিউলির বয়স চল্লিশ পয়তাল্লিশ হবে হয়তো। সারাদিন বাইরে ভিক্ষা করে। খাবার চেয়ে খায়। রাতেই শুধু এসে বারান্দায় শোয়। ঠিক তার উল্টাপাশের আরেক দোকানের বারান্দায় থাকে করিম। এক চোখ অন্ধ। সেও ভিক্ষা করে। রাতে এসে সেখানে থাকে। করিম আছে ছয় বছর হলো। তবে শিউলি কখনো আগ বাড়িয়ে করিমের সাথে কথা বলেনি। পুরুষদের সে কাছে ঘেঁষতে দেয় না। তবুও করিম মাঝে মাঝে খুব কাছে এসে জিজ্ঞাসা করে- ও শিউলি রাতে আজ কী খাইলা। শিউলি ক্ষেপে ওঠে।

আপনার জানার কাম কী। আপনিও ফকির, আমিও ফকির। কে কী খাই তাতো ভালই জানি। আপনি আপনার জায়গায় যান। মাঝে মাঝেই করিম আপেল-কমলা থেকে শুরু করে ভালো কিছু খাবার পেলে এনে শিউলিকে দিতে চায়। কিন্তু শিউলি সেসব ছুঁয়েও দেখে না। পুরুষ মানুষরে বিশ্বাস নাই। আপেল কমলার মতো শরীর ধরতে চায়। নানান কায়দা করে, খাতির জমায় নানানভাবে।

করিম প্রায় রাতেই বারান্দায় শুয়ে গান গায়। “মনের মানুষ তুমি আর কতোকাল আন্ধা রইবা, কবে দেখবা আমারে… “। অথচ করিম নিজেই অন্ধ।
গান শুনে শিউলির মেজাজ গরম হয়। কিন্তু কিছু বলতে পারে না। খুব বিরক্ত লাগলে হাতের কাছে থাকা ছোট ইটের টুকরা ছুঁড়ে মারে। করিম গান থামিয়ে দেয়। হাইরে মাইয়া মানুষ… বলে ঘুমিয়ে পড়ে।

এইতো সেদিন শিউলির বেদম জ্বর এলো। নিজের অজান্তেই গোঙ্গাতে থাকে। করিম দুই দোকান দূরত্ব থেকেও মাঝে মাঝে শিউলের ধারে কাছে যেতে ভয় পায়। শিউলির গরম মেজাজকে সে আসলেই ভয় পায়। অথচ একই জায়গায় কতোটা দিন তারা থাকছে। ভয় ঠেলে করিম শিউলির কাছে যায়। মাথায় পানি দিয়া দেই তোমারে? শিউলে কিছু বলে না। সে একটু পানি দিতেও যায়। অমনি শিউলি চেতে ওঠে। দূরে সরেন কইলাম। নইলে মানুষ ডাকুম…

করিম চলে আসে। আসার সময় একটা আপেল তার মাথার কাছে রেখে আসে। ঠিক এভাবেই বছরের পর বছর কাটছে তাদের।

গতরাতে ফের শিউলির জ্বর হয়। সারাদিন ভিক্ষায় যেতে পারেনি। মাঝরাত নাকি ভোর শিউলি বুঝতে পারছে না। এই প্রথম তার বড্ড ভয় লাগছে। তার মনে হচ্ছে কেউ তাকে যদি ডাকতো। কেউ যদি তার সেবা করতো। সে মাথা উঁচু করে পাশের দোকানটার বারান্দায় তাকায়। দেখার চেষ্টা করে করিম লোকটা আছে কি-না। কিন্তু সেখানে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শিউলির বুকের ভেতর কেমন হাহাকার করে ওঠে। এমন কোনোদিনতো হয়নি। লোকটা আজ আসলো না যে!

শিউলির কানে করিমের গাওয়া সেই গান বাজছে। মনের মানুষ তুমি আর কতোকাল আন্ধা রইবা, কবে দেখবা আমারে… শিউলির খুব ইচ্ছে করছে করিমকে দেখতে। তার ইচ্ছে করছে যদি করিম এসে মাথার পাশে বসতো… আহা লোকটার সাথে কতই না খারাপ ব্যবহার করা হইছে।

করিমের জন্য তার কান্না পায়। এভাবেই রাতটা পার হয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠে একটা জটলা দেখতে পায় শিউলি। অনেক মানুষ। সে জ্বর শরীরেই এগিয়ে যায়। ভিড় ঠেলে দেখে করিম মরে পড়ে আছে। রাতে নাকি সেই এলাকায় গোলা*গু.লি হয়েছে। একটা গু.লি লেগেছে করিমের শরীরে।

শিউলি চলে আসে। জ্বর শরীরেই বুড়িগঙ্গার পাশে যায়। কালো পানির দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মনে হচ্ছে এই পৃথিবীতে সে এতদিন আসলে একা ছিল না। তার সঙ্গে মিশে ছিল করিমও। আজ সে করিমকে হারিয়েছে। নিজেকে তার বড্ড একা লাগছে। তার খুব ইচ্ছে করছে করিমের সঙ্গে কথা বলতে। করিম তাকে পেছন থেকে ডাকবে- শিউলি ও শিউলি । শিউলি অভিমান নিয়ে বলবে- থাক আর ডাকা লাগবো না। কাল কই আছিলা…