এক
পুত্র বিবাহযোগ্য। তাকে কি আর দামড়া হয়ে ঘুরতে-ফিরতে দেওয়া যায়? নাসিমের ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। মাতার এই ইচ্ছাটাই প্রবলভাবে সংক্রমিত হয় দাদির মধ্যে। তবে তার চেয়েও বোধ হয় বেশি ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছিল ঘটককুল। তাদের এই আক্রমণের প্রথম লক্ষ্যবস্তু ছিল নাসিম নিজে।
– কোন কন্যা ফর্সা।
– কোন কন্যা সুন্দরী।
– কোন কন্যা সুলক্ষণা।
– লম্বা চুল, মৃগনয়না, সুদন্তী – এসব তো আছেই। কারো রূপ-গুণের কোনো অভাব নেই।
আবার ঘটকেরা কবিতা লিখুক আর না লিখুক, পড়া চলবে না, তা-ও তো নয়। একজন তো আওড়িয়েই বসে, ‘এদেশে শ্যামল রং রমণীর সুনাম শুনেছি।’ আমি যে মেয়ের প্রস্তাব এনেছি, সে হলো এই কবিতার মেয়ে, প্রতিনিধিত্ব করে এদেশেরই।
বোঝো ঠ্যালা!
কাজেই এত ধরনের মেয়ে আছে, কিংবা তাদেরকে এত বিশেষণে সুভাষিত করা যায়, সে-সম্পর্কে নাসিমেরও কোনো ধারণা ছিল না। কিংবা সর্বত্রই পিতামাতারা কি এতটাই দায়গ্রস্ত যে, কন্যা প্রস্তুতই আছে, কেবল গেলেই হবে। দেনদরবারে কিছু আটকাবে না।
নাসিমের পৈতৃক বাড়ি গ্রামে। পাশের গ্রামেই সম্পর্কসূত্রে থাকেন নাসিমের এক নানা। গ্রামের স্কুলে লেখাপড়া করার সময়েই সে সারা এলাকা চষে বেড়াত। এ-গ্রামে সে-গ্রামে ফুটবল, হা-ডু-ডু, ভলিবল, গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা খেলা চলত। এসব খেলা তেমন ব্যয়সাপেক্ষ ছিল না। একটা বল হলেই ফুটবল-ভলিবল হয়ে যায়। আর হা-ডু-ডু গোল্লাছুট দাড়িয়াবান্ধা খেলতে তো শরীর ছাড়া আর কিছুই লাগে না। আবার শীতকালে কখনো কখনো ব্যাডমিন্টন, খেলাটা যদিও খরচাপাতির, তারও ব্যবস্থা হতো। র্যাকেট দুমড়ে-মুচড়ে গেছে তো কী হয়েছে, খেলা তো আর আটকাচ্ছে না। ফেদার বিনষ্ট হয়ে গেছে, মুরগির পালক দিয়ে মেরামত করে নেওয়াও কোনো ব্যাপার নয়। জাল দিয়ে মাছ ধরা হয়। তা-ই সাইজমতো কেটে বাঁশ গেড়ে ঝুলিয়ে দিলেই ইংরেজি নেট বলে চালিয়ে দেওয়াটাও ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। তারপর শহরে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের অজুহাতে হলে-হোস্টেলে থাকলে ছুটিছাটাতে বাড়ি আসার তো আর কমতি ছিল না। তখনো এসব করে বেড়ান চলত।
এবারো তাই হয়েছে। নাসিমের কর্মস্থল উত্তরবঙ্গের এক সীমান্তবর্তী জেলা শহর। সুযোগ-সুবিধামতো বাড়িতে চলে আসা-যাওয়া। তবে এবার আসার একটা উপলক্ষ আছে। এদেশে শীতকাল তো বেশিদিন থাকে না।
তার মা খোদেজা খাতুন। লেখাপড়ার তত চল ছিল না তখন, পড়তে জানা আর লিখতে পারাই ছিল যথেষ্ট গুণ। তবে মায়ের হস্তাক্ষরটা ভারি সুন্দর। লিখেছিলেন – ‘খেজুর রসে ভেজানো দুধপিঠা খেতে একবার আসবি না।’
মাতৃ-আদেশ শিরোধার্য। আর বাড়িতে আসা তো আসলে নেক-টাই বাঁধা জীবন থেকে মুক্তি। সাইকেল নিয়ে এলাকা ঘুরতে বেরিয়ে নাসিম দেখে নানাদের বাড়ির লাগালাগি এক ফাঁকা মাঠে ব্যাডমিন্টন কোর্ট কাটা হয়েছে। খেলাও চলছে।
যারা খেলছে, তারা তো খেলছেই। আর অপেক্ষমাণদের সংখ্যাও কম নয়। তাকে দেখেই ওরা হইহই করে ওঠে। খেলা ছেড়ে দিয়ে একজন এসে একটা র্যাকেট ধরিয়ে দেয়। আপত্তি করার কিছু নেই। কিন্তু দেখে র্যাকেটটা দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। তখন বলে, ‘এই র্যাকেট দিয়ে কি খেলা যাবে? ঠিক আছে, আমি একটা র্যাকেট কেনার টাকা দেব। শহর থেকে নিয়ে এসো।’
পাশ থেকে আরেকজন তুলনামূলক ভালো একটা র্যাকেট এনে বলে, ‘এইটা নেন।’ – তারপর বলে, ‘নাসিমভাই, এক ডজন ফেদারও দিয়েন।’ এ-দাবি ওরা করতেই পারে।
বিকেল পড়ে আসছে। হিমেল বাতাসও বইছে। বেশিক্ষণ খেলা গেল না। জামার ভেতরের গেঞ্জিও ঘামে একটু একটু ভিজে উঠছে। কাজেই কোর্ট থেকে বেরিয়ে নাসিম ঢোকে নানাবাড়ির অন্দরে। এদিকে যখন এসেছেই, উদ্দেশ্য নানির সঙ্গে দেখা করে যাওয়া। ‘না পাওয়া গেলে নাতি-ভাতার’ – বলে একটা কথা চালু আছে বটে! সেটা না হলেও নানি-নাতির সম্পর্ক নাকি অনেকটা মধুর রসে সিক্ত।
বাড়ির বাইরে কাছারি ঘরের সাইনবোর্ডটা আগের মতোই স্বমহিমায় বিরাজ করছে – ওপরে ‘ডাক্তার সুজাবত আলী, এল.এম.এফ.।’ তার নিচে – ‘সকল প্রকার রোগের সুচিকিৎসা করা হয়।’ ভেতরে গিয়ে দেখে বাড়ির উঠানে নারী-পুরুষদের এক ভালোই সমাবেশ। সেখানে প্রবীণ-প্রবীণা থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী-বয়সিনীরাও রয়েছে। নানা বয়সের ‘টিন’-এর এজারদেরও উপস্থিতি গোচরীভূত। বর্ষার সময়, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে নৌকায় ভেসে, নাইওর খাওয়ার রীতিটাই প্রচলিত। কিন্তু শীতকালে? একেবারে রসে ভেজানো দুধ-পিঠা খাওয়ার জন্যই এসেছে, নির্দিষ্ট করে, বোধ করি, তা বলা যাবে না। তবে এসেছে। নানির সঙ্গে দেখা করতে এসে এত লোকের মাঝে পড়ে যাওয়াটা নাসিমের জন্য এমনিতেই অস্বস্তিকর।
কিন্তু শোনে, একজন বলছে, ‘তুমি নাসিম না? চেনাই যায় না। এত বড় হয়ে গেছো?’
কণ্ঠস্বরের অধিকারিণীর দিকে ভালো করে তাকায় নাসিম। দেখে, যে বলছে, সে-ও বড় হয়ে গেছে। সুজাবত নানার মেয়ে। তার মানে খালা। নাসিমের সঙ্গে বয়সের ফারাকও তেমন বেশি নয়। বয়স্থা হতে না হতেই তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। সে-ও প্রায় এক যুগেরও আগে।
নাসিম বলে, ‘তুমি তো দরিয়া খালা? চেনা তো তোমাকেও যায় না। ফ্রক পরে ঘুরে বেড়াতে। একসঙ্গে দারিয়াবান্ধা-গোল্লাছুট খেলেছি।’
দরিয়া কিছু বলার আগেই মঞ্চে অবতীর্ণ হন সুজাবত আলী। সেটা বিপজ্জনক বলে তা আশঙ্কিত করে তোলে নাসিমকে। কেননা, এটা তার অজ্ঞাত নয় যে, তিনি মাঝেমধ্যেই তাদের বাড়িতে যান। উদ্দেশ্য, তার বিবাহ-সম্পর্ক স্থাপন করা। এবার তাকে হাতেনাতে পেয়ে সে-প্রসঙ্গ যে উপস্থাপন করবেন, তা নিশ্চিত। হয়ও তাই।
তিনি বলেন, ‘নাতি, এবার দেখছি নিজে থেকেই ধরা দিতে এলে? কালকেই তোমাদের বাড়ি গিয়েছিলাম। তুমি ছিলে না। তাই তোমার সঙ্গে দেখা হয়নি। বুবুজান, মানে তোমার দাদি, সবকিছু তো বলেই দিয়েছেন। সুতরাং আর দেরি নয়, শুভ কাজে বিলম্ব করা। বরকত একদম কমে যায়।’ শুভ কাজটির কথা নির্দিষ্ট করে না বললেও তার অর্থ না বোঝারও কিছু নেই।
সামনে অধিকাংশই অপরিচিত নরনারী। তাদের সামনে সে-ও এক অপরিচিত নবাগত। সুতরাং চারদিকে এমনিতেই একটা অর্থপূর্ণ নীরবতা বিরাজমান। কিন্তু নানার কথাবার্তা যে-পথে এগোচ্ছে, তাঁকে থামিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। তাছাড়া অফেন্স তো কোনো না কোনো সময়ে ‘বেস্ট ডিফেন্স’ হয়েই যায়।
তাই সে কৌতুক-মেশানো গলায় বলে, ‘নানা, আমি তো নানির সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম। আপনার তো এখন ডিসপেন্সারিতে থাকার কথা। এখানকার লোকজনের, বোধ করি, কোনো অসুখ-বিসুখ হচ্ছে না। নাকি এখন আর রোগী মারবেন না বলে ডাক্তারি ছেড়ে দিয়েছেন?’
সুজাবত আলীও কম যান না। বলেন, ‘এবার তাহলে ঠিক ধরেছো। চলো, কালকেই ব্যবস্থা করে ফেলি।’
নাসিম কৌতুকটা চালাতেই থাকে। বলে, ‘কীসের ব্যবস্থা?’
সুজাবত আলী বলেন, ‘তোমার জন্য তো এখন একটা ব্যবস্থাই বাকি আছে। নাকি বুঝেও আমার মুখ থেকে শুনতে চাচ্ছো?’
নাসিম দেখে, সামনে যারাই থাক, যা-ই মনে করুক, লাজলজ্জার কোনো সুযোগ নেই। নানা বেমক্কা আর কী কী বলে ফেলবেন তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? তাই বলে, ‘বিবাহের?’
ওর ওই কথা উপস্থিত নিশ্চুপ থাকা অপরিচিত-অপরিচিতাদেরও হাস্যরসের খোরাক জোগায়। মুহূর্তমধ্যে পরিবেশটাও যায় বদলে। তবে রীতিমতো সিরিয়াস হয়ে পড়েন সুজাবত আলী। বলেন, ‘বিয়ের নয়। বিয়ের নয়। আমি বলেছি, মেয়ে দেখার ব্যবস্থা করার কথা। নাতি, লাখ কথা খরচ হলে তবে তো বিয়ে। দেখাই হলো না। কথা-খরচ তো পরে।’
নাসিম বলে, ‘নানা, লাখ কথা খরচ করা তো সময়েরও ব্যাপার। আর যখন তা করতেই হবে, তখন না হয় এখন থেকেই হোক।’
সুজাবত আলী বলেন, ‘কী রকম?’
নাসিম বলে, ‘রকম হলো, এখন তো সব রীতিনীতি পালটে যাচ্ছে। আমি কেন যাব দেখার জন্য মেয়ের বাড়ি? নাকি বিয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ঘরজামাই থাকারও ব্যবস্থা করে দেবেন?’
এটাও একটা হাসির কথাই। তবে তা উচ্চৈঃস্বরে না হলেও আলামত টের পাওয়া যায়। সুজাবত আলী বলেন, ‘না, তা কেন হবে? তুমি কেন যাবে ঘরজামাই থাকতে? তোমার কি ঘরবাড়ি নেই?’
নাসিম বলে, ‘আছে বলেই তো বলছি, ঘরজামাই থাকলে না হয় কোন ঘরে আমি থাকব, সেই ঘরও আমার পছন্দ কি না, তা দেখার প্রয়োজন হতো। মেয়ের বাড়ি না গেলে তো পছন্দ করা সম্ভব নয়। তখন তো যেতেই হতো।’
সুজাবত আলী নম্র স্বভাবের মানুষ। ঘটকালি করার ঝোঁকটা ইদানীং বেড়ে গেলেও এলাকায় মানুষ হিসেবে তাঁর সুনাম যথেষ্ট। তিনি আর দশটা ঘটকের মতো নন। বিয়ের বয়স হওয়া নিজেদের আত্মীয়স্বজনের ছেলেমেয়েদের বিবাহকর্ম সম্পাদন করাটাকে তিনি একটা পবিত্র কর্তব্য বলে বিবেচনা করেন। এ-পক্ষের কথা ও-পক্ষের কাছে কিছুটা কমিয়ে অথবা বাড়িয়ে, আবার ও-পক্ষের কথা এ-পক্ষের কাছে একইভাবে বাড়িয়ে-কমিয়ে নিজের উপার্জনটা হাতিয়ে নেওয়ার কোনো প্রবণতা তাঁর মধ্যে নেই। নাসিম তাঁর নাতি। বিবাহের বয়স হয়েছে। এক্ষেত্রে তাঁর মুখ্য বিবেচনাও সেটাই। কিন্তু নাসিমের কথাবার্তা শুনে তাঁর মনে হয়, সে কি তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করছে? হতেও পারে। আজকালকার লেখাপড়া জানা ছেলেরা আবার একটু বেয়াদব ধরনেরও হয়! তিনি বলেন, ‘নানা-নাতির কথা! তুমি ঠাট্টাই করো আর তামাশাই করো, কোনো কাজ হবে না। এবার বলো, তোমার মনের কথা কী?’
নাসিমও ভেবে দেখে এ-চ্যাপ্টার এখানেই বন্ধ করা দরকার। সে বলে, ‘নানা, নানা-নাতির সম্পর্কটা অনেক সময়েই ঠাট্টা-তামাশার হয়ে যায়। ধরে নিন তাই। এটা সত্য, সামাজিক ও পারিবারিক প্রয়োজনেই আমার বিয়ে আমি ঠেকিয়ে রাখতে পারব না। কিন্তু এটাও সত্য, আয়োজন করে কনে দেখতে যাওয়াও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি দেখেছি, কনে দেখার নামে একটা মেয়েকে কীভাবে অসম্মানিত করা হয়? তার চুল টেনে দেখা হয় পরচুলা কি না। দাঁত-বাঁধানো কি না, পরীক্ষা হয় তারও। গায়ে রং লাগানো কি না, সাবান-পানি দিয়ে তা ধোয়াও হয়। হাঁটতে পারে কি না, তাও। এছাড়া, রান্নাবাটি, সুচিকর্ম – হালে গানবাজনা – এগুলো তো আছেই।’ এবার একটু থেমে বলে, ‘নানা, প্রায় বক্তৃতাই তো হয়ে যাচ্ছে, তাই কথাটা এভাবেই শেষ করি, তা হলো, একটা মেয়েকে বিয়ের পর এসে তো শ্বশুরবাড়িতেই থাকতে হয়। তাই ঘরদোর তো তারই দেখা দরকার। শুধু অভিভাবকবৃন্দ দেখলেই কি চলে? কাজেই, তাকেই নিয়ে আসুন না কেন আমাদের বাড়িতে। এসে ঘরদোর দেখবে।’ এটুকু বলে একটু হেসেই ফেলে নাসিম, ‘আমাকেও না হয় দেখে যাবে। পছন্দ হলে বিয়ে করবে। তবে ছেলেরা যেমন বিয়ে করে নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়, এক্ষেত্রে আমাকে তো আর নিয়ে যেতে পারবে না। ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়েছে শ্বশুরবাড়ি হলো মেয়েদের নিজের বাড়ি। সুতরাং, সে থেকে যাবে।’ বলেই কোনো দিকে না তাকিয়ে ঝটিতি বেরিয়ে পড়ে নাসিম। বাকিদের বাক্যস্ফূর্তি হয় না।
সব সময় যা হয়, এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। পরদিন বেলা একটু বাড়তেই বেরিয়ে পড়েছিল নাসিম। শীতের সময় সাইকেলে চড়ে রোদে ঘুরে বেড়াতেও বেশ ভালো লাগে। আঁকাবাঁকা সড়ক। গরুর গাড়ির চাকা বসে বসে গর্ত হয়ে দুধার দিয়ে এগিয়ে গেছে যেখানে সড়কের শেষ, সে-পর্যন্ত। রাতের বেলা গাড়ি চালাতে গিয়ে গাড়োয়ানরা তাতে চাকা ঢুকিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমায়। ঘাড়ে জোয়াল নিয়ে অবলা জানোয়ার দুটোও সেই নিরিখ ধরে চাকা ঘুরাতে ঘুরাতে এগিয়ে চলে। দুপুরের আগেই নাসিম গিয়ে হাজির হয়েছিল হুরাসাগরের চরে। কী করে স্থানীয় এই নদীর নামটির সঙ্গে সাগর যুক্ত হয়েছিল, গবেষণা করেও বোধহয় তা উদ্ধার করা সম্ভব নয়। নিশ্চয়ই একদিন প্লাবন ডাকত। দু-কূল ছাপিয়ে পানি ভাসিয়ে দিত ঘরবাড়ি। এবার এসে দেখে, ছোটবেলা থেকে যে-দৃশ্য দেখে আসছে, তার মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। পানির ধারা বরং আরো কৃশ হয়েছে। নৌকায় পার হওয়ার কোনো ব্যাপার নেই। অনেক জায়গাতেই পানি যথেষ্ট কম। লোকজন হাঁটুর ওপরে লুঙ্গি তুলে নির্বিবাদে করছে ওপার-এপার। চর বড় হয়ে গেছে। রোদের ঝিলিক খেয়ে চিকচিক বালি ছড়াচ্ছে যেন হিরের দ্যুতি।
তবে অবস্থা যাই হোক, মজার কিছু জুটে যেতে বিলম্ব হয় না। নাসিম এসে দেখল তাই হয়েছে। পানি কম হলেও তোরা জাল ফেলে মাছ ধরা যায়। গোসল করতে এসে অনেকেই ও-কাজ করে থাকে। ছোট-বড় – পরিমাণ গণনীয় নয়। দুপুরবেলার মাছ-ভাতটা তো হয়। সেরকম জাল ফেলা একজন মাছের বদলে পেয়েছে কাছিম। জ্যান্ত। ক্ষিপ্ত হয়ে গেছে ধরা পড়ে। লম্বা ঠোঁট দিয়ে ঠোক্কর দিয়ে রক্তাক্তও করে দিয়েছে একজনকে। ভিড় জমে যেতে দেরি হয়নি। ছোট ছেলেমেয়েরা খেলছিল বালুময় চরে। বালি তো শক্ত নয়। দৌড়াদৌড়ি করার সময় পা ঢুকে পড়ে। সেটা বেশ মজার। ঠান্ডার সময় বলে গরমও হয়নি। অনেকে আবার কাছিম নামক জীব আগে কখনো দেখেওনি। তাদের জন্য এটা হয়ে দাঁড়ায় বাড়তি উল্লাসের বিষয়। গোসল-টোসলের জন্য যারা এসেছিল তারা তো আছেই, আবার যারা হেঁটে নদী পারাপার করছিল, তারাও যাত্রাবিরতি করে দাঁড়িয়ে যায়। এসব খবর ছড়াতে দেরি হয় না, আরো লোক এসে জোটে। নাসিম যখন এসে উপস্থিত হয়, তখন জীবটা নিয়ে কী করা হবে, তার সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছিল না। যে-লোকটার জালে ধরা পড়েছে, হিসাবে মালিকানা তার। আবার তার জালের অনেকটা কাছিম তুলতে গিয়ে ছিঁড়েও গেছে। সেটা একটা ক্ষতির কারণ। কিন্তু অন্যদের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে, জীবটার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেওয়ার অধিকার তাদের সবার। প্রবল মতটা হলো – ছাইড়া দাও। ছাইড়া দাও। কাছিম আবার খায় নাকি? আরেক দল বলছে – শহরে নিয়া গেলে বিক্রি হয়্যা যাবে। ওইহানে খাওয়ার লোক আছে। একজন বলে – কে নিয়া যাবে? সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন বলে – ক্যান? রইসার জালে ধরা পড়চে। ও নিয়া যাবো। শহর মানে মহকুমা সদর। ওখান থেকে না হলেও মাইল তিরিশেক দূরে। ট্রেনে যাওয়া যায়। কিন্তু তার জন্য স্টেশনে যেতে আবার হাঁটতে হয় আট-দশ মাইল। সেখানে কাছিমটা নিয়ে যেতে হবে ঘাড়ে করে। গাড়িতে যে ভিড়। দাঁড়িয়েও যেতে হবে ঘাড়ে করেই। ট্রেন ভাড়া আছে। রাতে যদি হোটেলে থাকতে হয়! চৌকিতে চিৎ হয়ে শুলে রেট বেশি। আর কাত হয়ে থাকলে কম। কিন্তু সারারাত কি কেবল ডান কাত-বাঁ কাত হয়ে থাকা যায়। তারপর বেচা-বিক্রি কী হবে, তারও কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। রইসা, মানে, রইস, তাই দোনোমোনো করে। এদিকে জালটাও ছিঁড়ে গেছে। সারাতে গেলে তার জন্য টাকা লাগবে। নাসিম প্রায় সবারই চেনাজানা। তাকে দেখে ওদের মধ্যেও বয়ে যায় কিছুটা উৎসাহের জোয়ার। সুতরাং সব শুনে নাসিমকেও অবতীর্ণ হতে হয় মঞ্চে। সে বলে, ‘তাই তো অবলা জীব। হাঁস-মুরগি-গরু-ছাগল নয় যে পুষবে। তার চেয়ে পানিতে ছেড়ে দেওয়াই ভালো। কি বলো?’ বলে সবার দিকে তাকায়। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। সবারই কাজকর্ম আছে। দাঁড়িয়ে আর কতক্ষণ এই তামাশা দেখা যায়। তাদেরও মুখে আসে স্বস্তির ভাব। রইস একটা শেষ চেষ্টা করে, বলে, ‘মিয়া ভাই, আমার জালটা?’ তাই তো, জালেরও একটা বিহিত করা দরকার। নাসিম তখন রাহেলের দিকে চেয়ে বলে, ‘রাহেল, তোদের গ্রামে যুবক সমিতি আছে না? সেখান থেকে, দেখ তো জালটা সেরে দিতে পারিস নাকি?’ দেবী বিসর্জনের মতো আয়োজন করে যখন কাছিমের জীবনদানের ব্যবস্থা হচ্ছিল, সাব্যস্তমতে নাসিমই পানিতে ছেড়ে দিচ্ছিল, তখন আবার কিছুটা দূরে নানাবিধ কচিকণ্ঠের উল্লাসধ্বনি ভেসে আসে। – পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে। …. মজা যতই হোক, বড়দের মাঝে ওরা বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। তাই তারা আবার খেলার জগতে ফিরে যায়। ছোটাছুটি করতে গিয়ে ওদেরই চোখে পড়ে। কী পাওয়া গেছে? নাসিম গিয়ে দেখে, না হলেও ডজন দেড়েক কাছিমের ডিম। বালির খাঁড়ির ভেতর একটা লুকানো জায়গায়, ধরেই নেওয়া যায়, ওই কাছিমটাই বংশবৃদ্ধির কাজে নিরত হয়েছিল। কাছিম খাওয়াতে সমস্যা থাকলেও ডিম খাওয়া কে ঠেকাবে? ততক্ষণে ওদের মধ্যে ভাগাভাগিও হয়ে গেছে। কাড়াকাড়ি করতে গিয়ে দু-চারটে ভেঙেছে। কাছিমটাকে বাঁচানো গেল। কিন্তু তার প্রজননকর্মের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখা গেল না। নাসিম ভাবে, কাছিমের আয়ু না হলেও তিনশো বছর। তার আর কত বছর বাকি আছে, তা তো জানা যাবে না। তবে যত বৃদ্ধই হোক, আগামী মেটিং সিজন পর্যন্ত ও নিশ্চয়ই বাঁচবে, এ-আশা তো করাই যায়। রাহেলরা বলেছিল, ডাল-ভাত, যা হোক, দুপুরে ওদের সঙ্গেই খেয়ে নিতে। নাসিম রাজি হয়নি। বাড়িতে থাকা হয় না। ওর নাওয়া-খাওয়ার প্রতি মায়ের মনোযোগটা বেড়েছে। ছোটবেলায় তো খেলে খাও, না খেলেও কিছু দেখার নেই। চৌদ্দ রকমের কাজ সংসারে। ছেলেপেলের খবর অত রাখা যায়!
এখনকার দিন ছোট। বেলা দুটোর পর থেকেই বিকেল নামতে থাকে। নাসিমের আসতে আসতে আরো ঘণ্টাখানেক পেরিয়ে যায়। এসে দেখে বাড়িতে অতিথি সমাগম ঘটেছে। কাছারিঘরের সামনের বারন্দায় আব্বাজান, বড় চাচাজান, ছোট চাচাজান আছেন। তাঁদের মধ্যে বিরাজ করছেন সুজাবত আলী নানা। আরো আছেন কালকে তাঁর বাড়িতেই দেখা দুজন বয়স্ক ভদ্রলোক। সেরেছে! সুজাবত আলী নানা একা থাকাই নাসিমের জন্য
বিবাহ-সংক্রান্ত জটিলতা সৃষ্টির উৎস। তারপর আবার এরা দুজন? কালকে যেসব কথাবার্তা বলে এসেছে, তার
সালিশ-বিচার বসবে নাকি? তাকে দেখে সুজাবত আলী হাস্যমুখে বলেন, ‘এই যে নাতি, এসো এসো। শুনলাম, সকালে বেরিয়েছো? ফিরছো সন্ধ্যা তো হয়ে এলো?
বিবাহ-শাদির পরেও এরকম হবে নাকি? এবার আর মেয়ে দেখা নয়, একবারে বিবাহ-শাদি?’ অন্য সময় হলে একটা সরস জবাব হয়তো দেওয়া যেত। যেমন, নিজের পাতে যখন ভাত থাকে না, তখন বলা হয়, আরে, কোথায় গেলি? চাচার পাতে ভাত দে। আর একথা বলার অর্থই হলো নিজের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করানো। সেভাবেই বলা যেত, আপনার নিজেরই বুঝি বিবাহের বাসনা জেগেছে। সরাসরি বলতে তো পারছেন না, তাই একে-ওকে দেখাচ্ছেন। কিন্তু সামনেই বাবা-চাচারা বসে। আরো দুজন, যাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো পরিচয় হয়নি। নাসিম শুধু বলে, ‘নানা, আপনার আসল পেশা ডাক্তারি, না ঘটকালি, এখনো বুঝে উঠতে পারলাম না।’ তখন ছোট চাচা নেহাল হোসেন বলেন, ‘খালু, ওর সঙ্গে কথায় পারবেন না। এখন কথাটা বন্ধ করতে পারেন কি না দেখেন।’ বলেই অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকান সুজাবত আলীর দিকে। সুজাবত আলী আগের হাসিমুখ নিয়েই বলেন, ‘এবার বন্ধ হবে।’ তবে কথাবার্তা সে-মুহূর্তে আর এগোয় না। সুজাবত আলীর কথার শানে নজুল কী হতে পারে, নাসিম তা ভেবে দেখার আগেই বাড়ির ভেতর থেকে খবর আসে, মা তাকে ডেকে পাাঠিয়েছেন।
দুই
বিবাহিতা মেয়ে দরিয়াকে অতিথি হিসেবে ধরলে সে-সহ আর যারা যারা সুজাবত আলীর বাড়িতে এসেছে, তাদের তো একজন তার জামাতা, মানে দরিয়ার স্বামী মনসুর রহমান আর হলো দরিয়ার ননদ রহমতুন্নেসা ও তার স্বামী গোলাম সারোয়ার। তাদের বিভিন্ন বয়সের ছেলেমেয়েও আছে।
গত সন্ধ্যায় নাসিম তো বেরিয়ে গেল। ঝড় তুলে না গেলেও দারুণ একটা কৌতূহল সৃষ্টি করে গেল সবার মনে। রহমতুন্নেসাই প্রথম কথা বললেন, ‘নানা-নাতির সম্পর্কটা বোঝা গেল, কিন্তু ছেলেটি কে?’ সুজাবত আলী বলেন, ‘আমাদের এক আত্মীয়পরিবার আছে। আমার এক বুবুজানের সেখানে বিয়ে হয়েছিল। তার নাতি।’ নাতি তো সুজাবত আলীরও। দুজনের কথা শুনে তা অজ্ঞাত থাকেনি। তবু একজন বিবাহযোগ্য ছেলের পরিচয় নাতির বৃত্তেই ঘুরপাক খায়। পরিষ্কার হয় না কিছু। তবে ও-পর্যন্ত বলে সুজাবত আলী ক্ষান্ত দেন না। জামাতার দিকে তাকিয়ে আরো বলেন, ‘মনসুর, তুমি তো ওদের বাড়ি গেছো। কেন, বিয়ের পর বুবুজান তো দরিয়া আর তোমাকে দাওয়াত করে নিয়ে গিয়েছিল।’ বিয়ের পর নতুন জামাইকে খাওয়ানোর একটা প্রথা আছে। চাচাশ্বশুর-মামাশ্বশুর-ফুপাশ্বশুর – এই রকম যত শ্বশুরকুল আছে, তাদের ধুম পড়ে যায় জামাই খাওয়ানোর। অনেক সময়েই তা এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। মনসুর রহমান মনে করতে পারেন না কোন বাড়িটার কথা তার শ্বশুর সাহেব বলছেন। তিনি বলেন, ‘ঠিক খেয়াল নেই।’ তার সম্বন্ধি বউ আমেনা খাতুন চুকলি কাটে, ‘বিয়ের কথা মনে আছে তো?’ মনসুর রহমান আস্তে করে তাকে বলেন, ‘আপনার ননদের জন্য কি তা ভোলার উপায় আছে?’ একথা দরিয়া শুনলে কী হতো বলা মুশকিল। তবে সে ঝংকার করে বলে ওঠে, ‘কেন আপনার মনে নেই, ফুপি বড় বড় চিতলের পেটি খাইয়েছিল। গামলায় খাসির তেলের দলা ভাসছিল।’ দাওয়াত করে নিয়ে গিয়ে কেউ তো আর খারাপ খাওয়ায় না। সাধ্য-সামর্থ্যরে সবটুকু ঢেলে দিয়েই পূর্ণ করতে চায় আয়োজন। আদর-আপ্যায়নের মাত্রারও কোনো কমতি থাকে না। তারপরও সেখানকার পরিবেশ ও পরিবেশন ছিল একটু আলাদা রকমের। যেতেও হয়েছিল গরুর গাড়িতে চড়ে গ্রামান্তরে।
শ্বশুর-শাশুড়ি-সম্বন্ধি-শ্যালক-শ্যালিকারাও সবাই ছিল। তাদের শরিকান্ত লোকজনেরাও ছিল। একটা উৎসব উৎসব ভাব। আসার সময় পাঞ্জাবির জন্য গরদের কাপড় তাকে আর দরিয়ার জন্য দেওয়া হয়েছিল রেশমি শাড়ি। দরিয়ার মনেও বোধহয় আত্মতৃপ্তির বোধ কাজ করছিল, ‘দেখতে তো পেলে আমার বাবার বাড়ির আত্মীয়স্বজনের ঠাঁট কেমন?’ মনসুর রহমান বলেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। অনেক দিন আগের কথা। ছেলেটা, তা হলে সেই বাড়ির। আপনাদের এখানে দেখছি বেশ আসা-যাওয়া করে।’
– ‘আসা-যাওয়া করে মানে?’ ততক্ষণে দরিয়ার মনে বাল্যস্মৃতি উথলে উঠেছে। সে বলে, ‘নাসিম তো ছোটবেলায় বাড়িতে থাকার সময় সুযোগ পেলেই আমাদের এখানে আসত। হড়হড়িয়ে নারকেল গাছে উঠে ডাব পেরে খাওয়াত।’ রহমতুন্নেসা বলেন, ‘আর কি পেরে খাওয়াত?’ আত্মস্মৃতিতে মগ্ন দরিয়া বলে, ‘কেন কামরাঙা পেরে দিত – আর সেই কামরাঙা খেয়েই …।’ গোলাম সারোয়ারও ঢুকে পড়েন বাক্যালাপে, ‘ভাবি, এমন রাঙা হয়ে গিয়েছিলেন যে ভাইজান দেখতে এসে আর ফিরে যাননি। আপনাকে একবারে সঙ্গে করেই নিয়ে যান।’
– ‘ধ্যাৎ, কার মধ্যে কী?’ কপট রাগ ফুটে বেরোয় দরিয়ার চোখে-মুখে। কিন্তু আরো কিছু বলার আগেই স্ত্রীকে থামিয়ে দেন মনসুর রহমান। বলেন, ‘বাড়িতে থাকতে বলছো যে। এখন কোথায় থাকে?’ ঠিক উত্তরটা নির্দিষ্ট করে দরিয়ার জানা নেই। তাই সে বলে, ‘আব্বাজান জানে।’ সুজাবত আলী বলেন, ‘থাকে তো দিনাজপুরে।’ এটুকু বলে একটু থেমে আবার বলেন, ‘এবার একটা বিয়ে দিয়ে দিতে পারলেই ষোলোকলা পূর্ণ হয়।’ বিয়ে নিয়ে কথা শুরু হয়েছিল, বিয়েতেই এসে ঠেকে। রহমতুন্নেসা বলেন, ‘ছেলের এমন গুণপনার কথা – এমন গাছে ওঠার খবর শুনলে কেউ মেয়ে বিয়ে দেবে, মনে হয় না।’ মনসুর রহমান বলেন, ‘শহরে তো আজকাল শুনি কারো বাড়িতে নয়, হোটেল-রেস্টুরেন্টে বসেও মেয়ে দেখাদেখি শুরু হয়েছে।’ গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘তবে বিলটা দিতে হয় মেয়েপক্ষকেই।’ মনসুর রহমান বলেন, ‘এরপর ভাগাভাগি শুরু হবে। কোনো পক্ষেরই কোনো খেদ থাকবে না। গ্রামদেশে তো আর সেসব হবে না। মেয়ের বাড়ি যাওয়াটা তো ছেলেপক্ষের হক। তারা কি সেটা ছেড়ে দেবে?’ সুজাবত আলীর স্ত্রী তাহেরা খাতুন বলেন, ‘বাদ দাও তো এসব। ঘরে চলো। ঠান্ডা নেমে এসেছে। কোথায় বসে একটু গল্পগুজব হবে। তা না নাসিম এসে সব গণ্ডগোল করে দিয়ে গেল।’
দরিয়া এবার বেমক্কা বলে বসে, ‘সে যে পারে খরচ দেবে, না পারে না দিক। তার চেয়ে চলো না কালকে আমরা নাসিমদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি।’ স্বামীর দিকে তাকিয়ে আরো বলে, ‘আগে কত গেছি। ভাইসাহেব-রহমতুন বুবুদেরও একটা নতুন জায়গা দেখা হবে।’ দরিয়ার একথায় সুজাবত আলী রীতিমতো উৎসাহিত হয়ে পড়েন। বলেন, ‘মনসুর, কি বলো?’ সর্বাগ্রে জামাতার অনুমোদনটাই তাঁর প্রয়োজন। তাহেরা খাতুন বলেন, ‘গেলে মন্দ হয় না। বুবুজানের সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয় নাই। মানুষের হায়াত-মউত! কখন কী হয়? শ্বশুরবাড়িতে এসে কেবল বসে থাকা?’ মনসুর রহমান ভগ্নিপতিকে বলেন, ‘সারোয়ার, কী বলো? আমার কিছু কিছু মনে আছে। জায়গাটা তোমার খারাপ লাগবে না?’ গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘সে তো ঠিকই আছে। কিন্তু একটা জায়গায় হঠাৎ যাওয়া?’ এ-কথার জবাব সুজাবত আলীই দেন। তিনি গলা ছেড়ে দিয়ে বলেন, ‘সেসব নিয়ে তুমি ভেবো না। আমার বুবুজানকে তুমি চেনো না? তিনি যে কত খুশি হবেন, গেলেই বুঝতে পারবে।’ দরিয়া ননদকে বলে, ‘আপনি কিছু বলছেন না যে -।’ রহমতুন্নেসা বলে, ‘আমি আর কী বলব? সবাই গেলে আমি কি আর না গিয়ে পারব?’ নতুন জায়গায় যাওয়ার খবরে ছেলেমেয়েরাও পুলকিত বোধ করে।
ওইদিন নাসিম বাড়িতে ফেরার আগেই তার অভিভাবকেরা বিবাহের সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেছিলেন। মেয়ে হলে, না হয় ঘোষণাটা দিয়েই দেওয়া যেত। কেননা, এ-বিষয়ে এখনো তাদের কথাই চূড়ান্ত। তাদের অভিলাষের কাছে মেয়েদের নতি স্বীকার না করা ছাড়া উপায় নেই। কবুল করতে হয়; সেটাও বোধ করি, ভিড়-ভাট্টার মধ্যে, তাদের পক্ষ থেকে
দাদি-নানিরাই সেরে ফেলেন। মেয়েদের কাজ হলো সেজেগুঁজে বসে থাকা আর শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার সময় কান্নাকাটি করা। যতই তাদের বোঝানো হোক – যাচ্ছিস তো নিজের বাড়িতে, – স্বামীই তো সংসারে সব। ছোটবেলা থেকে তারা নিজেও জানে, একদিন তো চলে যেতেই হবে; কিন্তু তাতে প্রবোধ না মানাটা কতটা আন্তরিক, মেয়ে হয়ে না জন্মালে পুরুষদের তা উপলব্ধি করা অসম্ভব। কিন্তু এক্ষেত্রে তা করা যাচ্ছিল না। কেননা, ছেলে সাবালক। একটা মতামত তো অন্ততপক্ষে নেওয়া দরকার।
সুজাবত আলীদের আসতে বেলা দশটার মতো লেগে গিয়েছিল। মেয়েরা ছিল দুটো গরুর গাড়িতে। তার নিজের যাতায়াতের জন্য আছে ব্যাটারি লাগানো সাইকেল। তা থেকে আবার ভট্ভট্ শব্দ বেরোয়। সেই শব্দ শুনেই লোকে টের পায় ডাক্তার সাহেব এসেছে। তবে তিনি নিজের মেয়ে ও মেয়ের ননদের স্বামীদেরও বলেছিলেন গরুর গাড়িতে উঠতে। বলেছিলেন, ‘সড়ক রাস্তা। ভাঙাচোরা হলেও চাকা বসে বসে যে নিরিখ হয়ে গেছে, তা সমান। ঠোক্কর খেতে খেতে যেতে হবে না।’ কিন্তু ওরা রাজি হয়নি। গোলাম সারোয়ার বলেছিলেন, ‘না, খালু, মাইল তিনেকই তো রাস্তা। রোদে রোদে হেঁটে যেতে ভালোই লাগবে।’ মনসুর রহমানও বলেন, ‘আব্বাজান, আপনি চিন্তা করবেন না। সব জায়গায় আমরা তো এ-রাস্তা হেঁটেই যাই।’ গাড়ি অবশ্য রাতেই সুজাবত আলী ঠিক করে রেখেছিলেন। তিনি বেরোতে চেয়েছিলেন আরো আগে। ছোটরা ছিল, তাদের প্রস্তুত করা। তাছাড়া মেয়েদের নিজেদেরও তৈরি হওয়ার ব্যাপার থাকে। না চাইলেও সময় লেগেই যায়। আবার আসার আগের দিন সন্ধ্যাবেলায় সুজাবত আলী বড় মুখ করে যে-কথা বলেছিলেন তার অন্যথা তো হয়েইনি, বরং আন্তরিকতার স্পর্শটুকু অনুভূতিকে হৃদ্য করে তুলেছিল।
মনসুর রহমান ও গোলাম সারোয়ারকে বসানো হলো কাছারিঘরে। নাসিমের বাবা সাদাত হোসেন বাড়িতেই ছিলেন। খবর পেয়ে তার বড় চাচা আজহার হোসেন আর ছোট চাচা নেহাল হোসেন – দুজনেই এলেন। তাহেরা বানু, রহমতুন্নেসা, দরিয়ারা গেল ভেতরবাড়িতে। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটা যেন বাহুল্য। যাওয়ার আধা ঘণ্টা না যেতেই এলো একপ্রস্থ। এলাকার ঘোল-দই যারা বানায়, তাদের আবার খুব সুনাম। দইটা দেওয়া হয় ভোজনের পর, এজন্য তার পরিবেশন মুলতবি থাকল। কিন্তু তাদেরই তৈরি রসগোল্লা-পানতোয়া-সন্দেশ পরিবেশন করা হলো স্তূপাকারে। সঙ্গে পাকা পেঁপে, পাকা সবরি কলা। ঘোলটা নাকি পেট ঠান্ডা রাখে? সেটাও থাকল খাবার পরে এনজাইম হিসেবে। অতিথিরা হাত-মুখ ধুয়ে নিজেদের পরিচ্ছন্ন করলেন। খাবার পরে আবারো ধুয়েমুছে তাদের বিভাজন ঘটল তিন ফ্রন্টে। এক ফ্রন্টে কাছারিঘরে থাকল পুরুষেরা। হোসেন ব্রাদার্সের সবাইকে তো থাকতেই হবে। মহিলা ফ্রন্ট বসল বাড়ির পশ্চিম দিকের আঙিনায়। একটা বিশাল নিমগাছ তার শাখা-প্রশাখার বিস্তার ঘটিয়েছে তার ওপর। শীতের দিন হলেও একটানা রোদে ক্রমাগত বসে থাকাও অসহ্য হয়ে ওঠে। সে হিসাবে ডালপালার ফাঁক দিয়ে কখনো রোদ আসছে, আবার ঢেকে যাচ্ছে, অনেকটা লুকোচুরি খেলার মতো – চমৎকার। সেখানে চেয়ার-ফেয়ার এনে দেয় কাজের মেয়েরা। তাতে একে একে বসলেন নাসিমের দাদি, ফজিলা বানু, সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা, যার কাছে সুজাবত আলী রোগী দেখতে বেরিয়ে, অথবা রোগী দেখার না থাকলে সময় কাটানোর অছিলা হিসেবে, মাঝে মধ্যেই এসে বিবাহযোগ্য কন্যাদের বিবরণ পেশ করেন। খোদেজা খাতুন তো আসবেনই। নাসিমের ছোটচাচা আছেন কাছারিঘরে। ছোটচাচি ইয়াসমিন আরা এসে বসলেন সেখানে। নাসিমের বড়চাচি জোহরা খাতুনকেও খবর দেওয়া হলো। আশা করা যায়, তিনিও অচিরেই এসে সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটাবেন। একটা জম্পেশ আসর বসে যায় তাহেরা খাতুন, রহমতুন্নেসা ও দরিয়াকে ঘিরে।
আর তৃতীয় ফ্রন্টটি হয় ছোটদের। ফেরদৌসীর নেতৃত্বে। সে ওদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ তো বটেই, কিন্তু ছোটও তাকে বলা যাবে না। তবে সে না ঘরকা, না ঘাটকা। মা-চাচিদের মধ্যে সে বসেই বা কী করবে? তাই সে আধুলি-সিকি-দুয়ানি যারা ছিল, তাদের নিয়ে আমগাছ, জামগাছ, ফুলকপির ক্ষেত ইত্যাদি দেখে বেড়াতে লাগে। জাংলায় একই সঙ্গে লাউগাছ আর শসাগাছ উঠে গেছে। তাতে লাউ আর শসা – দুটোই ঝুলছে। কচি কচি। কাঁচা লাউ খাওয়া না গেলেও শসা খেতে তো সমস্যা নেই। বড় বড় গাছও তো অনেক। তার একটারও ডালে যদি দোলনা বাঁধা থাকত, তবে কি মজাই না হতো! ভাবে, কাউকে ডেকে বলবে নাকি দড়ি বেঁধে একটা দোলনা বানিয়ে দিতে।
কাছারিঘরে তখন আলোচনার উৎস হলো, নিয়মিতভাবে ঢাকা থেকে ডাক বিভাগ মারফত তিনদিন পরে আসা একটি সংবাদপত্রের খবরাদি। রাজনীতির মাঠ গরম হতে চলেছে। অনেকদিন ধরেই এক জেনারেল গণতন্ত্রকে ঘন তন্তু দিয়ে নিশ্ছিদ্র করার জন্য একটা পর একটা হুকুম জারি করে চলেছে। গণতন্ত্র মানেই তো খারাপ লোকের শাসন! এই মত যে মিথ্যা তা প্রমাণ করতেই হবে। এজন্য সে ‘ভালো লোক’কে গণতন্ত্রের খুঁটি বানানোর আইন করেছে। তা কীভাবে ‘ভালো লোক’ গণতন্ত্রের খুঁটি হবে? ওয়ার্ডের লোকেরা বেছে বেছে ‘ভালো লোক’কে ভোট দেবে। বি.ডি. মেম্বার। তারাই হবে গণতন্ত্রের খুঁটি! তারাই ভোট দিয়ে বানাবে দেশের প্রেসিডেন্ট। যে কেউ প্রেসিডেন্ট যাতে না হতে পারে, সেজন্য ইউনিয়ন বোর্ডের নাম পাল্টে করেছে ‘কাউন্সিল’। আর বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হয়েছে চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যানদের কাজ হলো চেয়ারে বসে থাকা। আর সে প্রেসিডেন্ট, কেবল করে যাবে প্রিসাইড! কিন্তু দেশের লোক আর ‘ভালো লোকে’র শাসন চাইছে না। শুরু হয়েছে আন্দোলন। এই আন্দোলনের ঢেউ এখন গ্রামদেশকেও ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। কাজেই তা নিয়ে কথাবার্তা হওয়াই তো স্বাভাবিক। এখানেও কথা হচ্ছে তা নিয়েই।
আজহার হোসেন নিজে এই প্রক্রিয়ায় চেয়ারম্যান হয়েছেন। কথা শুনছেন। কথা বলছেন। আবার মিটিমিটি হাসছেনও। সে-হাসি ঠোঁটের গোড়ায় এসে মিলিয়ে যাচ্ছে। লোক তিনি খারাপ না। তবে বসবাস করতে গেলে দলবল লাগে। সেই দলবল ঠিক রাখার জন্য কিছু ক্ষমতারও দরকার পড়ে। ইউনিয়ন কাউন্সিল হলো সেই ক্ষমতার কেন্দ্র। সেটা হস্তগত করার মাজেজাটা তিনি সোজা হিসাবে বুঝেও নিয়েছিলেন। তার ইউনিয়নে ওয়ার্ড হলো এগারোটি। সেই এগারোটি ওয়ার্ডের মেম্বার এগারো জন। ভোট দরকার ছয়টি। তার একজন তিনি নিজে আর পাঁচজন মেম্বারকে ভোটদাতা হিসেবে পেলেই কিস্তিমাত। তাই আর পাঁচজন মেম্বারকে বগলদাবা করে নিয়ে এসে নির্বাচনের সপ্তাহখানেক আগে তার এক শ্যালককে সঙ্গে দিয়ে স্টিমার ভাড়া করে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন সুন্দরবন ট্রিপে। তারা সেখানে ঘুরল-ফিরল। বাঘ দেখতে পেল না, কিন্তু তার থাবার ওপরে নিজেদের পা ছোঁয়াল। পাতিল ভরে মধু নিয়ে এলো। শুধু পানিতে নেমে গোসল-স্নান করল না, পাছে হাঙর এসে হাড্ডিসুদ্ধ পা কেটে নিয়ে যায়। ফিরে এলো নির্বাচনের আগের দিন রাত বারোটার পরে। তার প্রতিদ্বন্দ্বীর কোনো সুযোগই থাকল না তাদের অন্তত একজনকেও ধরাছোঁয়ার। নির্বাচনে জেতার পর আনন্দ-উৎসবে তিনি তার শ্যালককে ধমকালেন, ‘চামড়া কই হরিণের? বাঘের? মেম্বার সাহেবদের একটা করে দিতে বলেছিলাম যে -। আনতে পারলি না?’ জবাবে তার শ্যালক কাঁচুমাঁচু হয়ে কী সব বলতে লাগল, ‘চেষ্টা তো করেছিলাম। কিন্তু অর্ডার হয়ে গেছে হরিণ মারা যাবে না। বাঘ মারা যাবে না। সিংহ মারা যাবে না। ওদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সেজন্য বসিয়েছে ফরেস্ট অফিস।’ এসব শুনে আজহার হোসেন বললেন, ‘তাই তো, বাঘ মারা যাবে না। সিংহ মারা যাবে না। ওরাই আমাদের মেরে মেরে খাবে। আইনের কি বাহাদুরি।’ তারপর মেম্বার সাহেবদের বলেন, ‘কী করব? আমার তো ইচ্ছা ছিল, ঘরে টানিয়ে রাখবেন। লোকে দেখে অবাক হয়ে যাবে।’ তারপর এই বলে তাদের আশ্বস্তও করলেন, ‘এবার হয়নি তো কী হয়েছে? সামনের বার হবে। আমি ঠিক সব ম্যানেজ করে রাখব।’ এটাও ঠিক, শুধু হরিণের চামড়া-বাঘের চামড়া কেন, স্টিমার ভাড়াসহ সামনে এ-জাতীয় আর যত খরচ করার আছে, সব হয়ে যাবে ‘ফুড ফর ওয়ার্কে’র টাকা থেকে।
মহিলাদের আলোচনাটা শুরু হয় সবার পারিবারিক খোঁজখবর দিয়ে। ফজিলা বানু বলেন, ‘বিয়ে হয়ে সেই যে দরিয়া চলে গেল, আর তো দেখিইনি।’ দরিয়া আর কী বলবে, চুপ করে থাকে। তাহেরা খাতুন বলেন, ‘দরিয়াই তো জোর করে আমাদের নিয়ে এলো।’ ফজিলা বানু বলেন, ‘তবু ভালো। তুমি কাছে থেকেও আসার সময় পাও না। দরিয়া জোর করেছিল বলে তোমারও দেখা পেলাম।’ তারপর রহমতুন্নেসার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘খুব ভালো লাগল, ঝিয়ারিকেও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছো। এখানে তো তেমন কিছু নেই। খারাপই লাগবে তোমার।’ এ কথা শুনে রহমতুন্নেসা বলেন, ‘কী বলেন ফুপি? আমি তো আসার আগে ভাবতেই পারিনি -’ কথা শেষ করতে পারেন না। তাহেরা খাতুন বলেন, ‘রহমতুন তো আমাদের বাড়িতেও আসেনি।’ এবার রহমতুন্নেসা বলেন, ‘একটু হাত-পা ঝাড়া হয়ে নিই, তারপর ঘুরে ঘুরে বেড়াব। থাকব। তখন হয়তো যাচ্ছি না বলে তাড়িয়ে দেবেন।’ ফজিলা বানু বলেন, ‘অমন কথা মুখেও আনবে না। আমি তো আর কদিন।’ তারপর খোদেজা খাতুনের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘মেজোবউমার কাছে আছি -।’ হা-হা করে ওঠেন খোদেজা খাতুন, ‘আম্মাজান, আমিই তো আপনার কাছে থাকি। মাথার ওপর আপনি আছেন বলেই তো সবকিছু দেখেশুনে রাখতে পারছি।’ শুরু হয় এই ভাবে। পরস্পরের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধার পরাকাষ্ঠা দেখানো দিয়ে। ফজিলা বানু বলেন, ‘খোদেজার বড় ছেলের বউ তো আগে থেকেই নেই। মেজো ছেলের বউও থাকতে পারল না। ওদের আর দোষ কী? ছেলেরা চাকরি-বাকরি করে খায়। তাদেরও তো আরাম-বিরাম আছে। বউরা কাছে না থাকলে কী হয়?’ খোদেজা খাতুন বলেন, ‘না আম্মাজান, আমি ও নিয়ে আক্ষেপ করি না।’ তারপর অতিথিদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘সময়-সুযোগ পেলেই ওরা আসে। থাকে।’ রহমতুন্নেসা এখানে নতুন। মূলত তাকে উদ্দেশ্য করেই ফজিলা বানু বলতে থাকেন, ‘ঝিয়ারি, আমার বড় ছেলে আজহার, অবশ্য পাশেই থাকে। সংসার বড় হয়ে যাচ্ছে। তাই বাড়ি আলাদা করতে হয়েছে। ছোট ছেলে নেহাল ঢাকায় থাকে। ছোটবউমাকেও যেতে হলো।’ ইয়াসমিন আরাকে দেখিয়ে বলেন, ‘এখন না হয় ওরা আমাকে দেখতে এসেছে। আমি দেখলাম, এখানে মেজবউমা একা। মেয়ে তো নেই। সব ছেলে। তাদের দুজন তো আগেই গেছে। সেজোটাও এখন একই রাস্তা ধরেছে। চাকরি না করলে চলছে না। ওদের বাবা তো কোথাও যায়নি। জমি-জিরাত দেখে। বইপত্তরও পড়ে। ভালোই তো আছে। তাই মেজো বউমা যা-ই বলুক, আমি ওর কাছেই থাকি।’ শুধু কি তাই? তিনি কি কাউকে বলতে পারবেন, একদিন কিশোরী বয়সে নববধূ হয়ে শ্বশুরের এই ভিটাতে এসেছিলেন, মায়া জড়িয়ে গেছে তার সঙ্গে। তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নিজের আনুভূতিক সত্যকেই উপড়ে ফেলা। কখনোই তা সম্ভব হবে না তার জীবনে। একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলেন, ‘গাঁও-গেরামের কি যে হয়েছে। ছেলে-নাতিদের কথা কী বলব, সবাই শহরের দিকে ছুটছে। কেউ পানের দোকান দিচ্ছে। কেউ রিকশা চালাচ্ছে। জুট মিলে গিয়ে লেবার হচ্ছে। কচুর লতি পর্যন্ত কিনে খাচ্ছে।’ তাহেরা খাতুন বলেন, ‘বুবুজান, কার কথা কী বলব? আমার ছেলেরাও তাই। বলে, গ্রামে মানুষ থাকে নাকি? আপনার ভাই একটা চালকল বসানোর টাকা দিতে চাইল। একজন বলে, আমার আর কাজ নাই, সারাদিন ভুসি মাখব। আরেকজন বলে, একটা চাকরির খোঁজ পেয়েছি। তার জন্য খরচাপাতি আছে। টাকাটা বরং আমাকে দিন।’ ফজিলা খাতুন হাসেন, বলেন – ‘শহরে থাকবে। গাড়ি-ঘোড়া চড়বে। বায়োস্কোপ দেখবে। বউকে হারিকেনের চিমনি মুছতে হবে না।’ এইভাবে আরো কথা হতে থাকে। এরই মধ্যে বাড়ির একটা কাজের মেয়ে এসে খোদেজা খাতুনকে বলে, ‘চাচি, ঘাটের গেট কি খুইল্যা দেব?’ কথার মধ্যে বাধা? ধমকে ওঠেন ফজিলা বানু, ‘কিসের গেট?’ বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া দুটো পুকুর। একটা পুবদিকে। বলা হয়, সদর পুকুর। পুরুষেরা ও বাইরের লোকেরা ব্যবহার করে। আরেকটা উত্তরদিকে। বলা হয়, খিড়কির পুকুর। বাড়ির মেয়েদের গোসলাদি থেকে যাবতীয় কর্মাদি এখানেই হয়। খোদেজা খাতুন বলেন, ‘আম্মাজান, আমিই বন্ধ করে রাখতে বলেছি। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে এসেছে। সাঁতার জানে কী জানে না, জানি না। ওরা তো ছোটাছুটি করবেই। ঘুরতে গিয়ে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যায়।’ তারপর কাজের মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কেন, কী হয়েছে?’ কাজের মেয়েটি বলে, ‘খুইল্যা দিতে কইচে যে।’ খোদেজা খাতুন বলেন, ‘কে?’ কাজের মেয়েটি বলে, ‘ওই যে আইচে যে।’ এখন ঘটনা হলো, ছোটরা এতক্ষণ যা করার করছিল। একপর্যায়ে সদর পুকুরের চাতালে এসে দেখে বাঁধানো ঘাটের দরজা বন্ধ। বন্ধ মানে একেবারে তালা মারা। তখন সেই কাজের মেয়েটির দেখা পেয়ে তারা বলে, ‘খুলে দাও।’ কাজের মেয়েটি এসেছে তালা খোলার হুকুম নিতে। ফজিলা বানু বলেন, ‘মেজো বউমা, তুমি ঠিকই করেছো। বলা তো যায় না।’ তারপর কাজের মেয়েটিকে বলেন, ‘আইচে যে তো বুঝলাম, কে আসছে, ডাক।’ ডাকা হয়। কে আর আসবে? ফেরদৌসীকেই আসতে হয়। কারণ, সে-ই তো এখন ওদের সর্দারনি। সে মাথা নিচু করে মৃদু পায়ে এসে দাঁড়ায় ফজিলা বানুর সামনে। চোখে মোটা কাচের চশমা। পাওয়ার ফুল। রোদের প্রতিফলনে আগুন ধরে যায়। তার ভেতর দিয়ে ফজিলা বানু তাকান ফেরদৌসীর দিকে। পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে। মুখাবয়বে এসে নিবদ্ধ হয় তা। আগে সেভাবে খেয়াল করেননি। কিন্তু এখন কী যেন খুঁজে বেড়ান। দরিয়া ঝটপট বলে, ‘ফুপি, আমার ননদ এসেছে না, তার মেয়ে।’ ফজিলা বানু স্নিগ্ধ স্বরে বলেন, ‘বোনডি এসো, আমার পাশে বসো।’ এই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বৃদ্ধার সামনে দাঁড়িয়ে ফেরদৌসীও বিহ্বল হয়ে পড়ে। সে সময় নেয়। ফজিলা বানু হাসেন, বলেন ‘কি, বুড়ো মানুষের পাশে বসতে ভালো লাগছে না?’ রহমতুন্নেসা বলেন, ‘না, না, তা কেন হবে? ফেরদৌসী, বসো।’ ফেরদৌসী বসে। তার শরীরে হাত বুলিয়ে ফজিলা বানু বলেন, ‘কী কী দেখলে, বোনডি, এখানে এসে?’ ফেরদৌসীরও সপ্রতিভতা ফিরে আসতে থাকে। সে বলে, ‘আপনাদের এখানে তো অনেক গাছ। আমগাছ, জামগাছ, কাঁঠালগাছ, তেঁতুলগাছ। সব গাছ ফলফলাদির।’ ফজিলা বানু বলেন, ‘বোনডি,
ফুলের গাছও তো আছে। বকুল, কেয়া, শেফালী, কদম, চাঁপা – এসব তো গাছে ধরে। শিমুল, হিজলকেও তো আমরা ফুলই বলি।’
কথাবার্তা শুরু হতেই ফেরদৌসী নিজের ছন্দটাও ফিরে পায়, বলে – ‘ওগুলো কী গাছ? ওগুলো তো বৃক্ষ।’ ফজিলা বানু বলেন, ‘হোক বৃক্ষ। ফুল তো ফোটে।’ ফেরদৌসী বলে, ‘ঘাড় উঁচু করে কি ফুল দেখা যায়?’ ফেরদৌসীর এমনতরো কথাবার্তা শুনে রহমতুন্নেসা শঙ্কিত হয়ে পড়েন। পাছে কি না কি বলে ফেলে। ফুপি অসন্তুষ্ট হন। একদিনের জন্য মেয়েকে নিয়ে এসে চিরদিনের জন্য একটা খারাপ ধারণা তৈরি করে যাওয়া! ফজিলা বানু বলেন, ‘তোমার বুঝি বাগানে ফোটা ফুল দেখতে ভালো লাগে?’ ফেরদৌসী বলে, ‘ভালো তো লাগেই। চন্দ্রমল্লিকা, রজনীগন্ধা, গাঁদা, বেলি – ফুল তো এগুলিই।’ ফজিলা বানু হাসেন, ‘ফুল ভালো লাগে। ফুলের বাগান করো না?’ ফেরদৌসী সোজাসাপটা জবাব দেয়, ‘না, করি না।’ ফজিলা বানু বলেন, ‘কেন, তুমি যেখানে থাকো, সেখানে তো করতেই পারো।’ ফেরদৌসী বলে, ‘আব্বার বদলির চাকরি। যেসব বাসায় গিয়ে থাকতে হয়, সেখানে কি বাগান করা যায়? বাড়িওয়ালা সব বাড়ির চারদিকের ফাঁকা জায়গায় আলুগাছ বোনে। বেগুনগাছ বোনে। হলুদগাছ পর্যন্ত বুনে জঙ্গল বানিয়ে রাখে।’ ফজিলা বানু এতক্ষণ যা হাসার নিঃশব্দেই হাসছিলেন। এখন ফেরদৌসীর শেষ কথাগুলো শুনে হাসি আর চেপে রাখতে পারেন না। তার বিশ্বাস উৎপাদন করার জন্যই, বোধ করি, ফেরদৌসী বলে, ‘একবার না আমার এক বান্ধবী আমাকে একটা গোলাপ চারা দিয়েছিল। আমি বাড়িওয়ালার সবজিক্ষেতের একধারে লাগিয়েও দিয়েছিলাম। পানিও দিতাম। তারপর একদিন দেখি গাছটা আর নাই। উপড়ে ফেলে দিয়েছে।’ ফজিলা বানু এবার আবার ফেরদৌসীর মুখের দিকে নিবিষ্টভাবে তাকান, বলেন, ‘খুব দুঃখ পেয়েছিলে, তাই না?’ ফেরদৌসী কথা বলতে পারে না। ফজিলা বানু বলেন, ‘তাহলে তো বোনডি, তোমার একট বাড়ি দরকার, যেখানে ইচ্ছেমতো বাগান করতে পারবে।’ একথার আর জবাব কী? ফেরদৌসী চুপ করে থাকে। ফজিলা বানু কাজের মেয়েটিকে বলেন, ‘গেটটা খুলে দে। সবুরের মা আর কাদেরের বউকে বল, ওদের সঙ্গে থাকতে। কেউ যেন পানিতে পড়ে না যায়।’
বেলা বেড়ে যাচ্ছে। অতিথিদের দ্বিপ্রহরিক ভোজনের ব্যাপার আছে। খোদেজা খাতুন উঠলেন। একই কাজের জন্য ইয়াসমিনকেও উঠতে হলো। ফজিলা বানু অতিথিদের বললেন, ‘তোমরাও এবার একটু বিশ্রাম নাও।’ তারপর তিনি বের হলেন এ-বাড়িতে তার কনিষ্ঠ পৌত্র কায়সারের সন্ধানে। সে ভৈরব পণ্ডিতের চেলা। পণ্ডিত মহাশয় প্রথম মহাযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। এখন স্কুলে শিক্ষকতা করেন। আর ছেলেদের ব্রতচারী ট্রেনিং দেন। ব্রতচারী ট্রেনিং নেওয়া কায়সারের নিত্যদিনের কাজ। সে সেটা বাদ দিয়ে – ‘দিন ফুরায়ে যায়রে আমার দিন ফুরায়ে যায়,/ সাঁঝের রবি গেল সাঁঝে/ দিনটা গেল বৃথা কাজে/ কেমন করে জবাব দেব হিসাব যদি চায়/ দিন ফুরায়ে যায় রে আমার দিন ফুরায়ে যায়।’-এর ব্যাখ্যা মুখস্থ করছিল। দিন তারও শেষ হয়ে আসছে। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা সামনে। ফজিলা বানু তাকে বললেন, ‘তোদের সুজাবত নানাকে ডেকে নিয়ে আয়। এখনই যেন আসে। আমি এ-ঘরেই আছি।’ কায়সারের প্রত্যয় জন্মাল, ঘটনা নিশ্চয়ই গুরুতর। না হলে দাদিমা এভাবে ডেকে আনতে বলতেন না? সে ছুটল পড়িমরি করে।
কাছারিঘরের আলোচনা তখন সবাইকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশংকায় ফেলে দিয়েছে। তারা খুব উত্তেজিত। ডাকপিয়ন এসে খবরের কাগজটা দিয়ে গেছে। সেটা পড়েই এই উত্তেজনা। ক্রুশ্চেভ সাহেব রণতরী পাঠিয়েছেন কিউবাকে রক্ষা করতে। আর কেনেডি সাহেব বলছেন, ‘খবরদার। এক পা এগোলেই -।’ কী হবে পরিষ্কার করে বলেননি। কিন্তু রাশিয়া তো রাশিয়া, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে হয়ে যাবে, সেটা নিশ্চিত। তবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভয় সুজাবত আলীর যথাযথভাবে অনুধাবন করা হলো না। তিনি এসে হাজির হলেন তাঁর বুবুজানের সকাশে। ফজিলা বানু বললেন, ‘সুজাবত, এবার কোনো কন্যার খোঁজ আনতে পারোনি?’ সুজাবত আলী বলেন, ‘কী যে বলেন, বুবুজান। কন্যা দিয়ে দেশ ছেয়ে আছে। আসলে নাসিমই তো ঘাড় পাতছে না।’ ফজিলা বানু বলেন, ‘ঘাড় তো পাতে কড়িকাঠে – বলির সময়। আমি আমার নাতিকে বলি দিতে চাই না। জীবনসাথিকে নিয়ে সে জীবন ভরে তুলবে, আমি সে-ব্যবস্থা করছি। কিন্তু সুজাবত ঘটকালি নয়, দায়িত্ব তোমার। যা কিছু, তোমাকেই করতে হবে।’ সুজাবত আলী বলেন, ‘বুবুজান, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।’ ফজিলা বানু বলেন, ‘কন্যা আমার বাড়িতেই আছে। আর এই বাড়িতেই থাকবে। এখন থাকার ব্যবস্থা তোমাকেই করতে হবে।’ বৈদ্যুতিক শক লাগিয়ে মানুষের মস্তিষ্ককে যেমন হতচকিত করে দেওয়া হয়, ফজিলা বানুর কথা শুনে সুজাবত আলীর অবস্থা প্রায় তাই। – ঘটকালি করতে হবে না, দায়িত্ব নিতে হবে, – ঠিক তার বোধগম্য হচ্ছে না। তিনি তাই বলেন, ‘বুবুজান, একটু বুঝায়ে কন?’ ফজিলা বানু তখন বলেন, ‘কন্যাকে তুমি সঙ্গে করেই এনেছো। দরিয়ার ননদের মেয়ে। আমার খুব মনে ধরেছে। আমি তাকে নাসিমের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে নাতবউ করতে চাই।’ সুজাবত আলীর মনে হয় এই কথা শুনে তিনি বিদ্যুতায়িত হয়ে গেছেন। তাই তো, তিনি একবারও ফেরদৌসীর কথা ভাবেননি। সেও তো বিবাহযোগ্যা হয়ে উঠেছে। তবুও সহজ কাজও কঠিন হয়ে যেতে পারে ভেবে চিন্তাযুক্ত হয়ে পড়েন। ফজিলা বানু নিজেও বোঝেন, দুনিয়া অনেকদূর এগিয়ে গেছে। নিজের পরিবারেই তার দুন্দুভি বেজে চলেছে। মেয়ে সাবালিকা। লেখাপড়া করে। তার বাবাও গ্রামে থাকা দশজনের মতো গৃহী মানুষ নন। সুজাবত আলী এর আগে যত প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন, তার সঙ্গে এর ফারাকও বিস্তার। হতে পারে নাসিম নিজেও ওইসব পরিবারের ধরনকে ধাতস্থ করতে পারেনি। তাই
এ-যাবৎকাল কেবল এড়িয়ে গেছে। ফজিলা বানু বলেন, ‘সুজাবত, তোমার সংকোচ করার কোনো কারণ নেই। মেয়ের বাবা-মা আছেন। চাইলে তুমি আজকেই কথা বলতে পারো। তবে তাদেরও খোঁজ নেওয়ার ব্যাপার থাকতে পারে। মেয়ের মতামতেরও একটা প্রশ্ন আছে। তারা সময় নিতে চান, নিন। কিন্তু সিদ্ধান্তটা আমি দ্রুতই জানতে চাই।’
সুজাবত আলী সময় নিলেন না। অনেক ঘটকালিই করেছেন। তাঁর একটা প্রফেশনাল দক্ষতাও এসে গেছে। তিনি প্রথমত নিজের জামাতাকে বিষয়টা জানালেন। ভদ্রলোক এটাকে খুব স্বাভবিক বলেই ধরে নিলেন। মেয়েকে পাত্রস্থ করার জন্য প্রাথমিক শর্তাদি সবই পরিপূরিত। বাকি থাকে দেনা-পাওনা। এদের পারিবারিক অবস্থা দেখে সেটিকেও তার সমস্যার কিছু বলে মনে হয় না। মেয়ে তো তার নিজের ভাগ্নি। তার অমঙ্গল তিনি কেনই বা চাইবেন? সুজাবত আলী বলেন, ‘সারোয়ারের সঙ্গে তাহলে তুমি কথা বলো। মতামত যে এখনই দিতে হবে, তা তো নয়। দেওয়া সম্ভবও না হতে পারে। কিন্তু জানিয়ে রাখতে তো দোষ নেই।’ শ্বশুরের দায়িত্ব এভাবেই জামাইয়ের কাঁধে বর্তাল। গোলাম সারোয়ার ব্যাংক-কর্মকর্তা। সে হিসাবে একটু ভারী মানুষও বটে। কোনো কিছুই তাকে সহসাই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে অভ্যস্ত করে তোলেনি। সম্বন্ধির কথা তিনি শুনলেন। মেয়েকে বিয়ে দিতে হবে। আজ না হয় কাল। তার বড় দু-মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ফেরদৌসীর যে বয়স তার আগেই তাদেরে পাত্রস্থ করা সম্ভব হয়েছে। স্বামী-সন্তানাদি নিয়ে সংসারও করছে। সাদা চোখে ভালোই আছে। ফেরদৌসী ছাড়াও তার আরো একটি মেয়ে রয়েছে। সে কৈশোরও অতিক্রম করেনি। কাজেই মেয়ে বিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি যে চাপের মধ্যে আছেন, তা-ও নয়। আজকাল অনেক পরিবারের মেয়েরা ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। লেখাপড়া করতে করতে সে যদি ততদূর যেতে পারে, সেটাকেও তিনি সমস্যার বলে ভাবেন না।
তবে একটু অবাকই হলেন। ফেরদৌসী কি নিজেই ঘর-বর দেখতে এসেছে! গত সন্ধ্যাতে ছেলেটা তো সেরকম কথাই বলেছিল। সে যা-ই বলুক, তাতে একটা সরলতা ছিল। গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘ভাইজান,
আনজুমান-জিনাতের বিয়ে তো আপনারাই দিয়েছেন। আপনারাই দেখুন, কি করা যায়? রহমতুন আছে। তাকেও বলুন। তাড়াহুড়া করার তো কিছু নাই।’
তাড়াহুড়া করার কিছু নাই, তা সত্যি। কিন্তু সুজাবত আলী সময় দিতে রাজি নন। তিনি অনেকেরই বিয়ে-শাদি দিয়েছেন। ঘটক হিসেবে তা তিনি হরগৌরীর মিল হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ যে রাজযোটক! বিলম্বের কারণে তা ছুটে যায়, সেটা কিছুতেই হতে দেওয়া যায় না। তিনি রহমতুন্নেসাকেও জানালেন।
মেয়েদের বিয়ের ব্যাপারে মায়েদের একটা চিন্তা থেকেই যায়। মেয়ে যত বড় হতে থাকে, প্রচ্ছন্নভাবে তার বিস্তার ঘটে। রহমতুন্নেসার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নেই। তবে এই চিন্তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রবহমান সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে যে বিরাজমান সংস্কার আহরিত হয়, তার সঙ্গে। তা হলো, বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত কন্যা প্রতিপালনের দায়িত্ব বাবা-মায়ের। তার পর যে পাণিগ্রহণ করবে, সে-ভার বর্তাবে তার ঘাড়ে। কন্যাকে সমর্পণ করতে হয়। জামাতাকে বলতে হয় – তোমার হাতে তুলে দিলাম। এখানে আসার পথে গরুর গাড়িতে ফেরদৌসী ছিল তার সঙ্গে।
ক্যাঁচর-ক্যাঁচর শব্দ করতে করতে গাড়ি চলা শুরু করে দিয়েছিল তার নিজস্ব ছন্দে। দেখা তো সব সময়েই হয়। কথা হয়। কিন্তু আজকে এক ফাঁকে ফেরদৌসীর দিকে তাকিয়ে রহমতুন্নেসার মনে হয়, কত দিন ভালো করে দেখিনি। ওরও বুঝি যাওয়ার বার্তা ভেসে আসছে। নাসিমের কথাটাও মনে হয়। কালকে যদি ছেলেটা না যেত, তবে তো ওদের বাড়িতে আসার ব্যাপার হতো না। সে যা বলেছিল, তা-ও অনুরণিত হতে থাকে। সৃষ্টিছাড়া ওই কথাগুলো কত সহজভাবে ছেলেটা বলে গেল। নিজের বিয়ের ঘটনাটাও যেন অজান্তেই স্মৃতিতে জেগে ওঠে। তাকে দেখে যাওয়ার পর কিছুদিন ধরে দুপক্ষের কথা চালাচালি হয়। তারপর একদিন, দাদি তখনো বেঁচে, তিনিই বলেন, ‘এবার তোর বিয়ের ফুল ফুটেছে।’ রহমতুন্নেসা যেন তার অপেক্ষাতেই এতদিন বসে ছিলেন! তবে তিনি বসে না থাকলেও পরিবার যে ছিল, তা ঠিক। দাদি আরো বলেন, ‘ছেলে ভালো। পরিবার ভালো। ভালো করে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। খুব সুখে থাকবি।’ এর পর তো প্রায় তিরিশ বছর কেটে গেছে। দাদির কথার তেমন নড়চড় হয়নি। খুব বলতে কী বুঝিয়েছিলেন, তার অর্থ ঠিক বোঝা না গেলেও, রহমতুন্নেসা সুখেই আছেন। গোলাম সারোয়ার বিবেচক মানুষ। বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই বিবেচনা শক্তি আরো বেড়েছে। পরিণত হয়েছে। স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য বোধ সম্প্রসারিত হয়েছে পুত্র-কন্যার মধ্যে। ভালোবাসা কি, তা নিয়ে কখনো ভাবার দরকার পড়েনি। বাবা-মায়েরা, দাদা-দাদিরা কিংবা তাদেরও পিতামাতারা বছরের পর বছর একসঙ্গে থেকেছেন, ঘর-সংসার করেছেন, তারাও কি ভাবতেন? এটা ঠিক, আজ হোক, কাল হোক, মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। অযাচিতভাবে প্রস্তাব এসেছে। সেটা নিয়ে না ভাবারও বিকল্প নেই। তিনি, তাদের কালে তো বটেই, এখনো দেখেন, মেয়ের বিয়ে নিয়ে পরিবারের কি উৎকণ্ঠা? সেটাই যেন মেয়েটার জীবনে সব। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, সেটা বাবা-মা-পরিবারের গর্ব। আবার বিয়ে দিতে পারছে না, তা অগৌরবেরও বিষয়। কত মেয়েকে দেখেছেন, প্রত্যাখ্যাতা হতে হতে, নিজের নারীজন্মকে মনে করে অভিশপ্ত। লোকলজ্জায় দশজনের সামনে আসে না। সেখানে পাত্রপক্ষই এগিয়ে এসেছে, তখন তাকে গুরুত্ব তো দিতেই হবে। কী করবেন রহমতুন্নেসা, ভেবে পান না। মেয়ের বাবা স্পষ্ট করে কিছু বলেনি। কিন্তু নিজে তিনি কী বলবেন?
ওদিকে পুকুরের গেট খুলে দেওয়ার পর ছেলেমেয়েরা হইহই করে ঢুকে পড়ল। ভাবখানা যেন রাজ্যই জয় করে ফেলেছে একটা। দৌড়াদৌড়ি, ছোটাছুটি। বাঁধভাঙা আনন্দের জোয়ারে ভাসতে থাকে। সবুরের মা আর কাদেরের বউ যতই চিৎকার-চেঁচামেচি করে, ওদের আনন্দ যেন ততই বাড়তে থাকে। কিন্তু কী যে হলো ফেরদৌসীর। সে ওদের দলে ভিড়ে গেল না। এসে বসে পড়ে সান বাঁধানো ঘাটের সিঁড়িতে। এক প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বৃদ্ধা যেন তাকে ফেলে দিয়েছে ঘোরের মধ্যে। তার যৌবনের চাপল্য ঝরনা ধারার স্বতোৎসারিত উচ্ছলতায় নদীর সঙ্গে মিশে স্রোতাবেগ সৃষ্টি করে প্রবাহিত না হয়ে ঘনীভূত রূপ ধরে দিঘির উপরিভাগের শান্ত-স্বচ্ছ জলের নিস্তরঙ্গতা এঁকে দিয়েছে। তাতে ছায়া পড়েছে আকাশকে ছোঁবে বলে ওপরের দিকে বেড়ে যাওয়া সুপুরিগাছের। অপলক চোখে সে তাকিয়ে আছে তার দিকে। রহমতুন্নেসা এসে বসলেন তার পাশ। তার ইচ্ছা করে ফেরদৌসীকে জড়িয়ে ধরার। তবে কি এই মেয়েটাকেও তার বিদায় দেওয়ার সময় এসে গেছে। সম্বিত ফিরে পায় ফেরদৌসী, বলে – ‘মা? তুমি?’ রহমতুন্নেসা বলেন, ‘কেন, তোর পাশে বসতে নেই?’ ফেরদৌসী বলে, ‘না, না, অমি সে-কথা বলিনি। বেড়াতে এসেছো। গল্পগুজব করছিলে। হঠাৎ এসে আমার পাশে বসলে তো।’ রহমতুন্নেসা দেখলেন, এটা-সেটা না বলে আসল কথাটাই বলে ফেলা ভালো। তবে একটু ভূমিকাও দরকার। তাই বলেন, ‘শোনো, আমরাও এজন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমরা ভাবিওনি।’ ফেরদৌসী বলে, ‘কেন, কী হয়েছে?’ রহমতুন্নেসা বলেন, ‘কালকে যে ছেলেটি গিয়েছিল, না? ফজিলা ফুপি তার সঙ্গে তোর সম্বন্ধের কথা বলেছেন।’ তারপর যেন আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্যই বলেন, ‘এভাবে এখানে তোকে জানানোর কোনো ইচ্ছাও ছিল না। দরকারও ছিল না। কিন্তু প্রস্তাব যখন হয়েছে, তখন নানা রকম কানাঘুষা হবে। তোর কাছেও কে কীভাবে কী বলবে, তাই সরাসরি তোকে জানিয়ে রাখাটাই মা হিসেবে আমার কাছে মনে হয়েছে উত্তম।’ এ-কথা শোনার পর মুহূর্তমধ্যে ফেরদৌসীর মানসপটে নানা কিছুই উদিত হতে থাকে। তার বান্ধবীদেরও অনেকের বিয়ে হয়েছে। প্রাইমারিতে পড়ার সময় এক বান্ধবীকে তো স্কুল থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হলো, তাকে দেখতে এসেছে বলে। সে সেই যে গেল। গেল। ওরা শুনল, তার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। আর দেখা হয়নি। কিন্তু যাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, দেখেছে নতুন জীবন নিয়ে তারা কত রোমাঞ্চিত। চলাফেরা-কথাবার্তাতে তা অপ্রকাশ্যও থাকেনি। এরকম তাকেও দেখতে আসবে। তারপর বিয়ে হয়ে যাবে। নরনারীর জীবনে প্রেম-ভালোবাসার কথাও তার অজ্ঞাত নয়। কিন্তু একজন পুরুষের সঙ্গে জীবন কাটানোর নামই কি ভালোবাসা? আবার বাবা-মাকে না জানিয়ে ভালোবেসে অনেকে ঘর বেঁধেছে। সেটাই বা কেমন ভালোবাসা – যা আর দশজন-প্রিয়জন থেকে নিজেকে আলাদা করে দেয়? চিরকালের এই অমীমাসিংত বিষয়, তার হৃদয়মধ্যে সৃষ্টি করে চলে আবর্তের। কিন্তু বাস্তবতা কী, তা তার জানা। নাসিমের কথাটাও ভাবে। তাদের বাড়িতে এসে এখনো পর্যন্ত তার সাক্ষাৎ মেলেনি। কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে? কী করছে, কে জানে? সে কি সব সময় এমনটাই করে? কালকে তাকে দেখেছিল। যখন ব্যাডমিন্টন খেলা চলছিল। জানালায় দাঁড়িয়ে অনেকের সঙ্গেই, দেখছিল, কী ক্ষিপ্রতার সঙ্গে খেলছে। একবার এগিয়ে যাচ্ছে। থামছে। একবার পিছিয়ে আসছে। মনের প্রচণ্ড ক্রোধ আর কব্জির দুরন্ত শক্তি দিয়ে কর্কটাকে যেন পিষে ফেলতে চায়। একটা গতির ছন্দ দিয়ে সবাইকে আবিষ্ট করে রেখেছে। আবার বাড়ির ভেতরের উঠানে এসে দেখে সে দাঁড়িয়ে আছে। কথা বলছে। যা বলছে, তা কি কখনো হয়েছে? আর এটাই বা তার মনে কেন হচ্ছে, সেই কথাগুলিকে সত্যি করতেই, বুঝি তার এ-বাড়িতে আসা। কিন্তু মা কেন এসে এমনভাবে বলছেন? ফেরদৌসী বলে, ‘মা, আমিও চিরদিন তোমাদের কাছে থাকতে পারব না। তোমরাও আমাকে রাখতে পারবে না। সেটা দুদিন আগেও হতে পারে, দুদিন পরেও হতে পারে। বড় আপাকে-মেজো আপাকে যেভাবে বিয়ে দিয়েছো, আমাকেও সেভাবেই দেবে।’ এটা তার মনের কথা, না রাগের কথা – রহমতুন্নেসা ঠিক বুঝতে পারেন না। তিনি বলেন, ‘এখনই তো আর মতামত দিতে হবে না। তুই কি জেদের বশে একথা বলছিস?’ এটা শুনে ফেরদৌসী হঠাৎ করেই যেন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। বলে – ‘যদি জেদের কথা বলো, তবে জেদের কথাই। আগে যা দেখেছি, তা দেখে কিছু বলাটা কি আমার অন্যায়?’ – তবে কণ্ঠের এই বেপরোয়া ভাবটা যেন ধীরে ধীরে মৃদু শীতল নরম হয়ে আসে। সে বলে, ‘মা, তোমরা কি আমার কেউ নও? যেখানে আমার বিয়ে দিয়ে শান্তি পাবে, দেবে। আমি তোমাদের পর হয়ে যাবো না। সেটাকেই আমি মেনে নেব।’ ফেরদৌসীর এই কথাগুলিকে সম্মতি বলে ধরে নেওয়াটাই সংগত বলে রহমতুন্নেসা ভেবে নিলেন।
নাসিম বাড়ির ভেতর ঢুকতেই দেখে খোদেজা খাতুন দাঁড়িয়ে আছেন। এত দেরি করে ফেরা? কাজটা উচিত হয়নি, নাসিমের তা না বোঝার কিছু নেই। তবে তার কৈফিয়তই বা কি হবে? তড়িঘড়ি করে এসে দাঁড়ায় খোদেজা খাতুনের সামনে। বলে, ‘মা একটু দেরি হয়ে গেল।’ খোদেজা খাতুন রাগেন না। বলেন, ‘দেরি তো হয়েই গেছে। সেটা কি বলার কোনো দরকার আছে?’ নাসিম কি বলবে? চুপ করে থাকে। খোদেজা খাতুন বলেন, ‘বাড়িভর্তি লোকজন।
অতিথি-মেহমানরা এসেছে। তারা পর্যন্ত তোর জন্য অপেক্ষা করেছে। কতক্ষণ আর না খেয়ে বসে থাকবে?’ এটা শুনে নাসিম একটু ভীতই হয়। অতিথি-মেহমানদের তো অতিক্রম করেই আসতে হয়েছে। তার ফেরার জন্য না খেয়েও থেকেছে। নাসিম বলে, ‘খেয়ে তো নিয়েছে। তা হলে আর সমস্যা কী?’ খোদেজা খাতুন বলেন, ‘সমস্যা হলো, তোর তো খাওয়া হয়নি। চল, তাড়াতাড়ি চল। খেতে বসবি।’ নাসিম বলে, ‘তা তো বসবো। কিন্তু মা, সকালবেলাতে যদিও গোসল করেছি, ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে ঘাম-টাম হয়েছে। আবার শরীরের ঘাম শরীরেই শুকিয়েছে। আপনিই তো বলেন, খেতে বসতে হয় শান্ত-শিষ্ট হয়ে। খেতে হয় ধীরেসুস্থে। জাস্ট, পাঁচ মিনিট। পানি ঢালব আর চলে আসব।’ তারপর হঠাৎ করেই তার মনে হয় মায়ের খাওয়ার কথা। সে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি তো খেয়েছেন?’ মায়ের প্রতি ছেলের দরদ দেখে খোদেজা খাতুন মুচকি হাসেন। রান্নাবান্নার কাজের অনেকটারই সুরাহা হয় কাজের মেয়েদের দিয়ে। তবে খবরদারি করার জন্য হাজির থাকাটা জরুরি। তবে শেষ লোকটি না খাওয়া পর্যন্ত তার খাওয়া হয় না। সব সময়েই মনে পড়ে শ^শুরবাড়িতে আসার সময় দাদি বলেছিলেন, ‘সবার খাওয়া না হলে তুমি কখনো খাবে না। লোকে খারাপ বলবে। বদনাম হবে।’ এই সুনাম অর্জনের মোহেই হোক, আর দায়িত্ববোধ থেকেই হোক, সবার খাওয়া না হলে তিনি খান না। তার শাশুড়িমাতা বহুদিন অনুযোগ করলেও খাওয়া হয়নি। তাই তিনি বলেন, ‘পেটে অ্যাসিডের ব্যথা না তুললে কি আর আমার খাওয়া হয়?’ খোদেজা খাতুনের একথার মর্ম বুঝতে নাসিমের সময় লাগে না। সে স্বগতোক্তি করে, ‘তাই তো মা, আমরা দেরি করে খাই বলেই তো আপনারও খাওয়া হয় না।’ খাবার টেবিলে বসে নাসিম বলে, ‘মা, আপনিও বসেন। আজ আমরা দুজন একসঙ্গে খাব।’ খোদেজা খাতুন যতই বলেন, ‘না, না, তুই খেয়েনে। আমার কাজ আছে।’ নাসিম বলে, ‘ঠিক আছে, আপনি কাজ সেরে নিন। আজকে আমার সঙ্গে আপনাকে খেতেই হবে। না হলে আমি হাত তুলে বসে থাকব।’ একসঙ্গে বসে মা-ছেলের খাওয়া – একটা দৃশ্যেরই অবতারণা করে। একে একে ফজিলা বানু আসেন। ইয়াসমিন আরা আসেন। তাহেরা খাতুন, রহমতুন্নেসা, দরিয়া – কালকে যাদের দেখেছিল, তারাও। অতিথি-মেহমান হিসেবে, কেবল পুরুষদের নয়, আগমন ঘটেছে এদেরও। নাসিম বলে, ‘ছোটচাচিমা, আপনারাও বুঝি আমার জন্য দেরি করছিলেন? আসেন, আসেন, বসে পড়েন।’ কেউ কিছু বলছে না দেখে নাসিম আবার বলে, ‘ছোটবেলায় মা তো আমাকে মুখে খাবার তুলে দিয়ে খাইয়েছেন, এখন আমি মাকে স্বহস্তে কি করে খাইয়ে তা শোধ করি, তাই দেখতে এসেছেন?’ ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘তুই আসলেই একটা অশিষ্ট ছেলে!’ নাসিম বলে, ‘তা কি এতদিনে বুঝলেন?’ ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘বুঝেছি আগেই। কিন্তু ভালো হয়ে যাবি বলে এতদিন কিছু বলিনি। এখন দেখছি তোকে শাসন করার জন্য কাউকে নিয়োগ করা দরকার।’ নাসিমের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সচেতন হয়ে ওঠে। সে বলে, ‘সেজন্য আপনারাই তো আছেন। নতুন কাউকে নিয়ে আসা একটা বাড়তি ঝামেলা!’ ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘সে আমরা বুঝবো। খাওয়া শেষ করে তোর মায়ের ঘরে আয়।’ খাওয়ার পরে একটা সিগারেট-টিগারেট না হলে হয়? নাসিম বলে, ‘সে না হয় পরে গেলাম।’ ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘তোর যা স্বভাব। একসঙ্গে খেতে বসে তো মাকে মহাউদ্ধার করেছিস। বাড়িতে এসেছিস, কোথায় মায়ের কাছে একটু বসবি। সেসব তো কিছুই দেখছি না। কেবল ফাঁকফোকর খুঁজিস, কখন টো-টো কোম্পানির ম্যানেজার হয়ে ঘুরে বেড়াতে পারবি?’ সামনে অতিথিরা। নাসিম আর কথা বাড়ানো সমীচীন বোধ করে না। ইয়াসমিন আরার কথার প্রসারণ নাসিমের না বোঝার কিছু নেই। তাই মায়ের ঘরে মা-ছোটচাচি এলে নিজেই কথার সূত্রপাত ঘটায়। বলে, ‘আমি তো বলেই দিয়েছি, আপনারা যা সিদ্ধান্ত নেবেন, নত মস্তকে আমি তাই পালন করব।’ ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘আমাদের প্রতি এত ভক্তি!’ তিনি ভাবেন, এটা আসলে ভক্তি না অন্য কিছুর প্রতিক্রিয়া, তা কি করে বুঝবেন? অনেক সময় প্রেমে ব্যর্থ হলে অনেকে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। অনেকের কাছে আবার যেহেতু যাকে ভালোবেসেছিল, তাকে পাওয়া গেল না, তখন এক্স.ওয়াই.জেড. – সবই সমান হয়ে যায়। নিজের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তা করে থাকে। নাসিমের ক্ষেত্রে কি তাই হয়েছে? কিন্তু সে যদি এতটাই বিরহকাতর হয়ে থাকতো, তবে তার আচরণের মধ্যে কিছু না কিছু ধরা পড়তো। সাধারণ দৃষ্টি দিয়েও বোঝা যায়, সে তার একশ ভাগের কোনো ভাগেই নেই। তার চলাফেরা-কথাবার্তা-আচার আচরণ, আগেও যেমন দেখেছেন, এখনো তেমনই রয়েছে। তাছাড়া এসব প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা কখনো অপ্রকাশ্য থাকে না। তেমন কিছু শোনাও যায়নি কখনো। তাই ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘তা বলে একবারও মেয়েকে দেখবি না?’ নাসিম বলে, ‘আপনারা তো দেখবেন। আপনারা তো আমার খারাপ হয়, এমন কিছু করবেন না। আর মেয়ে দেখার কথা বলছেন? যাকে চিনি না, জানি না, তাকে একবার দেখে কী হবে? কতটুকুই বা তার জানা যাবে? আর সুন্দর-অসুন্দরের কথা যদি বলেন, তার তো কোনো মীমাংসা নেই। তার কোনো চিরায়ত মানদণ্ডও নেই। যে আমার কাছে সুন্দর, সে অন্যের কাছে যে অসুন্দর হবে না, তার কি কোনো গ্যারান্টি আছে?’ ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘তবু রং, গড়ন, ডিলডাল – কত কিছুই তো দেখার আছে?’ নাসিম বলে, ‘ছোটচাচিমা, কালা-ধলা,
ফর্সা-শ্যামলা, এগুলি কি সৌন্দর্যের একটা বিষয় হলো? সৌন্দর্য তো মানুষের মনে। সেই সৌন্দর্যই প্রতিভাসিত হয় তার শরীরে। কাজেই সেসব নিয়ে আপনাদের ভাবনাচিন্তার কিছু নেই।’ – এরপর নাসিম একটু থামে। দম নিয়ে বলে, ‘তা মেয়ে কি আপনারা ঠিক করে ফেলেছেন?’ খোদেজা খাতুন এতক্ষণ কোনো কথা বলেননি। তিনি বলেন, ‘একটা মেয়েকে আম্মাজানের চোখে ধরেছে।’ এটা শুনে নাসিম হেসেই ফেলে। বলে, ‘দাদিমার পছন্দ? তাহলে তো কথাই নাই। তাঁর চশমা হাইপাওয়ার্ড। দৃষ্টিশক্তিতে কোনো ভুলচুক হয় না। এখন কথাবার্তা বলে আপনারা দিনক্ষণ ঠিক করে আমাকে জানান। আমি ছুটিছাটা নিয়ে যথাসময়ে যথাস্থানে চলে আসবো। আমার জন্য এটা কোনো ব্যাপার না।’ খোদেজা খাতুন বলেন, ‘হাজার হলেও বড় হয়েছিস। তোর কাছে না শুনে তো এগোনো যায় না।’ নাসিম বলে, ‘আমার কথা তো শুনলেনই। আর কিছুর কি দরকার আছে?’ তারপর কী যেন মনে পড়ে গেছে, তাই বলে, – ‘কিন্তু মেয়ের সম্মতি নিয়েছেন? সে নিশ্চয়ই দুগ্ধপোষ্য শিশু নয়। তারও তো মতামত নেওয়া দরকার।’ ইয়াসমিন আরার চোখে-মুখে কৌতুকের রেখা ভেসে ওঠে। তিনি বলেন, ‘মেয়ে তো নিজেই তোকে দেখতে এসেছে। কালকে বলে এসেছিলি, না? তার বাবা-মাও সঙ্গে আছে।’ ঘটনা তাহলে এই। সুজাবত আলী নানার বাড়িতে যারা ছিল, আজকে তাদের বাড়ির অতিথি তারাই। এদের মধ্যে তার বাগদত্তাও রয়েছে। নাসিম বলে, ‘আমি বলেছিলাম বটে! কিন্তু তারা তো বেড়াতেই এসেছেন। এখন আপনারা মেয়ে পছন্দ করে আমার ওপর দিয়ে চালিয়ে দিচ্ছেন। তা, ভালো কথা, মেয়ে আমাকে দেখবে না?’ ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘তোকে তো মেয়ের দেখা হয়ে গেছে। শুনলাম, কালকে ভালো একটা বক্তৃতাও দিয়েছিস। সেই বক্তৃতা শুনেই তো আমাদের হবু বউমা, ওই যে তোরা কি বলিস, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, তার রীতি ভাঙতে এসেছে। বিষয়টা এভাবে দেখে তোরই তো খুশি হওয়ার কথা।’ নাসিম বলে, ‘না, ছোটচাচিমা, হয়নি। পাত্রী যেমন সেজেগুজে পাত্রের সামনে আসে, পাত্রকেও তো তাই করতে হবে। আমিও না হয়, তাই করি। তাছাড়া, জিজ্ঞেসপত্র করার কি কিছু নেই?’ ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘কী জিজ্ঞেস করবে?’ নাসিম বলে, ‘রান্নাবান্না আমাদের কাজ নয়। তাই ওটা বাদ। কিন্তু কত বেতন পাই? উপরি আছে কি না? গাড়ি কিনে চড়াতে পারবো কি না?’ ইয়াসমিন আরা এবার একটু রেগেই বলেন, ‘সামনে বিয়ে। মুখটা একটু বন্ধ করে রাখ। তোর বাচালতা শোনার সময় আমাদের নেই।’ এবার নাসিম একটু ভেবে বলে, ‘ছোটচাচিমা, সারা জীবনের মামলা। আমার একটা কথা শুনুন।’ ছেলে পথে এসেছে ভেবে ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘বল।’ নাসিম বলে, ‘মা, ছোটচাচিমা, মেয়ে তো আমাদের বাড়িতেই আছে। তার বাবা-মা-অভিভাবকেরা যদি অনুমতি দেন, তবে আমি তার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।’ বিয়ে মোটামুটি ঠিক। ছেলেমেয়ে পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে কথা বলবে, তাতে আর সমস্যা কোথায়? গোলাম সারোয়ারও বলেন, ‘তাহলে তো ভালোই হয়। দুজন দুজনকে এখন থেকেই চিনতে শুরু করুক।’ রহমতুন্নেসারও কোনো আপত্তি নেই।
শেষ হয়ে আসছে বিকেল। রোদের তেমন কোনো তাপ নেই। তাই শরীরে মেখে দক্ষিণ দিকের একটা খোলা আঙিনায় গিয়ে দাঁড়ায় নাসিম। তার মনে হয়েছিল, বদ্ধ ঘরে বসে কথা বলার চেয়ে এটাই উত্তম। ফেরদৌসীকে নিয়ে এলো দরিয়া। পুকুর থেকে রহমতুন্নেসা তাকে নিয়ে এসেছিলেন। তখন থেকেই কেমন যেন সম্মোহিত হয়ে গিয়েছে সে। তাকে যখন বলা হলো নাসিম তার সঙ্গে কথা বলতে চায়, তখনো তার কোনো প্রতিক্রয়া বোঝা যায়নি। এক বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলে, ‘কোথায়?’ তার চলাফেরা অনেকটাই যেন যন্ত্রচালিতের মতো। সে দাঁড়ায় নাসিমের সামনে। নাসিম দরিয়াকে বলে, ‘খালা, এবার তাহলে এসো। আমরা একটু কথা বলি।’ দরিয়া হাসে। বলে, ‘সেজন্যই তো নিয়ে এলাম।’ নাসিম বলে, ‘ভয় নেই। আবারো তোমার হাওলায় দিয়ে আসবো।’ দরিয়া বলে, ‘ভয় কিসের? এখন থেকে থাকবে তো তোমারই কাছে।’ নাসিম বলে, ‘হলো না হয় তাই। আমি বেশি সময় নিতে চাই না। তুমি এসো।’ দরিয়া চলে যায়। নাসিম বলে, ‘দাঁড়িয়ে না থেকে হাঁটতে হাঁটতে কথা বললে ভালো হয় না?’ ফেরদৌসী মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। ওখানে হাঁটা মানে তো পায়চারী করা। নাসিম তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই শুরু করে। বলে, ‘অল্পবয়সী মেয়েরা আদর-স্নেহ পেয়ে থাকে। সে বয়সটা পেরিয়ে এলে অধিকারিণী হয় সম্মান পাওয়ার। আমার মনে হয়, সেরকম সম্মান পাওয়ার এমন একজনের সঙ্গেই আমি কথা বলছি। তবে যেহেতু যার সঙ্গে কথা বলছি, তার চেয়ে আমার বয়স বেশি, এ-কারণে তুমি করে বলব বলে, আশা করি, নিজেকে অসম্মানিতা বোধ করবে না।’ ফেরদৌসী কোনো কথা বলে না। নাসিম বলে, ‘অপ্রত্যাশিতভাবেই আমরা একটা পরিস্থিতির মধ্যে এসে পড়েছি। তোমার ও আমার অভিভাবকেরা আমাদের একসঙ্গে জীবন কাটানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। সমাজ-সংসারের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী সাধারণভাবে সবাইকেই দাম্পত্য ধর্ম পালন করতে হয়। যারা চিরকুমার কিংবা চিরকুমারী থাকার ব্রত গ্রহণ করে, তাদের বিষয়টা ভিন্ন। ঘটনাচক্রে কারো কারো বিয়ে-শাদি হয় না, সেরকমও আছে। কিন্তু আমাদের তো তা নয়। কাজেই, বিয়ে আমাদেরও করতে হচ্ছে। তবে তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে না হয়ে অন্যের সঙ্গে হতে পারতো। তোমার বেলাতেও তা একইভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু বিয়ে তো হতো। কাজেই বিয়ে যখন এড়ানো যাচ্ছে না, তখন তোমার আমার বিয়ে হচ্ছে, তার ভেতরও তো কোনো অস্বাভাবিকতা নেই।’ এটুকু বলে নাসিম থামে। শ্রোতা কীভাবে গ্রহণ করছে, তাও তো একটা বিষয়। দেখে, ফেরদৌসী একরকম ভাবলেশহীন মুখে তার পাশে হাঁটছে। নাসিম বলে, ‘তুমি কি আমার কথা শুনছো?’ ফেরদৌসী আগের মতোই মাথা নাড়ে। তার মানে, শুনছে। নাসিম আবার শুরু করে। বলতে থাকে, ‘আমি শুনেছি, এ-বিয়েতে তোমার মতামত আছে। কিন্তু একটা বিষয়ে আমার পরিষ্কার হওয়া দরকার। সেজন্যই তোমার সঙ্গে কথা বলার সুযোগটা নিয়েছি। বিষয়টা হলো, বিয়ের ব্যাপারে আমাদের সমাজে মেয়েরা এখনো নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সে-বাস্তবতাও নেই। বাবা-মা-পরিবারের চাপে তাদের মৌনতাই সম্মতি হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সারা জীবন ধরে একটা অদৃশ্য রক্তক্ষরণ হতে থাকে। যেভাবে সংসার করে, সন্তানাদি প্রতিপালন করে, তাতে দেখে মনে হয়, তারা সুখেই আছে। আসলে তখন আর তাদের হৃদয়-মন বলে কোনো জিনিসের অস্তিত্বই থাকে না।’ একথা বলে আবার একটু থামে। তারপর জোর দিয়েই বলে, ‘আমিও তো একটা মেয়েকে বিয়ে করতে যাচ্ছি। কিন্তু আমি চাই না, তার জীবনেও এমনটা হোক। আমাকে বিয়ে করে সারা জীবন ধরে তুমি কষ্ট পাবে, যে-কষ্টের নিরবয়তা তোমার অস্তিত্বেও ধরা পড়বে না, অথচ শিখাহীন আগুনে পুড়বে। সেটা আমি হতে দিতে পারি না।’ এটুকু বলে ফেরদৌসীর মুখের দিকে তাকায় নাসিম। না, কোনো পরিবর্তন ধরতে পারে না। এরপর আবার বলে, ‘আর যে দুটো বিষয় রয়েছে, তা-ও বলি। একটি হলো মানুষের হৃদয়বৃত্তি, যা চিরন্তন। আগে থেকেই তুমি হয়তো কাউকে ভালোবাসতে পারো। জানো তো, ভালোবাসা একটি পবিত্র জিনিস। অন্যায়ও নয়, অপরাধও নয়। পাপ তো নয়ই। হয়তো অপ্রকাশ্য এই ভালোবাসা সযত্নে লালন করছো নিজের ভেতরে। এখন পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে গেছে। নিজের হৃদয়কে তুলে ধরার কোনো সুযোগ নেই। সেই প্রতিকূলতার কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে হচ্ছে। আরেকটি হলো, ভালোবাসা-টালোবাসার কোনো ব্যাপার নেই। কিন্তু পছন্দ-অপছন্দ তো আছে। আজকেই সামনাসামনি আমাদের দুজনের প্রথম দেখা। আমার তোমাকে পছন্দ না করাটাতে যেমন তোমার কোনো দায় নেই, আমাকে তোমার অপছন্দ করার বেলাতেও তাই। সুতরাং দায়হীন এই ভার কেন বহন করবে? আবার তাও সারা জীবন ধরে? তাই বলছি, তোমার মতামত, একজন শুভাকাঙ্ক্ষী জেনে, আমাকে অকপটে বলতে পারো। আমি দায়িত্ব নিয়েই এই অংকুরিত সম্ভাবনার ইতি টেনে দেবো। তোমাকে অপছন্দ করছি, এটা জানিয়ে নয়। সমস্ত দোষ-ক্রটি নিজের ঘাড়ে নিয়ে। কোনো কলুষ যেন তোমাকে স্পর্শ না করতে পারে, তা নিশ্চিত করেই। তুমি তোমার পছন্দের জীবনে ফিরে যাবে। আর তা আমার জন্যও হবে আনন্দের। ধরে নাও, এই আনন্দটুকু আমি তোমার কাছে ভিক্ষাই চাইছি।’ ফেরদৌসী এবার মুখ তোলে। বলে, ‘কথা শেষ হয়েছে?’ আসলে নাসিমেরও আর বলার কিছু ছিল না। যা কথা তা তো বলেই ফেলেছে। তাই উদগ্রীব মুখে ফেরদৌসীর দিকে তাকিয়ে থাকে। ফেরদৌসী বলে, ‘আমি এতো কিছু বুঝি না। শুধু জানি, আমার ভাগ্যই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে।’ একথা শুনে নাসিম স্তব্ধ হয়ে থাকে কতক্ষণ। সে যেন নিজের ভেতরে নেই। তারপর ধীরগলায় বলে, ‘তাহলে তো তোমার ভাগ্যটাও আমাকে দিতে হবে?’ উৎসুক চোখে নাসিমের দিকে চায় ফেরদৌসী। নাসিমের মাঝে ফিরে আসে তার সহজ কৌতুকপ্রিয়তা। বলে, ‘মানুষের করতলে অনেক রকমের রেখা আছে। ভাগ্যরেখাও তার মধ্যে একটা। সবার হাতে নাকি তা থাকে না। এক হস্তবিশারদ আমার হাত দেখে বলেছিলেন, আমার হাতেও ভাগ্যরেখা নাই। শুনেছি, সম্রাট নেপোলিয়নের হাতেও নাকি ভাগ্যরেখা ছিল না। তিনি নিজের হাত কেটে বলেছিলেন, আমি আমার ভাগ্যরেখা বানিয়ে নিলাম।’ এরপর একটু হেসে বলে, ‘আমার তো অতটা সাহস নাই। তাই নিজের হাত কেটে ভাগ্যরেখা বানিয়ে নিতে পারিনি। তাই তোমার ভাগ্যটাই চেয়ে নিচ্ছি।’ ফেরদৌসী এতক্ষণ ছিল চিন্তাযুক্ত। অনেকটা গম্ভীর। কী থেকে কী বলবে? এখন তার মুখেও আসে হাসির ঝিলিক। নাসিম বলে, ‘না, না, একবারে সব দিতে হবে না। দিনে দিনে একটু একটু করে দিও।’
তিন
তাহলে কি, নটে গাছটি মুড়ালো? কী করে মুড়াবে? কেবল তো বোনা হচ্ছে। ফজিলা বানু ফেরদৌসীকে কাছে বসিয়ে বললেন, ‘বোনডি, এ-বাড়ির একটা প্রশস্ত আঙিনা থাকবে তোমার জন্য। তুমি পছন্দ করে নেবে। সেখানে বাগান করবে। ফুলগাছ বুনবে। পানি দেবে। তারপর কী করে কলি বেরোয়, ফুল ফোটে, দেখবে। তোমার ভালো লাগবে না?’ ফেরদৌসী বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে ভাবে, সম্মোহনী কী শক্তি আছে এই বৃদ্ধার মধ্যে। একদিন সে-ও কি তাঁর মতো হবে? ফজিলা বানু কিন্তু থেমে থাকলেন না। এমনিতেই লেখাপড়া জানা ছেলেদের মত-মতলব ঠিক থাকে না। তারপর তাঁর নাতি ছোট কলেজ সেরে বড় কলেজ – মানে বিশ্ববিদ্যালয়ের, তিনি শুনেছেন, বারোটা বাজিয়ে বিদ্যাদিগ্গজ হয়ে এসেছে। একবার ঘাড় যখন পেতে দিয়েছে, বিলম্ব করলে ছুটে বেরিয়ে যেতে পারে। তাই তিনি কন্যাপক্ষের সবাইকে ডেকে, দরকার ছিল না, তবু হাত জোড় করে বললেন, ‘আমি আজ রাতের মধ্যেই শুভ কাজ সমাধা করে ফেলতে চাই। জোগাড়যন্ত্র তেমন কিছু নেই।’ এটুকু বলার পর মনসুর রহমানকেই উদ্দেশ করে বললেন, ‘বাবা, তোমরা তো দরিয়াকে দেখতে এলো। সেই রাতেই বিয়ে। সুজাবত আমাকে খবর দিলো রাত ন’টার পর। আমার যেতে যেতে আরো দু-ঘণ্টা। তারপর বিয়ে হলো, তখন তো আরো রাত। তারপর দিনক্ষণ ঠিক করে অনুষ্ঠান করে মেয়েকে তুলে নিয়ে গেলে। এখানে অবশ্য মেয়ে আমাদের বাড়িতেই আছে। অসুবিধা কী, বিয়ে হয়ে থাকবে। তারপর অনুষ্ঠানাদি যা আছে, তাও করা যাবে পরে।’ তারপর থেমে একটু সময় নিয়ে জোর দিয়েই বললেন, ‘অমত করো না। উপস্থিত আমার যা আছে, তা দিয়েই কাজ সম্পন্ন করা হবে। কিন্তু বিয়েটা আমি আজ রাতেই শেষ করতে চাই।’
একটা সুবিধা হয়েছে কি, সারা দেশজুড়েই ‘ফুড ফর ওয়ার্ক’-এর রবরবা চলছে। মিলিটারি শাসকদের কাছে, ‘মানি ইজ নো প্রবলেম।’ টাকা-পয়সাও আসছে প্রচুর। তার একটা ভাগ যাচ্ছে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের পকেটে।
বিন্নাছোপা- আগাছা কেটে, আগাড়-পাগাড় ভরাট করে বানানো হচ্ছে রাস্তাঘাট। হোন্ডা কিনে সেই রাস্তায় তারা ভট্ভট্ আওয়াজ তুলে ধোঁয়া উদ্গিরণ করে চলেছে দিনভর। দেখাচ্ছে – দ্যাখ কী বানিয়েছি। কত উন্নতি করেছি এলাকার? অন্যদের – যাদের টাকা-পয়সা হয়েছে, তারাও বসে নেই। আফটার অল, এরকম একটা সশব্দ গাড়ি থাকার অর্থ স্ট্যাটাস জানান দেওয়া। যাতায়াতে সময় বাঁচে। এজন্য হাফ ডজন হোন্ডাও মোতায়েন করা হয়েছে বিয়ে উপলক্ষে। কাকে যে কখন কোথায় পাঠাতে হয়, তার কি ঠিক আছে? নাসিমের বড়ভাইকে খবর দেওয়ার কোনো উপায় নেই। আসা তো দূর অস্ত। সে থাকে সপরিবারে ত্রিপুরাতে। তবে মেজোভাই নঈম হোসেন জেলা সদরে জজ কোর্টের উকিল। মোতায়েন করা হোন্ডার একটা নিয়ে একজনকে পাঠানো হলো সেখানে। এখানে বিয়ের শাড়ি ও অন্যান্য জিনিস তেমন পাওয়া যায় না। তাকে বলা হলো, বিয়ের স্যুটকেস সাজিয়ে স্ত্রী-ছেলেমেয়েকে নিয়ে আসতে। তবে যত দ্রুতই হোক, আগামী কাল সকাল দশটা-এগারোটার আগে আসা তার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বিকল্প হিসেবে ফজিলা বানু ঠিক করলেন, স্থানীয়ভাবে একটা নতুন শাড়ি এনে কবুল পড়ার কাজটা সেরে ফেলবেন। গহনাপত্র নিয়ে তেমন ভাবনার কিছু ছিল না। এক একটা নাতি-নাতনির বিয়ে হয়, আর তার পরের জনের জন্য সাধারণভাবে যা দরকার, ফজিলা বানু তা মজুদ করেন। নঈমের বিয়ে হওয়ার পর সিরিয়াল হলো নাসিমের। তার জন্যও ব্যবস্থা করা ছিল। সোনা – সোনাই। তবু অনেকদিন ধরে তোলা আছে। তাই একটু ঘষামাজা করাই উত্তম। বিশ্বনাথ ওরফে বিশু তাদের বাঁধা স্বর্ণকার। এলাকাতেই বাড়ি। তাকে ডাকলেই চলে আসবে। কিন্তু আসা-যাওয়াতে সময়ের অপচয়। তার চেয়ে কাউকে পাঠানোই ভালো। কিন্তু কাকে পাঠাবেন? কায়সারের যদিও দিন ফুরিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু এই হঠাৎ বিয়ে তার পাঠে বিঘ্ন ঘটাল। সে আর কিছুতেই মনোনিবেশ করতে পারছে না। টেবিলে বসে বসে উসখুস করছে। এতো বড় একটা কাণ্ড ঘটছে। কোথায় সে ব্যস্তসমস্ত হয়ে ছোটাছুটি করবে। নানা রকম ফাইফরমাস তামিল করা নিয়ে গলদঘর্ম হবে। তা না, কেউ তাকে ডাকছে না। কিছু করতেও বলছে না। একবার বইয়ের দিকে চায় তো, একবার দরজার দিকে। না হলে জানালার দিকে। এই অস্থিরতা নিরসনের কোনো উপায় খুঁজেও পাচ্ছে না। এমন সময় ফজিলা বানু এসে তার ঘরে ঢুকলেন। তার সঙ্গে ইয়াসমিন আরা। তার হাতে একটা ছোটখাটো বাক্স। তিনি কায়সারকে বললেন, ‘একবার বিশুর বাড়ি যা তো।’ এরপর ইয়াসমিন আরাকে দিয়ে বাক্সটি খোলালেন। কায়সার দেখে গহনাভর্তি। বড় বড় হয়ে যায় তার চোখ। তা দেখে ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘চিন্তা করিস না? তোর বিয়ের সময়ও হবে।’ একথা শুনে লজ্জা পেয়ে যায় কায়সার। বলে, ‘ধ্যাৎ, কি যে বলেন?’ ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘কেন, তুই বিয়ে করবি না? তাহলে তো অনেক খরচ বেঁচে যাবে।’ ফজিলা বানুও কৌতুক করে অভয় দেন। বলেন, ‘ঠিক আছে। ঠিক আছে। এখন তোর বিয়ে করা লাগবে না। আগে যা বলছি, তাই কর। বউমা, গহনাগুলো বিছানার ওপর ঢালো তো।’ ইয়াসমিন আরা সেগুলি বিছানার ওপর রাখলে তিনি কায়সারকে বলেন, ‘একটা একটা করে গুনে গুনে বাক্সে ভর। আর মনে রাখ কয়টা হলো।’ কায়সার তখন গহনার নাম বলে বলে ভরতে থাকে – মালা, দুল, আংটি …। এই রকম দু-চারটে ভরার পর বলে, ‘দাদিমা, সব তো চিনতে পারছি না।’ ফজিলা বানু বলেন, ‘তোর চেনা লাগবে না। তুই শুধু মনে রাখবি কয়টা হলো।’ কায়সার সব বাক্সে ভরার পর ফজিলা বানু বলেন, ‘তুই যেমন গুনে নিলি, সেই রকম গুনে গুনে বিশুকে দিবি। আর বলবি, দু-ঘণ্টার মধ্যে এগুলি পরিষ্কার করে দিতে। কাজ ঠিকমতো করছে কি না, তা দেখার জন্য তুই বসে থাকবি। কাজ শেষ হলে আবার গুনে গুনে ভরে নিয়ে আসবি।’ গহনার বাক্স আনা-নেওয়ার মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়ে কায়সার মহাউৎসাহে রওনা হয়ে যায়।
তবে বিয়ে যত সাদাসিধেই হোক, পাত্রীকেও তো কিছু ঘষেমেজে তোলার ব্যাপার আছে। আর কিছু না হোক, হলুদ তো দিতে হবে একটু। গায়ে-হলুদ বিয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি। কিছু স্ত্রী-আচারও আছে। তদুপরি ফেরদৌসী এসেছে সকালে। শাড়ির প্রতি উঠতি বয়সের মেয়েদের অনুরাগ স্বভাবসিদ্ধ। এমনিতে তা পরা হয় না। তাই বেড়াতে যাচ্ছে, না পরলে কি হয়? সারাদিন সেটাই আছে তার পরণে। ঠান্ডার দিন বলে গোসল করাও হয়নি। পাক-পবিত্র হওয়ার জন্য তা আবশ্যকীয়। হলুদটা লাগিয়েই সেটা সমাধা করা যাবে। তাই হলুদ-গোসল দিয়েই করতে হবে শুরু। কিন্তু নাসিমের বড়চাচার মেয়ে রোশেনারার আসতে দেরি হওয়ার জন্য তা বিলম্বিত হয়ে যাচ্ছিল। সে নাসিমের সমবয়সী। মেয়ে বলে বিয়ে আগে হওয়ার জন্য তার মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল। শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় শর্ত দিয়ে রেখেছিল, তাকে ছাড়া যেন নাসিমের বিয়ে না দেওয়া হয়। এরপর যতবারই বাপের বাড়ি এসেছে, প্রত্যেক সময়েই খোদেজা খাতুনকে কথাটা মনে করিয়ে দিত। কনের বাড়িতে বিয়ে হলে তাকে অবশ্যই সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হতো। এখন সেটা হচ্ছে না। কিন্তু বিয়ে তো হচ্ছে। তাকে বাদ দিলে এসে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে বসবে। সে যে জেদি মেয়ে, হয়তো বলবে, ‘আর আসবই না বাপের বাড়ি।’ তাই রোশেনারাকে নিয়ে আসাটা ছিল অনিবার্য। তার শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব না হলেও আট-দশ মাইল। তাকে তো একা আনা যাবে না। জামাতাকেও আনতে হবে। ছেলেমেয়েরাও আছে। ব্যাগ-বোচকাও থাকবে। হোন্ডা দিয়ে লোক পাঠিয়ে তাকে খবর পাঠানো হয়েছে। আরো দু-চারটা পাঠিয়ে তাতে ভাগাভাগি করে চড়িয়ে নিয়ে আসার কথাটা ফজিলা বানুর মনেও হয়েছিল। তবে
দু-চাকার গাড়ি তার কাছে সব সময়েই মনে হয় বিপজ্জনক। তারপর রাত্রিকাল। ভাঙাচোরা গ্রামের রাস্তা। না হয় দেরিই হবে। কিন্তু ঝুঁকি নেওয়াতে তার মন সায় দেয়নি।
জামাতা আসতে পারছে না। কি খুব দরকারি কাজ আছে ঢাকাতে। ভোরেই তাকে রওনা হতে হবে। তবে খবর পাওয়ার অল্পক্ষণের মধ্যেই রোশেনারা রওনা দিয়েছে। সে-খবরও এসে পৌঁছেছে। কিন্তু বাহন তো গরুর গাড়ি। তাই তো, গরু একটি অত্যাশ্চর্য জীব। তার মতো উপকারী প্রাণী, বোধ করি, আর একটিও নেই। এজন্যই বুঝি, স্কুলে গরুর রচনা ছাত্রদের খুব মনোনিবেশ সহকারে পড়তে হয়। গোমাংস তো অতি উপাদেয় খাদ্য।
হাড়-শিং-গোবর-চর্ম – কোনোকিছুই ফেলনা নয়। তার ঘাড়েই চলে মাল পরিবহন। মহিলা বহনের জন্য তার প্রয়োজনীয়তা বিকল্পহীন। কেননা গ্রামদেশে পর্দা-পুশিদা-ইজ্জত-আব্রু – সব রক্ষিত হয় ঢেকেঢুকে রাখা ছইয়ের ভেতর। রোশেনারাদের বহনকারী গরুর গাড়ি এসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত ন’টা পার। রাত যা হয় হোক, মেয়ে যে তার ছেলেমেয়েসহ নিরাপদে এসে পৌঁছেছে, এটাই বড় স্বস্তি। গরুর গাড়িতে আসা। ক্লান্তি কোনো ব্যাপার নয়। বরং বাঁচা তো গেছে রাস্তার ঠোক্কর খেতে খেতে ঝিমুনির বিরক্তি থেকে। সে কাজের মেয়ে। এসেই লেগে গেল। মধ্যমণি তো ফেরদৌসী। দেখে, বোধ হচ্ছে, সে যেন এক অনুভূতিহীন মানবীদেহ। সবাই মিলে ঘিরে বসে কথাবার্তা হচ্ছে। আলোচনার বিষয়বস্তু – গোসলপর্ব। পানি ঠান্ডা হবে, না গরম – তা নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো যাচ্ছে না। এমন সময় মঞ্চে সদর্পে ও সগর্বে আবির্ভূত হয় কায়সার। হাতে তার বিশু স্বর্ণকারের ঝকঝকে করে দেওয়া গহনাভর্তি বাক্স। শুনেও ফেলে কী নিয়ে কথা হচ্ছে। এতো বড় একটা কাজ করে এলো, সুতরাং তারও মতামত দেওয়ার একটা অধিকার জন্মে গেছে! সে বলে, ‘পানি হলো প্রাকৃতিক সম্পদ। গরম করে তার
স্বভাব-প্রকৃতি বদলে দেওয়া ঠিক হবে না।’ ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘তোকে কথা বলতে কে বলেছে? আর কথা বললে, তোকেই আগে ঠান্ডা পানিতে চুবিয়ে আনবো। যা এখন। আগে আম্মাজানের কাছে গুনে গুনে গহনাগুলি বুঝিয়ে দিয়ে আয়।’ সংগত কারণেই ফজিলা বানু সেখানে ছিলেন না। দমে গিয়ে কায়সার বলে, ‘দাদিমা কোথায়?’ ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘তিনি তো কাজে ব্যস্ত। তুই বরং খোঁজ করে বাক্সটা তাকে বুঝিয়ে দিয়ে আয়। জানিস তো, জিনিসগুলি কত দামি।’ কায়সার আর করে কী? অনেকটা মনঃক্ষুণ্ন হয়েই ফজিলা বানুকে খুঁজতে বেরোয়। শেষ পর্যন্ত ঠিক হয় পানি ঠান্ডাই থাকবে। বেশি পরিমাণ না ঢাললেই হলো। নাসিমের কাছে যখন গোসলের প্রস্তাব পেশ করা হলো, সে তো যেন আকাশ থেকে পড়ল। রোশেনারাকে বলে, ‘দিবি তো গায়ে হলুদ। গোসলের কী দরকার? তোর এসে প্রথম কাজ হয়েছে ঝামেলা পাকানো।’ রোশেনারা বলে, ‘ধর, তাই করেছি। বিয়ে করবি পাক-পবিত্র না হয়েই।’ শরিকান্ত বোনেরা সব রোশেনারার সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলে, ‘বুবুজান তো ঠিকই বলেছে।’ এরাও তাহলে এসে হাজির হয়েছে দল পাকাতে। নাসিম বলে, ‘পাক-পবিত্র আমি এমনিতেই আছি। সকালে একবার গোসল করেছি। বিকেলে আবার। সারা দিনরাত ধরে আমি কি কেবল গোসলই করব?’ রোশেনারা বলে, ‘না করে উপায় নাই। বিয়ে করার জন্য পাত্রীকে পর্যন্ত বাড়িতে নিয়ে এসেছিস। এখন গোসল না করলে হবে?’ নাসিম বলে, ‘পাত্রীকে নিয়ে এসেছি, মানে? আমি কি জানতাম ও আসবে?’ রোশেনারা বলে, ‘আমাকে ওসব কথা বলে লাভ হবে না। এখন কলপাড়ে চল। আমরা অল্পতেই সেরে দেবো। বিয়ের আগে ঠান্ডা লেগে আমাদের ভাইয়ের সর্দিকাশি হোক, আমরা কি তাই চাই?’ নাসিম বলে, ‘থাম। থাম। একটা জিনিস আগে বুঝে নিই।’ রোশেনারা বলে, ‘কী বুঝবি?’ নাসিম বলে, ‘গত বছর এক বন্ধুর বিয়েতে গিয়েছিলাম। মাঘ মাস। বিয়ের লগ্ন যা হোক, খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল রাত বারোটার পর। এখন কন্যা লগ্নভ্রষ্টা হলে তো আর বিয়েই হবে না। তাই আমার বন্ধুকে ছাদনাতলায় খালি গায়ে থাকতে হলো প্রায় দু-ঘণ্টা। তারপর সারা দিন না খাওয়া। সেই কি কষ্ট!’ রোশেনারা বলে, ‘আমাদের বিয়েতে তো আর লগ্ন নাই। লগ্নভ্রষ্টা হওয়ারও কোনো চান্স নাই। এসব গালগল্প শুনিয়ে তোর কোনো লাভ নেই। তাই, যত রাত ধরেই তুই আগড়ম-বাগড়ম করিস, গোসল তোকে করতেই হবে।’ নাসিম বলে, ‘আমি আসলে একটু বোঝার চেষ্টা করছিলাম, শীতের রাতে খালি গায়ে থেকে বিয়ে করতে আমার বন্ধুর বেশি কষ্ট হয়েছে, নাকি ঠান্ডা পানিতে গোসল করতে গিয়ে আমার বেশি হবে।’ রোশেনারা বলে, ‘সে গোসল করার পর দাঁড়িপাল্লাতে মেপে দেখিস। এখন ওঠ।’ নাসিম হতাশভাবে মাথা নাড়ে। আর ভাবে, আমারই এই অবস্থা, ফেরদৌসীর না জানি কী দশা করেছে!
কাছারির বড় ঘরটাতে অধিষ্ঠান হয়েছে বর নাসিমের। ফজিলা বানুর ঘরে ফেরদৌসীকে মধ্যমণি করে ঘিরে ধরেছে মেয়েরা সবাই। কাজি সাহেব রয়েছেন বরের সামনে। তিনি বলেন, ‘কার্য আরম্ভ করার পূর্বে বরের দু-রাকাত নফল নামাজ পড়ে নেওয়া ওয়াজেব।’ বিপদ! নাসিম আর করে কী? নামাজের নিয়মকানুন জানা, কিন্তু পড়ার অভ্যাস নেই। ভুলভ্রান্তি হয়ে গেলে আরেক ফ্যাসাদ। বিশেষ করে ফেরদৌসীর বাবা-মামা যেখানে উপস্থিত। অনেক সুরাই মুখস্থ। নামাজ পড়ার সময়, তবু ভালো, উচ্চৈঃস্বরে উচ্চারণ করার এলান আসেনি। কাজি সাহেব কাবিননামা লিখছেন। কায়সার ছিল সেখানে। সে বেরিয়ে দ্রুত কনের আসরে হাজির। রোশেনারকে বলে, ‘বুবু, বাঁচলাম। কাবিননামাতে ভাবির নামটা চেঞ্জ হয়নি।’ সবাই হই-হট্টগোল থামিয়ে উৎসুক চোখে তাকায় কায়সারের দিকে।
রোশেনারার আদ্যোপান্ত কিছুই হৃদয়াঙ্গম হয় না। সে বলে, ‘কার নাম চেঞ্জ হবে?’ কায়সার বলে, ‘ভাবির।’ রোশেনারা বলে, ‘ভাবির? মানে, কোন ভাবির?’ কায়সার বলে, ‘নতুন ভাবির। ওই যে বসে রয়েছে।’ – বলে ফেরদৌসীকে দেখায়। রোশেনারা বলে, ‘কেন? কেউ কি নাম বদলে দিচ্ছে?’ কায়সার বিজ্ঞের মতো বলে, ‘দেয়নি। কিন্তু দিতে তো পারতো।’ রোশেনারা অনেকদিন পরে এসেছে। কায়সার ছোটভাই। সে স্নেহের সুরেই বলে, ‘বলবি তো, পালটাবে কেন?’ কায়সার এবার একগাল হেসে বলে, ‘বুবু, বুঝলেন না, রবীন্দ্রনাথ তো পালটেছিলেন। তাঁর পাত্রীও তো খুলনা থেকে কলকাতায় এসেছিল বিয়ের জন্য। আমাদের ভাবিও তাদের বাড়ি থেকে আমাদের বাড়িতে এসেছে। এখানে একটা মিল হলো না?’ কায়সারকে আসা দেখে ইয়াসমিন আরাও এসে উপস্থিত হন। ছোড়াটা আবার কী না কী বলবে, হবু বউয়ের সামনে, তার কি ঠিক আছে? তিনি বলেন, ‘মিল হলো তো হলো। ভালো কথা। নাম চেঞ্জের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক? আর নাম চেঞ্জ হলে তোরই বা কী? বেশি বুঝমান হয়েছিস, না?’ কায়সার বলে, ‘না, চাচিমা, তা নয়। ভবতারিণী নামটা ছিল সেকেলে। রবীন্দ্রনাথ তাই বদলে রেখেছিলেন মৃণালিনী। আমাদের ভাবির নামটা তো খুব সুন্দর। যদি বদলে ফেলে, খুব খারাপ হতো না?’ কথা শেষ করতে না দিয়ে ইয়াসমিন আরা পরিহাস করে বলেন, ‘তোর ভাই তো কবিতা লেখে, তাই -।’ ইয়াসমিন আরার একথা শুনে সবাই হেসে ওঠে। রোশেনারা ফেরদৌসীর থুতনিতে হাত দিয়ে বলে, ‘এতো দিন লেখেনি। এবার লিখবে।’ বিয়ের কনে। ফেরদৌসীর তো চুপ করে থাকতেই হবে। কিন্তু বাকি প্রায় সবাই হাততালি দিতে থাকে। ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘থামো তো তোমরা।’ তারপর কায়সারকে বলেন, ‘দিন দিন দেখছি তুইও ভারি বাচাল হয়ে উঠছিস। বিয়ে হোক। ভাবি হোক। তখন সুন্দর-অসুন্দর নিয়ে গবেষণা করিস। এখন যা। বিয়ে শেষ না হওয়াতক ত্রিসীমানায় আসবি না।’
কাজি সাহেব এলেন নাসিমের ইজাব নিয়ে কনেকে কবুল পড়াতে। ধরাবাঁধা গদ শেষ করে ফেরদৌসীকে বলেন, ‘আপনি রাজি আছেন?’ ফজিলা বানু শত কাজ করছেন। চতুর্দিকে নজর রাখছেন। কিন্তু তার মন পড়ে আছে ফেরদৌসীর দিকে। সুযোগ পেলেই এক-একবার এসে দেখে যাচ্ছেন তাকে।
মেয়েটা বিকেল থেকেই কেমন যেন নির্বিকার হয়ে গেছে। চোখ অচঞ্চল। স্থির। পলক পড়ছে না। ঠোঁট দুটো জমাটবদ্ধ। শরীরে কোনো প্রতিক্রয়া নেই। তাকে ঘিরে সবাই কথা বলছে মজার মজার। কিন্তু কোনো কিছুই শুনছে বলে মনে হয় না। যখন যা বলা হচ্ছে, যন্ত্রের মতো তা সে পালন করছে। বিয়ের শাড়ি তো এখানে পাওয়া যায় না। স্থানীয় দোকানগুলি ঘুরে ঘুরে একটা পাওয়া গেছে। লালের আবীর মেশানো। সুতি। তাই তাকে পরানোও হয়েছে। গহনাগুলি অবশ্য প্রত্যাশামতোই বিশু ওরফে বিশ্বনাথ স্বর্ণকার পোলিশ করে দিয়েছে। পরিমাণ এবং প্রতিটির ওজন বিবেচনা করে, বিশেষ করে রহমতুন্নেসা যে খুশি হয়েছেন, তা না বোঝারও কিছু নেই। সেগুলি যখন ফেরদৌসীর হাতে-পায়ে-গায়ে পরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল সে একটি পুতুল। তাই কবুল পড়ানোর সময় ফজিলা বানুর মনটাতে অস্থিরতা এসে কুণ্ডলী পাকাচ্ছিল। তবে কি তিনি ভুল করলেন? এই ভুলের দায়িত্ব তো এককভাবে তারই। কীভাবেই বা তিনি তার মাশুল জোগাবেন? নাসিম তো পুরুষ মানুষ। তার একটা বহির্জীবন আছে। হয়তো তার কিছু যাবে-আসবে না। কিন্তু এই মেয়েটার কী হবে? তিনি নিজেও জানেন, স্ত্রীলোকের মন পুরুষেরা গণনার মধ্যেই রাখে না। ফজিলা বানুও উৎকর্ণ হয়ে ফেরদৌসীর মুখের দিকে তাকান। ফেরদৌসী সময় নিল না। ফজিলা বানু দেখলেন তার চোখের তারায় সাড়া এলো। দৃঢ় পিনদ্ধ ওষ্ঠদ্বয় কেঁপে উঠছে। কিন্তু কী বলবে? ফজিলা বানু শোনেন, ফেরদৌসী বলছে, ‘আমি রাজি আছি।’ পূর্বেকার গদের পুনরুক্তি হলো। উত্তর, ‘আমি রাজি আছি।’ আবারো। উত্তর, ‘আমি রাজি আছি।’ স্পষ্ট উচ্চারণ। কোনো জড়তা নেই। শীতের দিনে চাদর জড়ানো শরীর। মুখমণ্ডল ছাড়া আর কিছু দেখার উপায় নেই। কিন্তু সেখানে যেন এক অদ্ভূত পরিতৃপ্তি। একটা জগদ্দল পাথর নেমে গেল ফজিলা বানুর বুক থেকে। এরপর তো শুরু হবে ছেলেখেলা!
এবার তাহলে কী ছেলেখেলা হয়, তার বিবরণ দেওয়া যাক। নাসিমকে নিয়ে আসা হয় বাড়ির প্রশস্ত আয়তাকার বড় উঠানটিতে। হিম থেকে বাঁচার জন্য তার ওপরে টাঙানো হয়েছে সামিয়ানা। নিচে খড় পেতে পেতে বিছানো হয়েছে চাদর। চেয়ার-কেদারাও নিজেদের আর শরিকদের মালিকানায় যা ছিল, হয়েছে আনা। যার একটিতে উপবেশিত হয় নাসিম। চারপাশে জ্বালানো আছে চারটে হ্যাজাক। বাকি সবাইও সেখানে হাজির। ব্যতিক্রম সাদাত হোসেন। তিনি খোদেজা খাতুনকে বললেন, ‘আমি ঘরে যাচ্ছি।’ খোদেজা খাতুন বলেন, ‘তা কি করে হয়? আপনি তো বাবা। আপনি না থাকলে হবে? বেয়াই সাহেবরা কি মনে করবেন?’ সাদাত হোসেন কোনো উত্তর না দিয়ে চলে যান। খোদেজা খাতুন ভেবে পান না কী করবেন? বলবেনই বা কী? অন্যের ক্ষতি হয় না, এমন মিথ্যা কথা নাকি বলা যায়? তবে শরীর খারাপের কথা বললে আবার অন্য সমস্যার সৃষ্টি না হয়? তাই তিনি মিথ্যা কথাই বা কী বলবেন, ভেবে পান না। তবে খোদেজা খাতুনকে আর সে পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। আজহার হোসেন তার ভ্রাতাকে চেনেন। ভিড়ভাট্টা সহ্য করতে পারে না। গোলাম সারোয়ার যখন সাদাত হোসেনের কথা জিজ্ঞেস করেন, তখন তিনিই সামলে নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘বিয়ের সময় তো ছিল। ওর সামান্য ডিপ্রেশনের সমস্যা আছে। বেশিক্ষণ হই-হট্টগোলের মধ্যে থাকলে যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাই এখনকার আয়োজনটাতে থাকছে না।’
ফেরদৌসীকে নিয়ে এলেন রহমতুন্নেসা। তাহেরা খাতুন ও দরিয়াও সঙ্গে। পতিই তো সতীর গতি। নাসিমের সামনে আসার পর, তাকে বলা হয়, ‘সালাম করো।’ অর্থাৎ পা ছুঁয়ে ধুলা মাখতে হবে মাথাতে। ভক্তির পরাকাষ্ঠা দেখানো হবে তাতে। ফেরদৌসী মাথা নোয়ানোর উপক্রমণিকা শুরু করতে যাচ্ছে। এমন সময় তড়িৎগতিতে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায় নাসিম। বলে, ‘এ আবার কী? সালাম কেন?’ তাড়াতাড়ি সরিয়ে নেয় পা। রোশেনারা বলে, ‘সালাম নিবি না? পছন্দ করে বিয়ে করলি?’ নাসিম বলে, ‘পছন্দের সঙ্গে সালামের কী সম্পর্ক?’ তাহেরা খাতুন বলেন, ‘নাতি, সালাম তো নিতেই হবে। নারীর বেহেশত হলো স্বামীর পদতল।’ নাসিম বলতে চায়নি। কিন্তু মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়, ‘আপনার নাতনি কি এখনই বেহেশতে যেতে চায়?’ বলেই বুঝতে পারে কথাটা ঠিক হয়নি। তাই সঙ্গে সঙ্গেই বলে, ‘ঠিক আছে। ঠিক আছে। তবে নানি, ও আমাকে সালাম করলে, আমাকেও যে করতে হয়। আপনারাই তো বলেন, স্বামী-স্ত্রীর অধিকার সমান। আমার পদতলে যদি ওর বেহেশত থাকে, তবে ওর পদতলে নিশ্চয়ই আমার জন্যও কিছু না কিছু আছে?’ খোদেজা খাতুন এসে হস্তক্ষেপ করেন। বলেন, ‘আমি বলি কি, ওরা কী করবে না করবে, তা না হয়, ওরা দুজনই ঠিক করে নেবে। আপনারা যাঁরা ময়মুরুব্বি-গুরুজন আছেন, তাঁদের আশীর্বাদটাই ওদের জন্য বেশি জরুরি। আপনারা ওদের সালাম নিন। ওরা শুরু করুক।’ কিন্তু শুরু করা গেল না। রোশেনারার ভূমিকা সঞ্চালিকার। সে বলে, ‘মেজোচাচিমা, সালাম পরে। আগে তো মুখদর্শন। দুজন দুজনকে না দেখেই কি একসঙ্গে সালামে বেরুবে?’ তা-ও তো কথা। বামা শক্তির প্রশস্তির তো কোনো শেষ নাই। সেই শক্তি নাসিমের মধ্যে সংক্রমিত করার জন্যই ফেরদৌসীকে বসানো হলো নাসিমের বাঁ পাশে। এবার মুখদর্শন। নাসিম আসলে ফেরদৌসীর কথাই ভাবছিল। বিবাহকাণ্ড শুরু হওয়ার পর যে অত্যাচার তার নিজের ওপর দিয়ে গেছে, তার কোনো অংশে কম যে ফেরদৌসীর ওপর হয়নি, তা নিশ্চিত। রীতি-আচার পালনের জন্য যে মানসিক চাপ, তা আগ্রাসী হয়ে শরীরকে বিকল করে দিতে পারে। তার ভয় হচ্ছিল, পাছে, ফেরদৌসী অসুস্থ হয়ে না পড়ে। তাই সে চাচ্ছিল, যত সংক্ষেপে এসবের ইতি টানা যায়। কিন্তু তা কি হওয়ার? একটা বড় আয়না আনা হয়। নাসিম বলে, ‘আয়না কেন?’ রোশেনারা ধমক লাগায়। সে বলে, ‘সবকিছুতেই কথা? মুখ দেখতে হবে না? দুজন কি একজন আরেকজনের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকবি? যুগল মুখ ভেসে উঠবে আয়নাতে। ভালো লাগবে না তা দেখতে?’ নাসিম বলে, ‘মুখ তো দেখতে চেয়েছিলাম একবারে, বিয়ের পর। তাতে একটা রোমাঞ্চের ব্যাপার হতো। তা তো হয়নি। আমরা তো আমাদের আগেই দেখে ফেলেছি।’ রোশেনারা বলে, ‘হাজারবার দেখলেও বিয়ের পর এভাবে দেখতেই হবে। এটা আচার।’ নাসিম বলে, ‘রাখ তো তোদের আচার-বিচার। খালি সময় নষ্ট!’ রোশেনারা হেসে বলে, ‘ধর, বিয়ে করে তো জীবনটাই নষ্ট করে ফেললি! সময় নষ্ট হলে আর কি হবে?’ এখানেও আপত্তি টিকলো না। ইয়াসমিন আরা এবার গ্লাসভর্তি শরবত নিয়ে আসেন। নাসিমকে বলেন, ‘খা।’ নাসিম একটু অবাকই হয়। পাশে নববধূ রয়েছে। একা খাবে? কেমন একটা অভদ্রতার ব্যাপার। ফেরদৌসীকে দেখিয়ে বলে, ‘ও খাবে না?’ ইয়াসমিন আরার মুখে ফুটে ওঠে বিচিত্র হাসি। বলেন, ‘বউকে না খাইয়ে রাখা! দরদ তো দেখছি এখনই উথলে উঠছে।’ লজ্জা পেয়ে যায় নাসিম। বলে, ‘দিন।’ ইয়াসমিন আরা গ্লাসটা নাসিমের মুখ বরাবর ধরে রাখেন। অর্ধেকটা খাওয়া হলে সরিয়ে নেন। নাসিমের খাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। ভাবল, ভালোই হলো। এবার তিনি ফেরদৌসীর মুখে ধরেন। বলেন, ‘বউমা, চলতে তো হবে – মিলেমিশে – ভাগাভাগি করে। এর আর্ধেকটা তোমার। খাও।’ এ-কথা শুনে লজ্জাবনত ফেরদৌসীও চুমুক শুরু করতে যাবে। এমন সময় হা হা করে ওঠে নাসিম। বলে, ‘ছোটচাচিমা, ছোটচাচিমা, করেন কী?’ এমনভাবে চেঁচিয়ে ওঠে, সচকিত হয়ে পড়ে অন্যরাও। ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘কেন, কী হয়েছে?’ নাসিম বলে, ‘আমি তো গ্লাসটাতে মুখ লাগিয়েছি।’ ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘হ্যাঁ, লাগিয়েছিস, তো কী হয়েছে?’ নাসিম বলে, ‘এখন আবার ওই গ্লাসেই ও খাবে?’ ইয়াসমিন আরা একটু ধৈর্য ধরে বোঝাতে চেষ্টা করেন। বলেন, ‘গ্লাসের অর্ধেক শরবত তুই খেয়েছিস, বাকি অর্ধেক বউমা খাবে। এটাই রীতি। সবাই খায়, তোদেরও খেতে হবে।’ নাসিম অপ্রসন্নচিত্তে মাথা নাড়ে। বলে, ‘জানেন, এটা কতটা আনহাইজেনিক। অস্বাস্থ্যকর। আমার মুখে তো সংক্রামক ব্যাধিও থাকতে পারে। সেই ব্যাধি আরেকজনের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে।’ ইয়াসমিন আরা হেসে বলেন, ‘বউমার স্বাস্থ্য নিয়ে তোর উদ্বিগ্নতা বাকি জীবন ধরে যেন এমনই থাকে। এখন আমাদের কাজটা করতে দে। বউমা, শরবতটুকু খেয়ে নাও তো।’ নাসিমকে নতুন করে কিছু বলার সুযোগ না দিতেই বোধ করি ফেরদৌসী নিঃশব্দে খেয়ে নেয়।
রাত বেড়ে যাচ্ছে। উত্তুরে হিমেল বাতাস প্রবল প্রতাপে প্রবাহিত হচ্ছে। সবার বিশ্রামও প্রয়োজন। খোদেজা খাতুন রহমতুন্নেসাকে দেখিয়ে নাসিমকে বলেন, ‘তোমার শাশুড়িমাতা, দাঁড়িয়ে-বসে না থেকে, বউমাকে সঙ্গে করে যাও, সালাম করে এসো।’ নাসিম দেখে, খামোকা কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। যা বলতে যাচ্ছে, তার কোনোটাই থাকছে না। কিন্তু শাশুড়িমাতাকে অসম্মান করা যাবে না। ওরা রহমতুন্নেসাকে সালাম করে। তিনি সালাম নেন। তাহেরা খাতুন পাশে। তাকেও। নাসিম দেখে দরিয়া দাঁড়িয়ে। তাকে বলে, ‘ছিলে তো খালা। এখন আবার মামিশাশুড়ি হয়ে গেছো। তোমাকে কি দুবার সালাম করতে হবে?’ দরিয়া সরে গিয়ে বলে, ‘না,না, আমাকে সালামই করতে হবে না।’ মনসুর রহমান ও গোলাম সারোয়ারকে নিয়ে বসেছিলেন আজহার হোসেন ও নেহাল হোসেন। নাসিম ও ফেরদৌসী তাদের কাছে যায়। মনসুর রহমানকে সালাম করা গেল। গোলাম সারোয়ার সুযোগই দিলেন না। তিনি নাসিমকে বুকে টেনে নিলেন। শুধু বললেন, ‘তুমিও তো আমার ছেলেই হলে।’ নাসিম দেখে ফেরদৌসীর মুখটা প্রসন্নতায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সুজাবত আলীকে পাওয়া গেল না। কোনো একজন রোগী নাকি মরো মরো! ইনজেকশন দিতে বেরিয়ে গেছেন। তখনো ফেরেননি। তার মানে, রোগী এখনো বেঁচে আছে! আজহার হোসেন বললেন, ‘এখন আমাদের বাড়ির কাউকেই সালাম করতে হবে না। আমরা যখন বউমাকে তুলে আনব, তখন এসব হবে।’ নাসিম দেখল, বিয়ে যা হয় হলো, ধাক্কা আবার আরেকটি সামলাতে হবে।
আজকের আয়োজন শেষ করে দিতে হবে। ফজিলা বানু এতক্ষণ তাঁর ঘরেই ছিলেন। তাকে ডেকে আনা হলো। সুজাবত আলী নেই। কিন্তু ফেরদৌসীর বাবা ও মামা আছে। রহমতুন্নেসাদেরও নিয়ে কথা বললেন তাদের সঙ্গে। – ‘দেখো বাবারা’, তিনি বললেন, ‘শুভ কাজ নেহায়েত সাদাসিধেভাবে হলেও সুসম্পন্ন হয়েছে। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘরের বউকে ঘরে আনতে হবে। কালকেই ফেরদৌসীকে তোমরা নিয়ে যেতে পারবে। নাসিম এখন যাবে না। তাছাড়া ওর ছুটিও নেই।’ – তারপর একটু থেমে, কী ভেবে নিয়ে বললেন, ‘ছেলেমেয়ে এখানেই আছে। ধর্মীয়, আইনগত, সামাজিক ও পারিবারিকভাবে ওরা এখন স্বামী-স্ত্রী। কিন্তু আজকে রাত্রে ওরা একসঙ্গে থাকবে না। তোমরাই বিবেচনা করো। নাসিমের কথা ছেড়েই দাও। ও পুরুষমানুষ। কিন্তু তোমাদের মেয়ে, বয়সও কম, তোমরাও বুঝবে, কি মানসিক ও শারীরিক চাপ ওর ওপর দিয়ে গেছে। ওর শারীরিকভাবে যেমন সজীব হওয়া দরকার, মানসিকভাবে তেমনই শক্তি আহরণ করা প্রয়োজন। এজন্য ওকে কিছুটা সময়ও দেওয়া দরকার।’ এটুকু বলে ফেরদৌসীকে জড়িয়ে ধরে ফজিলা বললেন, ‘আমার বোনডি, আজকে তার মায়ের কাছেই থাকবে।’ তারপর রহমতুন্নেসাকে বলেন, ‘রাতে যাতে ওর ঘুমের ব্যাঘাত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখবে।’
সাঙ্গ হলো বিবাহযোগ। রোশেনারা নাসিমকে বলে, ‘দাদিমার আদেশ। ছিলি দ্বিপদ। হলি চতুষ্পদ। তোর তো দেখছি কালরাত্রিই শুরু হয়ে গেল। এখন নিজের দু-ঠ্যাং নিয়ে যেখানে পারিস গিয়ে শুয়ে থাকগে, যা।’ নাসিমও তাই চেয়েছিল।
দ্রুতই পালটে গেছে তার জীবনের দৃশ্যপট। একদিন কোনো আদিমকালে প্রাকৃতিকভাবেই মানব-মানবী জৈবিকতার তাগিদে মিলনের ভেতর দিয়ে শুরু করেছিল প্রজননক্রিয়া। তার ধারাবাহিকতা থেকেই রক্ষিত হয়েছে নিজেদের অস্তিত্ব। এক জোড়া নরনারী থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে সংখ্যায়। সেই সংখ্যা বাড়তে বাড়তে আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় তা ছিল শুধুই সংখ্যাবৃদ্ধির ব্যাপার। কিন্তু মানুষ তো কেবল মিলনের আনন্দই উপভোগ করেনি। সন্তান জন্ম দিয়েই সব শেষ করে দেয়নি। আকর্ষণ বোধ করেছে একে অন্যের প্রতি। দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা থেকে পুনর্মিলনের আনন্দে চোখ থেকে বেরিয়েছে অশ্রু। প্রকাশ ঘটেছে মানবিকতার। গড়ে উঠেছে যৌথ জীবন। তা থেকে পরিবার। গোষ্ঠী-সমাজ – এই সব। সেই লম্বা ইতিহাসের একটা বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে সে-ও। এক নারীর সঙ্গে সে-ও অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে বিরাজমান জীবনবোধের চিরচলিষ্ণুতাকে মেনে। সেই নারীর সঙ্গে তাকে শয্যা গ্রহণ করতে হবে। রাত্রি যাপন করতে হবে। একদিন নয়। দুদিন নয়। দিনের পর দিন। সংসারের মায়ায় জড়িয়ে যাবে আষ্টেপৃষ্ঠে। নাসিম ভাবে, তার নিজের মনকেও একটু গুছিয়ে নেওয়া দরকার। একটা রাতের অবকাশে সেটা হবে না। কিন্তু প্রস্তুত তো করা যাবে নিজেকে। সে এসে দাঁড়ায় বাড়ির আঙিনা ছাড়িয়ে ফসলের রিক্ত মাঠের বুকে। খোলা আকাশের নিচে। দূরে নিদ্রামগ্ন গাছপালাঘেরা গ্রাম। পায়ের নিচে শীতক্লান্ত শুকনো মৃত্তিকা। কিন্তু ওপরে খোলা আকাশ। সে তাকিয়ে থাকে নির্নিমেষ। কুয়াশার ভেতর দিয়ে ভেসে আসে অস্পষ্ট চাঁদের আলো। মিটমিট করছে নক্ষত্ররাজি। মহাজাগতিক বিশালতার বোধ তাকে গ্রাস করে। সে যেন হাঁটতে থাকে নীহারিকা পথ বেয়ে অনন্তের পথে। ভাবে, ফেরদৌসীর ক্ষুদ্র মনুষ্যদেহ চৈতন্যের সীমাশূন্যতা দিয়ে যে হৃদয়-মনের পরিচর্যা করে চলেছে, তা-ও ওই মহাজাগতিক বিশালতার মতো। কোনো দিন কি সে ওই হৃদয়-মনের সন্ধান পাবে?
চার
নাসিমের ঘুম ভাঙতে বেলা প্রায় দশটা। রোদের উষ্ণতা বড়ই তৃপ্তিদায়ক। কিন্তু পোহানোর অবকাশ নেই। প্রাতঃকৃত্য করতে হবে। সে জানে, তার ঘরেই মা ও অন্যান্য মহিলাসহ ফেরদৌসীর রাতযাপনের ব্যবস্থা হয়েছিল। মূলত রোশেনারারই কীর্তি এটা। সে বলেছিল, ‘বাসর না হয় না-ই হলো। ঘরটা তো চিনে রাখুক।’ নাসিম ভেবেছিল ফেরদৌসীরা চলে গেছে। তার হাজির থাকাটা কেউ হয়তো প্রয়োজনীয় বলে বোধ করেনি। আর তার দরকারও তো নেই। সে এসে ঘরে ঢোকে। দাড়ি-ফাড়ি না হয় না-ই কাটল। টুথব্রাশ-পেস্টের তো অপরিহার্যতা এখন সকালবেলার অভ্যস্ততার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি হয়ে গেছে। ঘরের মধ্যে দেখে অল্পবয়সী দুটো কাজের মেয়ে সম্মার্জনী হাতে গৃহকর্মে লিপ্ত। সেখানে ফেরদৌসীও দাঁড়িয়ে। মনটা বিনা কারণেই খুশিতে ভরে ওঠে। এই প্রজন্মের কাজের মেয়েদের নামও এখন জয়নব-নছিমন-তারামন নেই। নাসিমকে দেখে, বত্রিশ দাঁতের সব তো আর বের হয় না, যে-কটা প্রদর্শিত করা সম্ভব, তা দেখিয়ে অর্থাৎ হাসিতে মুখ ভরিয়ে, যার নাম, পপি, সে বলে, ‘ভাইজান, ভাবি না, খুব সুন্দর?’ তা শুনে নাসিম বলে, ‘কালকেই কেবল এসেছে। সবকিছু বুঝে নিতে পারেনি। দেখবি, তোদের পিঠের চামড়া থাকবে না?’ কথাগুলো হালকাভাবে বলা। কিন্তু ফেরদৌসী তার কৌতুক-চাতুর্য ধরতে পারে না। ভাবে, এদের কাছে আমাকে এখনই মেজাজী প্রতীয়মান করার চেষ্টা। কতটুকুই বা আমাকে দেখেছে? তার মুখটা গম্ভীর হয়ে ওঠে। তা দেখে নাসিম হেসে বলে, ‘অমন থমকে আছো কেন? শোনো, পরীক্ষায় যেমন রচনা লিখতে দেয়, কলেজে তোমার প্রথম দিন, এখানে তেমন করে কেউ লিখতে বলবে না, শ^শুরবাড়িতে তোমার প্রথম দিন। সুতরাং চিন্তার কী আছে?’ একথা শুনে আবার ফেরদৌসী হেসে ফেলে। তার মুখ থেকে স্বতোৎসারিতভাবেই বেরিয়ে যায়, ‘তুমি যে না -।’ শেষ করতে পারে না বাক্য। কী যেন হওয়ার কথা ছিল না, কিন্তু হয়ে গেছে। নিজের বলা ‘তুমি’ শব্দটা যে নিজেই শুনে ফেলেছে। জিভ কামড়ালেও তো বলা কথা আর ফিরে আসবে না। নাসিম একটু এগিয়ে কাছে যায়। সে-ও হাসতে হাসতেই বলে, ‘বলো। বলো। আমি যেন না – কী? বলো, আমি কী?’
এটা তো ঠিক সমাজ-পরিবারের ভাঙচুরটা শুরু হয়েছে অনেক আগে থেকেই। থানা পুলিশ-অফিস-আদালত-স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল ইত্যাদির প্রতিষ্ঠা কর্মসংস্থানের যে মহাযজ্ঞ শুরু করে দিয়েছে, তাতে প্রথাগত সমাজ ও পরিবারের মৃত্যুঘণ্টা বেজে গেছে। আর্দালি-পিয়ন, উকিল-মোক্তার, ডাক্তার, মাস্টার, জজ, ম্যাজিস্ট্রেট – পেশাজীবীদেরও যেন শেষ নেই। আগে কাজ ছিল লাঙল ঠেলার, এখন কাজ হয়েছে কলম-কালির। গ্রামকেন্দ্রিকতা থেকে মহড়া চলছে নগরায়ণের। মানুষের সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের ঘটছে নতুন সংস্করণ। সম্প্রদায় বিশেষে কারা, হয়তো, পালন করছে অগ্রবর্তী ভূমিকা। আবার কারা, হয়তো, করছে হাত মকশো। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, যা-ই হোক, সম্বোধনের ব্যাপারটিও সেই রকম। ফেরদৌসী নিজেই দেখছে, দাদি-নানিরা তাঁদের স্বামীকে ‘আপনি’ই বলেন। চাচি-খালা-ফুপিরাও তাই। ‘আপনি-তুমি’র ব্যবহার ক্ষেত্রবিশেষে, একেক জায়গায় একেক রকম। তার বড় বোনেরা অবশ্য তাদের স্বামীদের তুমি বলে। তাদের কাছেই শুনেছে, প্রায় হাত-পা ধরে অর্থাৎ অনেক সাধ্য সাধনা করে মাকে তুমি বলতে রাজি করিয়েছিলেন বাবা। মায়ের আপত্তির প্রধান কারণ ছিল, মুরুব্বিরা শুনলে কি বলবেন? তবে এই সম্বোধন নিয়ে তাদের পরিবারে একটা জগাখিচুড়ির মতো ব্যাপার হলো, তারা ভাইবোনেরা মাকে ‘তুমি’ বললেও বাবাকে বলে ‘আপনি’। কালকে ফেরদৌসী নাসিমের সঙ্গে কথা বলেছিল, সেখানে তার দিক থেকে সম্বোধনের কোনো ব্যাপার আসেনি। এলে হয়তো, ভাববাচ্যে চালাতে হতো। তারপর তো রাতে কোনো কথা হয়নি। দরকারও পড়েনি। এখনো হয়তো ভাববাচ্যই চলতো। নাসিম তাকে ‘তুমি’ বলতে বলে কি না, সেটাও দেখার জন্য কি অপেক্ষা করছিল? কিন্তু স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ কি হলো! নাসিম আবার বলে, ‘বলো, আমি যে না, – কি?’ কী বলবে ফেরদৌসী? চুপ করে থাকে। নাসিম বলে, ‘জানি, আমি কী, – এর উত্তর তোমার জানা নেই। তুমি দিতে পারবে না।’ তারপর একটু থেমে বলে, ‘আচ্ছা, আমিই কি বলতে পারবো, তুমি যে না, – অর্থাৎ তুমি কী? আমাকেই যদি জিজ্ঞেস করো, তো, আমি কি বলতে পারবো?’ ফেরদৌসী আগের মতোই নিশ্চুপ থাকে। নাসিম একবার দুবার-তিনবার-চারবার তার কথার পুনরুক্তি করতে থাকে। তাকে থামানোর জন্যই অবশেষে ফেরদৌসী মৃদু স্বরে বলে, ‘তুমিই বলো, তুমি কী?’ এবার নাসিম বলে, ‘একথার জবাব আমিও দিতে পারব না। আমিও বলতে পারব না, আমি কী?’ তারপর একটু থেমে বলে, ‘তুমি নিজেও জানো না, তুমি কী? আসলে, আমি কী – এ-কথার উত্তর খোঁজার জন্যই, তুমি যেমন, তেমনই আমিও, দুজনেই এক হয়েছি। জানি না, তার উত্তর আমরা পাবো কি না? কিন্তু এই খোঁজার ভেতর দিয়েই প্রবাহিত হবে আমাদের মিলিত জীবন।’ এ-সময় এসে ঢোকেন রহমতুন্নেসা। নাসিমকে দেখে নিজেও, বোধ করি, অপ্রস্তুত হয়ে যান। বলেন, ‘বাবা, তুমি? ঠিক আছে, তোমরা কথা বলো।’ নাসিম নিজেও অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে ততোধিক। বলে, ‘না, না, আমাকে হাত-মুখ ধুতে হবে।’ জামাতা নিদ্রাপ্রবণ। শাশুড়িমাতার কাছে শুরুতেই এই পরিচয় প্রীতিপ্রদ হবে, মনে হয় না। একটা অপরাধ করে ফেলেছে, এই ভাবে বলে, ‘আজকে না ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেছে।’ রহমতুন্নেসা বলেন, ‘যা ঝক্কি গেছে কালকে।’ বোঝা যায়, কৈফিয়তটা তিনি অনুমোদন করে নিয়েছেন। কিন্তু এগিয়ে এসে কালকে রাতে
যে-কাজটি করেননি, এখন তাই করলেন। ফেরদৌসীর একটা হাত নাসিমের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘বাবা, তোমার হাতে সঁপে দিলাম। ওর ভালোমন্দ তোমার।
ভুলত্রুটি হলে ক্ষমা করে দিও।’ এ-কথা শুনে নাসিম বলে, ‘তাহলে তো আমার মাকেও ডেকে আনতে হয়। আমাকেও তো ওর হাতে সঁপে দিতে হবে। আমার ভালোমন্দই বা দেখবে কে? আমার ভুল হলে কি হবে?
সে-কথাটাও তো আপনাদের মেয়েকে বলে দিতে হবে।’ ছেলেকে বউয়ের হাতে সঁপে দেওয়া? সংসারে তাই হয় নাকি? সেভাবে রহমতুন্নেসার ভাবারও কিছু নেই। কী বলবেন তিনি? চুপ করে থাকেন। একটা হিরণ্ময় নিস্তব্ধতা। সেটা ভেঙে ‘মা’ সম্বোধনটা স্পষ্ট করেই, নাসিম বলে, ‘আমি এখন আসছি।’ ‘মা’ – জামাতার প্রথম সম্বোধন। মা তো বলবেই। কিন্তু যেভাবে রহমতুন্নেসার কানে আসে, তাতে তার বুক থেকে যেন একটা ভারী বোঝা নেমে যায়।
এরপর নাসিমকে দেখা যায় খাবারঘরে। রোশেনারা বলে, ‘বিয়ের আনন্দে দেখছি ক্ষিদে-পিপাসা সব বরবাদ।’ নাসিম বলে, ‘তোর বিয়ে হয় নাই? সেই আনন্দে তুই বুঝি না খেয়ে থেকেছিস। কথা বলবি না। আমার খাওয়াতে ডিসটার্ব হবে।’ টেবিলে খাবার ঢাকা দেওয়া ছিল। রোশেনারা তা দেখিয়ে বলে, ‘বউ এসে খাওয়াবে, সে পারমিশন এখনো হয় নাই। তুই নিজেই বেড়ে নে।’ নাসিম কথা না বলে খাওয়াতে মনোযোগ দেয়। সে খেতে থাকে। কালকের হোন্ডা আরোহীরা বিভিন্ন কাজে এদিক সেদিক যাতায়াত করছিল। তাদের একটা কথা বলে দেওয়া হয়েছিল, পথে যেসব আত্মীয়স্বজনের বাড়ি পড়বে, তাদেরও যেন, বিয়ে হচ্ছে, তা জানানো হয়। যদি তারা আসতে পারে ভালো, না হলে মেয়েকে তুলে আনার সময় তো আসতেই হবে। যাদের খবর দেওয়া হয়েছিল, ভোর থেকেই, তাদের অনেকে আসতে শুরু করেছে। দলে দলে না হলেও, হালি হালি তো বটেই। গ্রামদেশে আত্মীয়তার নেটওয়ার্ক সুবিস্তৃত ও প্রবলভাবে কার্যকর। ফার্স্ট রিলেশন এখানে কোনো ফ্যাক্টর নয়। চাচাতো, খালাতো, মামাতো, ফুপাতো – যত আছে, এমনকি পাড়াতো, সবই একসময় এই নিশ্চিদ্র জালে বাঁধা থাকতো। এখন হয়তো ভাঙতে শুরু করেছে, কিন্তু এখনো তা চুরমার হয়ে যায়নি। ইলেকশনের সময় কাজও দেয় কার্যকরভাবে। যারা এসেছে, তাদের অনেকে আবার খাবারঘরে এসে ভিড় জমায়। দরিয়ারাও আসে। ফেরদৌসীকেও নিয়ে আসা হয়। কথাবার্তা সমানে চলছে। তবে কে কার সঙ্গে কথা বলছে, নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। এমন সময় এসে উপস্থিত হন রসিদা খাতুন। সঙ্গে কন্যাদ্বয় – দিলু আর রুবা।। নুরুজ্জামান সার্কেল অফিসার। সম্পর্কসূত্রে তিনি ঘনিষ্ঠ। আজহার হোসেনের সম্বন্ধি। অর্থাৎ রোশেনারার সাক্ষাৎ মামা। রসিদা খাতুন তার স্বামীত্বেই বিবাহের তিরিশ বছর পার করে দিয়েছেন। থানাতে সরকারের শীর্ষ প্রতিভূ। ক্ষমতার সেই দাপদের অর্ধেক না হলেও, তার অর্ধেক তো রসিদা খাতুনকেও দেখাতে হয়। নুরুজ্জামান চাকরিসূত্রে এ-থানা ও-থানা করে বেড়ান। অবসর না নেওয়া পর্যন্ত এরকম চলতেই থাকবে। প্রায় পরিত্যক্ত শ্বশুরবাড়িতে রসিদা খাতুনেরও আসা সম্ভবত শীত-পার্বণ উপলক্ষে। তিনি এসেই নাসিমকে বলেন, ‘দেখালে বটে! তোমার বিয়ের খবর এখন গয়নাকান্দি থেকে বনবাড়িয়া পর্যন্ত যত বাড়ি আছে, তার ঘরে ঘরে।’ নাসিম বলে, ‘মামি, আপনাকে তো আমরা আরো আগে আশা করছিলাম। ঘরে ঘরে গিয়ে খবর সংগ্রহ করে আসতেই, বুঝি, আপনার দেরি হয়ে গেল!’ একথা শুনে রসিদা খাতুন যেন তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন। রেগে বলেন, ‘তোমার সঙ্গে কথা বলতে আসাই আমার আহাম্মকি!’ বলে তিনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান। রোশেনারা নাসিমকে বলে, ‘তোর ওপরে মামির রাগ এখনো যায়নি।’ নাসিমের খাওয়া প্রায় শেষ। মুখটা খালিই। বলে, ‘কোনো কারণ ছাড়াই রাগ করলে আমি কী করতে পারি?’ রোশেনারা বলে, ‘বিনা কারণে, মানে? তুই না রণিভাই আর গোলাপি ভাবির প্রেম করিয়ে দিয়েছিলি?’ প্রসঙ্গটা অপ্রাসঙ্গিক। অনেকেই রয়েছে। তার মধ্যে আবার শ^শুরবাড়ির। কিন্তু কথাটা উঠেছে। প্রেম-ফ্রেমের বিষয়। ফেরদৌসীর কানেও গেছে। তার স্বচ্ছতাও আনা দরকার। তাই সে স্বাভাবিকভাবে বলে, ‘দেখ, এটা আমাদের তিনজনেরই ছাত্রজীবনের ঘটনা। আমি পড়েছি এক জায়গায়। তারা যেখানে পড়তো, তা থেকে অনেক দূরে। ট্রেনে চড়ে যেতে সকাল দশটায় উঠলে রাত বেজে যেত দশটা। যেখানে পড়তাম, সেখানে কোনো বিমানবন্দর নেই। থাকলেও আমার এত পয়সা নেই যে তাদের প্রেম বাঁধিয়ে দেওয়ার জন্য সকালে যাব, আর বিকেলেই ফিরে আসব। আমি আর রাজধানীতে সারা জীবনে কবার গেছি? তারাও তো এক জায়গায় পড়তো না। একজন মেডিক্যাল কলেজে, আরেকজন বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে দুটো প্রতিষ্ঠানই ছিল কাছাকাছি। আত্মীয়তা ছিল। কাজেই চেনাজানাও ছিল। দেখা-সাক্ষাৎ হওয়াও খুব স্বাভাবিক।’ রোশেনারা এবার বলে, ‘সে না হয় বুঝলাম। তুই নাকি রেস্টুরেন্ট-হোটেলে নিয়ে গিয়ে খাওয়াতিস?’ এবার নাসিম হেসে ফেলে। বলে, ‘তবে শোন।’ ইয়াসমিন আরাও তখন সেখানে উপস্থিত। তাকে উদ্দেশ করে বলে, ‘ছোটচাচিমা, আপনার হয়তো খেয়াল আছে, বছর চারেক আগে হবে, একবার বাড়ি থেকে আম-জাম-কাঁঠাল – যত সব পচনশীল জিনিস নিয়ে আপনাদের ওখানে গিয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়েও গিয়েছিলাম। বন্ধু-বান্ধব আছে। এতোদূর এসেছি যখন, তাদের সঙ্গে দেখা করব না? আপনাকেও বলে গিয়েছিলাম, আসলে বন্ধু-বান্ধবদের পাল্লায় পড়লে, দুপুরে খাবার জন্য ফেরা সম্ভব নাও হতে পারে। তাছাড়া হলে আমরা একরকম ডাল খাই, ওখানে ওরা কী রকম খায়, সেটাও তো টেস্ট করা দরকার। এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম হলে। সে নাই। ক্লাস করতে এসেছে। তারই খোঁজে আর্টস বিল্ডিংয়ে এসে একতলা খুঁজেছি। দোতলা খুঁজেছি। তিনতলার সিঁড়ি ভাঙছি, দেখি গোলাপি।’ এ পর্যন্ত বলে একটু মুচকি হেসে শুরু করে, ‘ভাবিই বলি, এখন তো ভাবি হয়ে গেছে, – গোলাপি ভাবি।’ রোশেনারা বলে, ‘আগে কি বলতিস?’ নাসিম বলে, ‘তা দিয়ে তোর দরকার কী? কী বললে তুই খুশি হতিস? কিছুই বলতাম না। দেখাই তো হতো কালেভদ্রে। – তো শোন, দেখি, গোলাপি ভাবি নামছে। বলি, বাসায় যাচ্ছেন? দুপুরে খেতে? গোলাপি ভাবি বিরস মুখে বলে, খেতেই যাচ্ছি। বাসায় নয়। ক্যান্টিনে। আমি বললাম, কেন? গোলাপি ভাবি বলে – ক্লাস আছে তিনটায়। বাসায় আসা-যাওয়া করতে গেলে আর ক্লাস করা হবে না। তাই তো, বেচারীর ভারি কষ্ট। গোল্লায় যাক বন্ধু। আমি বলি, আমারও তো বাসায় আসা-যাওয়ার প্রবলেম। গোলাপি ভাবি তো আর জানে না, আমি তো ছোটচাচিমাকে বলেই এসেছি। – আমি বলি, তাহলে চলুন, ভালো কোথাও বসে মধ্যাহ্নভোজনটা দুজনেই সেরে ফেলি। দুজনে একসঙ্গে বসে খাবো, গোলাপি ভাবির তো আপত্তি করার কোনো কারণ নাই। বেরুলাম। হেঁটে তো অত দূরত্ব পার করা যাবে না। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি রিকশার অপেক্ষায়। হঠাৎ দেখি, রণি ভাই আসছে। আমাদের দেখে কাছে এসে বলে, কোথায় যাচ্ছো? যাচ্ছি খেতে। খাওয়া নিয়ে মিথ্যা কথা বলা যায়? শুনে রণি ভাই বলে, তাহলে চলো আমিও যাই। কী করে না করি। তাকেও তো হোস্টেলেই খেতে হয়। তারপর গুলিস্তানের এদিকে এসে তিনজন খাই।’ রোশেনারা বলে, ‘কী খেলি?’ নাসিম বলে, ‘সেটা জেনে তোর কি? তুই কি রেঁধে খাওয়াবি।’ রোশেনারা বলে, ‘বিল তো তুই-ই দিয়েছিস, সেটাই বল। তোর খরচাপাতির খবরটা মামিকে দিলে কিছু আনন্দ তো পাবে।’ নাসিম বলে, ‘খালি কথা বলে? শোন, খাইয়েছিলাম আরো একদিন। সেটা শুনে দুদিনের হিসাব একসঙ্গে নিস।’ – এই বলে নাসিম আবার শুরু করে, ‘তার প্রায় বছরখানেক পর আবার যেতে হলো। আমার এক সহপাঠী বন্ধু খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাকে জরুরি চিকিৎসার জন্য সেখানে ট্রান্সফার করা দরকার। তার বাবা-মা সেখানেই থাকেন। শুধু পৌঁছে দেওয়া নয়। একবারে মেডিক্যালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যেতে হলো। তার বাবা-মা যাতে উপস্থিত থাকেন, সে-ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। তাদের জিম্মায় তাকে হাওলা করে দেওয়ার পর কী হয়, তা দেখার জন্য দু-একদিন থাকতেও হলো। একদিন তাকে দেখে রাস্তায় বেরিয়েছি। বাসায় ফিরব। দুপুরে খাওয়ার সময়ও হয়ে আসছে। সেদিনও আমার কপাল খারাপ। দেখি, রণি ভাই। আমাকে দেখে বলে, তুই এসেছিস? ভালোই হলো, বুড়িগঙ্গায় নৌকার ওপরে যে হোটেলগুলি আছে, অনেকদিন তার রান্না খাইনি। আমারও লোভ হলো। কোনো দিন খাইনি। শুনেছি, সেখানকার হোটেল-ফোটেলের রান্নার ধরনটা একটু অন্য রকমের। খাওয়ার তৃপ্তিই নাকি আলাদা!’ এবার ইয়াসমিন আরা একটা ধমক লাগান। বলেন, ‘রান্নাবান্নার গুণাগুণ বর্ণনা তোর না করলেও চলবে। শেষ কর তো।’ নাসিম বলে, ‘ছোটচাচিমা, এটা তো ক্লাইমেক্সের আগের ঘটনা। সেটা শোনার জন্য তো আপনাকে অপেক্ষা করতেই হবে।’ রোশেনারা বলে, ‘ঠিক আছে, আমরা অপেক্ষা করছি, তুই বল। দেখি কেমন ক্লাইমেক্স।’ তখন ইয়াসমিন আরার দিকে তাকায় নাসিম। বলে, ‘ছোটচাচিমা, সেদিন সন্ধ্যায় বাসাতে ফেরার পর আপনি কি রকম গালাগালি করেছিলেন, মনে আছে?’ ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়ছে। গালাগালি করি নাই। বকাবকি করেছিলাম।’ একথা শুনে সবাই হাসতে শুরু করে। দরিয়া বলে, ‘গালাগালি আর বকাবকির মধ্যে তফাৎ কি ভাবি?’ ইয়াসমিন আরা যেন অবাক হয়ে যান, এরা দুটোর পার্থক্য বোঝে না! তিনি বলেন, ‘গালাগালি হলো, যাচ্ছে না তাই বলা। আর বকাবকি হলো শাসন করা। সন্ধ্যা হয়ে যায়। বাসায় ফিরছে না। শহরে কত কী হয়। একটা চিন্তা না?’ যা হোক, গালাগালি আর বকাবকির তফাতাদি পরিষ্কার না হলেও বোঝা গেল। রোশেনারা বলে, ‘শুরু কর।’ নাসিম বলে, ‘আমি বললাম, ঠিক আছে, চলেন। একথা শুনে রণি ভাই এদিক-ওদিক থাকাতে থাকে। বলে, গোলাপিকে ডাকলে হয় না। সেদিনও ছিল। আমি বলি, আজকে তো নাই। রণি ভাই বলে, ডেকে নিয়ে আয়, না? এখন তো ক্লাসের সময়। একটু খোঁজাখুঁজি করলেই পাওয়া যাবে। আমার মেজাজটা তিরিক্ষি হয়ে গেল। বললাম, পারলে আপনি ডেকে আনুন। পাশের এক চায়ের দোকান দেখিয়ে বলি, আমি ওখানে বসে চা খাচ্ছি। গোলাপি ভাবিকে পাওয়া গেল। আমি এসেছি শুনে আর দ্বিরুক্তি করেনি। ক্লাস ফাঁকি দিয়েই চলে এসেছে।’ রোশেনারা বলে, ‘এরপর তো ক্লাইমেক্স। বলতে থাক।’ নাসিম বলে, ‘ঘটনা ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল ওদের বিয়ের মাস ছয়েক আগে। এবার আর ঢাকা শহর নয়। নুরুজ্জামান মামার সার্কেল অফিসারের বাসাতে।’ এটুকু বলে রোশেনারার দিকে তাকায়, ‘দাদিমাকে তো চিনিস?’ রোশেনারা বলে, ‘আমার চেয়ে তোরই তো ভালো চেনার কথা।’ নাসিম বলে, ‘বুঝলাম না।’ রোশেনারা বলে, ‘দাদিমার হুকুম শুনে বিয়ে করলি, আর এখন বলছিস, বুঝলাম না।’ এ-কথা শুনে ফেরদৌসী লজ্জায় জড়সড় হয়ে পড়ে। নাসিম ইয়াসমিন আরাকে বলে, ‘ছোটচাচিমা, ও কিন্তু খুব বাড়াবাড়ি করছে।’ ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘সময় হোক, শাসন করে দেবো। তুই বলতে থাক।’ নাসিম বলে, ‘শীতের সময়। বাড়িতে এসেছি।’ রোশেনারা বলে, ‘ঠিক এবারের মতো। দুর্ভাগ্য, বিয়েটা তখনই হয়ে যেত, কেবল ফেরদৌসী আসেনি বলে।’ আবার হাসি। ফেরদৌসীর অবস্থা অকহিতব্য। নাসিম বলে, ‘ছোটচাচিমা, শাস্তি কিন্তু ওর প্রাপ্য হয়ে গেছে।’ ইয়াসমিন আরা ফেরদৌসীকে কাছে টেনে বলেন, ‘বউমা, ননদেরা ওরকম করেই থাকে।’ নাসিমকে বলেন, ‘তাড়াতাড়ি শেষ কর। কাজ আছে।’ নাসিম বলতে থাকে, ‘দাদিমাকে চেনার কথা বললাম কেন? তিনি তো সব সময়ই বলেন, বিষয়-সম্পত্তি সব বারো ভূতে খেয়ে শেষ করে দিলো। চলন বিলের জলমহালে মাছ ধরা হবে। কাছে না থাকলে অর্ধেক মাছও পাওয়া যাবে না। কী করব? ভোর পাঁচটারও আগে উঠে কনকনে ঠান্ডা বাতাস ঠেলে গেলাম সাইকেলে চেপে। মাছটাছ ধরা হচ্ছে। ওই মাছেই দুপুরে মহাভোজ। যারা মাছ ধরছে, তারা খাবে। আর আমি তো মালিকপক্ষ। বেলা বেড়ে গেছে। নুরুজ্জামান মামা যে ওখানকার সার্কেলে আছেন, তা নিয়ে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। এমন সময় মামার খাস বেয়াড়া নীলমণি বাবু এলো! আমি বলি, তুমি কি করে এখানে? সে বলে, বেগম সাহেবা আপনারে ডাকচেন? আমি ভাবলাম, যেভাবেই হোক খবর পেয়েছেন। এতো কাছে, ডেকে পাঠানোটা স্বাভাবিক। তবু বলি, লোকজন নিয়ে কারবার, কুলিয়ে উঠতে পারব কি না, বুঝতে পারছি না। এখানে যখন আছেন, মাছ ধরার পর ওগুলো তো কিছু পাঠাবোই। সময় থাকলে আমিও যাবো। সে বলে, না এখনই যেতে হবে। বেগম সাহেবা বলেছেন, জরুরি ব্যাপার। এখন ব্যাপার যখন জরুরি, যেতেই হলো। সাইকেলে ঘণ্টাখানেক। শীতের রোদ। খারাপ লাগেনি। মামা এমনিতেই গম্ভীর মানুষ। পদমর্যাদা তাতে আরো গাম্ভীর্য এনে দিয়েছে। তবে আমার সঙ্গে দেখা হলে, কী, কেমন আছো ইত্যাদি বলেন। যখন পৌঁছলাম, তিনি বাইরে বসেছিলেন। আমাকে দেখলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। কিছু বলবেন কি না, এ সময়টুকুও আমি পেলাম না। মামি সমানে প্রায় ছুটে বাইরে এসে ভেতরে টানতে টানতে নিয়ে গেলেন। হাজির করলেন একবারে রান্নাঘরে। আমি তো কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তাকিয়ে দেখি রান্নাঘর তো রান্নাঘর নয়, অবিস্মরণীয় সব শিল্পীর অ্যাবস্ট্র্যাক্ট অংকনবিদ্যার অনুপম প্রদর্শনশালা। মাটির সরা-ঢোকসা – যা আছে সব ভেঙেচুরে ছত্রখান। চীনামাটির থালা-বাসনের একই দশা। অ্যানামেলের পাতিল-ডিশ-সসপেনের কোনোটার ঘ্যাগ বেরিয়ে গেছে। কোনোটার পেট ঢুকে গেছে। পিকাসোর ছবিতে যেমন কোনো মানুষের নাক লম্বা, পা খাটো, হাত গদার মতো। আমি তো হতবাক – বাকরুদ্ধ – এই রকম শব্দ আরো যা যা আছে, তাই। কোনোমতে আমি বলি, মামি, কি করে হলো এসব? আমার ধারণা, হয়তো এলাকার কোনো ব্যাপার। গ্রাম-গঞ্জেও আজকাল রাজনীতির মাঠ প্রচুর গরম। নেতারা এসে বক্তৃতা দিয়ে যান, জ্বালিয়ে দাও। পুড়িয়ে দাও। মামা এখানে সরকারের সাক্ষাৎ প্রতিনিধি। হতে পারে তারই ফলাফল। কিন্তু মামি চেঁচিয়ে উঠলেন, তোমার জন্য। এখানকার অনেকের সঙ্গেই আমার চেনাজানা আছে। সম্পর্কও ভালো। মামি কী ভেবেছেন, আমিই এসব করিয়েছি? মামি থামলেন না। সমানে চেঁচিয়েই চললেন, তোমার ভাই রণি এসব করেছে। তার ছেলে, সেটা আগে হলো না, হয়ে গেল আমার ভাই। ভাই তো বটে, কিন্তু ছেলে তো তার। মামি বলতে থাকলেন, তুমিই তো তার মাথা খারাপ করে দিয়েছো। – কুলাঙ্গার। বাপ-মায়ের মুখ পুড়িয়েছে। এই রকম বাক্যবাণ চললো কিছুক্ষণ। আমি দাঁড়িয়ে আছি, প্রায় সম্বিতহারা। তবে একটা সুবিধা হলো, অগ্ন্যুৎপাতেরও একসময় তেজ কমে আসে। ভিসুভিয়াসের লাভারও উদ্গিরণ থেমে যায়। মামি উত্তেজনাবশতই একসময় কথা হারিয়ে ফেললেন। তখন আমি বললাম, মামি, আমাকে একটু খুলে বলবেন? তার কথা থেকে যা জানা গেল, তার সারসংক্ষেপ হলো, রণিভাইয়ের সামনে মেডিক্যাল ফাইনাল। ইতোমধ্যেই তার দুবার ফেল করা হয়ে গেছে। মেডিক্যাল কলেজে অবশ্য ফেল করা অগৌরবের কিছু নয়। যে যত ফেল করবে, তার বিদ্যা তত বাড়বে আর হাতে রোগী মরবে কম! আর তাড়তাড়ি পাশ করলে তো শুধু পাশই হলো। হাত মকশো হলো না। সে রোগী মারবে বেশি। যা হোক, রণিভাইয়ের দাবি, পরীক্ষার আগেই তাকে গোলাপি-কন্যার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করাতে হবে। তার শো অফ হলো রান্নাঘরের এই বীরকর্ম। আমি বলি, অসুবিধা কি? মামির মেজাজ অপরিবর্তনশীল। তিনি বলেন, অসুবিধা নেই, মানে? তুমি তো বলবেই। বিয়ে দেওয়া যায় ও-মেয়ের সঙ্গে? কলেজে পড়ে। কলেজে না, কলেজে না, বড় কলেজে। বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে সিনেমা দেখে। মিছিল করে। বিয়ে দেওয়া যায় ওই মেয়ের সঙ্গে? তুমি গোলাপিকে বলো, রণিকে পরীক্ষাটা দিতে বলুক। তারপর বিয়ের ব্যবস্থা করা যাবে। তার কথা শুনে আমি কিছুটা উৎফুল্ল হয়ে উঠি। বলি, সেটা আগে বললে তো এসব হতো না। তাহলে আপনাদের মতামত পজিটিভ। একথা শুনে মামি আমতা আমতা করতে থকেন। – না, মানে পরীক্ষাটা তো হয়ে যাক। ভাবখানা এই রকম পরীক্ষাটা দিলে, তারপর আর ধরে কে? আমি তো আবারো হতবাক-রুদ্ধবাক – এই সব।’ এবার নাসিম, বিশেষ করে রোশেনারাকেই বলে, ‘আচ্ছা, তুই-ই বল, একটা মেয়েকে আমি বলবো। সে তো ধরেই নেবে বিয়ে হবে। সেটাই স্বাভাবিক। তারপর হবে না। তারা দেবে না। আমি ওই মেয়েটার সামনে আর কখনো দাঁড়াতে পারবো? সারা জীবন একটা গিল্টি ফিলিং আমাকে তাড়িয়ে বেড়াবে না? তা কখনো হয়? আমি বললাম, মামি, রণিভাই, এত ভাঙচুর করে যে বীরত্ব দেখিয়েছে, তাতে সে পালিয়ে যাবে না। আশেপাশেই কোথাও আছে। আমি খুঁজে বের করে নিচ্ছি। আমি কথা বলছি। সব সমস্যারই সমাধান আছে। মামি বলেন, সমাধান তো গোলাপির সঙ্গে বিয়ে দেওয়া। তাই দাও গে, যাও। আমি আর কী করি? যেদিক দিয়ে বেরুলে মামার সামনে পড়তে হবে, সেদিক দিয়ে না গিয়ে পেছন দিক দিয়ে একটা চাপা রাস্তা ছিল, সেদিক দিয়ে বেরিয়ে পড়ি। আমার অনুমানই সঠিক। রণিভাই ঠিক এসে আমার পথ রোধ করে দাঁড়ায়। বলে, আজকে বিকেলের ট্রেনেই আমার সঙ্গে যাবি। তুই দাঁড়িয়ে থেকে গোলাপির সঙ্গে আমার বিয়ে দিবি। নাও ঠ্যালা। ছোটভাই আমি। দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দেবো বড়ভাইয়ের।’ রোশেনারা চুকলি কাটে, ‘নিজের বিয়েরই কোনো খবর নাই!’ নাসিম বলে, ‘তুই থামবি? শোন, তখন আমি রণিভাইকে বললাম, চলেন আমার সঙ্গে। শলাপরামর্শ করা লাগবে না? পেট ঠান্ডা হলে দেখবেন অনেক বুদ্ধি এমনিই বেরিয়ে আসবে। জলমহালের ওখানে মাছ-টাছ ধরা হচ্ছে। রান্নাবাটিও হচ্ছে। নানা রকমের মাছ। চিতল মাছের পেটি, রুই মাছের নাভি, কই-মাগুরের ঝোল। আরো কত কী?’ রোশেনারা বলে, ‘শুনেই তো আমার জিভ ভিজে যাচ্ছে। একবার আমাকে নিয়ে যাবি।’ ফেরদৌসীকে দেখিয়ে বলে, ‘আমাদের ভাবি তো অবশ্যই থাকবে।’ নাসিম বলে, ‘যেতে হলে ভাবিকেই ধর। কথা হচ্ছে রণিভাইয়ের। আমি দেখলাম, প্রেমে পড়লে মানুষের কোনো হুঁশ থাকে না। কিন্তু আমার তো স্থানকাল পাত্র জ্ঞান ঠিক রাখতে হবে। রণিভাইকে নিয়ে যাচ্ছি খাবারের কথা বলে। কিন্তু এখানে রান্নাঘরের যে দুর্দশা।
হাঁড়ি-পাতিল-বাসন-কোসন কিছুরই কোনো অস্তিত্ব নাই। তাই আবার সেই একই পথে ফিরে এলাম। মামি তখনো ওখানে দাঁড়িয়ে। বোধ করি কোনো কাজ হলো না বলে আমাকে শাপশাপান্ত করছেন। আমি বললাম, মামি, ওখানে তো রান্না হচ্ছে। ধরন-ধারণ কেমন হবে জানি না। কারণ যারা রান্না করছে, তারা তো অ্যামেচার। আমি যতটা পারি, ভাত-মাছ পাঠিয়ে দেবো। আমার দোষত্রুটি, যা-ই হোক, আপনি দয়া করে আপত্তি করবেন না। বাস্তব কারণেই মামি আপত্তি করেননি।’ রোশেনারা বলে, ‘তা কি শলাপরামর্শ হলো?’ নাসিম বলে, ‘কিছুই না। উন্মাদ কি কারো কথা শোনে? আমি দেখলাম, বিষে বিষক্ষয় হওয়াই ভালো। বুনো ওল হলে বাঘা তেঁতুল দিতে হয়। মাথা তো এমনিতেই, যাকে বলে, হট বয়লার। তাকে উল্টো দিক থেকে আরো উস্কে দিলে কেমন হয়? অনলে ঘৃতাহুতি আর কী? আমি বলি, রণিভাই, বাবা-মায়ের এই অত্যাচার মেনে নেওয়া যায় না। বিয়ে আপনার হবেই। আপনি পরীক্ষাটা দেন। এমন করে পড়েন, যেন ফেল করতে না হয়। তারপর তো ফুল ফ্লেজেড ডাক্তার হয়ে যাবেন। তখন আর পায় কে? গুলি মারেন বাবা-মাকে। চেম্বার খুলে বসবেন। রোগী আসবে। টাকা আসবে। নিজের বিয়ে নিজে করবেন। আপনার যদি মনে থাকে, তখন আমি দাঁড়িয়ে থাকবো।’ দরিয়া বলে, ‘নাসিম, ইবলিশ তো দেখেছি, তুমিও নিজেও কম না?’ নাসিম বলে, ‘খালা, ভাগ্যিস, তোমরা এটা বোঝার আগেই আমার বিয়েটা হয়ে গেছে! ছোটচাচিমা, বিচার কিন্তু আপনাকে করতেই হবে। এই অপমান!’ রোশেনারা বলে, ‘সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর সামনে।’ নাসিম উত্তপ্ত হয়ে বলে, ‘থাম তো তুই। যখন যা পারিস বলে যাচ্ছিস। ঠিক আছে, করতে হবে না বিচার। শোন, ইবলিশই হই, আর ফেরেশতাই হই, বিয়ে দেবে না কেন? গোলাপি ভাবি ডিসেন্ট মেয়ে। আরটিকুলেট। লেখাপাড়া জানা। প্রেজেনটেবল। দশটা লোকের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারে। সাহসও আছে যথেষ্ট।’ ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘সাহস? কী রকম?’ নাসিম বলে, ‘ছোটচাচিমা, আপনার খেয়াল আছে, একবার ফুটবল টিমের সঙ্গে গিয়েছিলাম। গ্যালারি ভরা ছাত্রছাত্রী-দর্শক। তাদের সঙ্গে গোলাপি ভাবিও আছে। সবাই তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাপোর্টার। আমাদেরও আছে। যারা আমাদের অঞ্চলের। কিন্তু মনে মনে। খেলা হচ্ছে ধুন্ধুমার। হাফ টাইমের আগেই আমাদের দু-গোল খাওয়া হয়ে গেছে। আমি তো গেছি বদলি খেলোয়াড় হিসেবে। আসলে ফুটবল খেলতে আমার ভালো লাগে না। হাফ প্যান্ট পরে খেলা। ঠ্যাং দেখানো অর্ধেক। এমন সময় আমাদের সেন্টার হাফকে ইচ্ছাকৃতভাবে হিল চার্জ করে ইনজুরিতে ফেলে দিলো। আমাদের যিনি ফিজিক্যাল ডিরেক্টর, তিনি বললেন, আর তো উপায় নাই। তোমাকে নামতে হবে। নামলাম। ভাগ্য আমারই বলতে হবে। না, না, একজনের ভাগ্য যে আমি আগে থেকেই ধার পেয়ে আসছি।’ কেউ খেয়াল করে না – একথা শুনে ফেরদৌসীর মুখটা লজ্জারাঙা হয়ে ওঠে। রোশেনারা বলে, ‘ধার পেয়ে আসছিলি মানে?’ নাসিম বলে, ‘সে আরেক কাহিনি। যে ধার দেয়, তার কাছে অনুমতি না নিয়ে বলা যাবে না।’ ইয়াসমিন আরা দেখেন ছেলেমেয়েদের দুষ্টুমি চলতে দেওয়া যায় না।। তাই তিনি কষে ধমক লাগান। বলেন, ‘নাসিম ছাড়া আর যে কথা বলবে, তাকে বের করে দেবো।’ নাসিম বলে, ‘এরকম ডিক্টেটর না হলে চলে!’ ইয়াসমিন আরা তাকেও ধমক লাগান। বলেন, ‘তোকে কমেন্ট কে করতে বলেছে? যা বলছিলি, তাই বল।’ নাসিম আবার শুরু করে। বলতে থাকে, ‘এমন সময় আমরা একটা কর্নার পেয়ে গেলাম। আমি তো স্টপার ব্যাক। ফ্রি কিকে আমার খুব সুনাম।’ ইতোমধ্যে রোশেনারা ফেরদৌসীকে কাছে এনে বসিয়ে রেখেছে। তার গাল টিপে বলে, ‘ভবিষ্যতে যেন ফ্রি কিকটিক না মারে, সেদিকে খেয়াল রেখো।’ সবাই হেসে ওঠে। ফেরদৌসী আর কী করে হাসে? ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘রোশেনারা, এবার কিন্তু তোকে বেরিয়ে যেতে হবে।’ রোশেনারা হাত জোড় করে ক্ষমা চায়। বলে, ‘ছোটচাচিমা, আর হবে না। খৎ দিচ্ছি নাকে।’ ইয়াসমিন আরাই যেন কেবল শ্রোতা। নাসিম বলে, ‘ছোটচাচিমা, কী বলব? আমি তো হতভম্ব। সারা মাঠ হতভম্ব। লেফট উইং থেকে কিক নিলাম। গোল হয়ে গেল। বাঁ-পায়ের কিক তো। গোলকিপার সুইং বুঝতে পারেনি। স্তব্ধ মাঠ। দাঁড়িয়ে একাই হাততালি দেওয়া শুরু করে গোলাপি ভাবি। তারপর আরো হাততালি। আরো হাততালি। হাততালি। যারা এতক্ষণ সাপোর্টার ছিল মনে মনে। মনের জোর পেয়েছে তারা। কিন্তু তারা তো সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। তাই নিয়ে ঝগড়া। একদল বলে, তুমি কি এই বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রী নও। তুমি বিশ^বিদ্যালয়কে সমর্থন করো না? গোলাপি ভাবির এক কথা, তা করি। কিন্তু আমার ভাই খেলতে এসেছে, তাকে আমি সাপোর্ট করবো না? মজার কথা হলো, পরে আমরা আরো দুটো গোল করি। তার একটা ছিল আমারও। জিতে যাই এক গোলে।’
ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘তুই কি সত্যি সত্যি এসব করেছিস, না আমাদের গল্প শোনাচ্ছিস?’ নাসিম বলে, ‘ছোটচাচিমা, শুনতে চাইলেন, গোলাপিী ভাবির সাহসের কথা। এখন বলছেন বানিয়ে বানিয়ে বলছি। তবে আমি গোলাপি ভাবিকে একটা চিঠি লিখেছিলাম। তখনো ভাবি হয়নি, কিন্তু ভাবি সম্বোধন করে। চিঠিটা দীর্ঘই ছিল। হয়তো সে-চিঠির কারণেই গোলাপি ভাবি একটা ভূমিকা নিয়েছিল। রণিভাই পরীক্ষা দেয়। পাশও করে। পরে তো শুনেছি, বিয়ে হয়, বড়মা আর মায়ের হস্তক্ষেপের কারণে। আমি তো বিয়েতেও যাইনি। গিয়ে মামির সামনে আবার পড়ব নাকি?’ রোশেনারা বলে, ‘অত বড় লম্বা চিঠি লিখলি, গোলাপি তোকে ওই রকম লম্বা চিঠি লিখে বিয়েতে থাকতে বলেনি?’ নাসিম বলে, ‘কেন বলবে না? যাওয়া হয়নি। কিন্তু বিষয় তো সেটা না। মামি যে আমাকে কেন দোষী করে রেখেছেন, তা আমার বুদ্ধির অগম্য। তুই-ই বল, একজন অ্যাডাল্ট বয়, আরেকজন অ্যাডাল্ট গার্ল, মানে ছেলেও সাবালক, মেয়েও সাবালিকা, আমার তাদের প্রেম শেখাতে হবে? আর সত্যি কথা বলতে কী, তাদের ভেতর যে সম্পর্ক আছে, আমি তা রান্নাঘরের ওই চিত্রকর্ম দেখার আগে ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি। যে দুদিন একসঙ্গে খেয়েছিলাম, সেই দুদিনই গোলাপি ভাবি রিকশাতে আমার সঙ্গেই ছিল। প্রথমদিন আমিই তাকে আর্টস বিল্ডিংয়ে পৌঁছে দিই। দ্বিতীয়বার তাদের বাসায়। সেখানে চাচির সঙ্গে দেখা হলো। চাচাও ছিলেন। সুতরাং ফিরতে দেরি হয় গেল। আসলে আমার জন্য গালাগালি অপেক্ষা করছিল যে।’ বলে তাকায় ইয়াসমিন আরার দিকে। ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘আবার গালাগালি?’ নাসিম বলে, ‘না, না, ছোটচাচিমা, বকাবকি।’ এক দফা হাসি। নাসিম নিজের থেকেই বলে, ‘ছিল না হয় মামির নিজের ভাইয়ের মেয়ে। রণিভাই তো আমাকে তাই বলেছিল। বলেছিল, মামি নাকি বলেছেন, গোলাপি ধাঙর। এতো খারাপ কথা বলতে পারেন? আর জলি কচি মেয়ে? কচি না ছাই! শোনেন ছোটচাচিমা, সে মেয়েরই বা দোষ কি? রণিভাই পাশ করছে না। তাকেও বছর বছর একই পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। স্কুলের গণ্ডি আর পেরোয় না। বার তিনেক দেওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু আমার কথা হলো, গোলাপি ভাবিও তো মামির চাচাতো ভাইয়েরই মেয়ে। আমি তো টেনেটুনে কাজিন। এখন বলেন, আমার দোষ কোথায়?’ – এই প্রশ্ন উত্থাপন করে উপস্থিত বিচারকদের কাছে যেন আর্জি করছে – এমন একটা ভাব দেখায় নাসিম। তারপর রোশেনারাকে বলে, ‘তবে, কী বলব তোকে, বলি?’ রোশেনারা বলে, ‘বল।’ নাসিম বলে, ‘ছোটলোয় যা বলেছি, রসুন – রোশেনারার অপভ্রংশ।’ একটা নির্র্মল হাসির ফোয়ারা ধ্বনিত হয় সবার কণ্ঠে। হাসি দেখা দেয় ফেরদৌসীর মুখেও। – ‘শোন রসুন’, নাসিম বলে, ‘মামির রাগ কমানোর একটা ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি। যাওয়ার সময় গোলাপি ভাবিকে বলে দিয়েছি, টাকাপয়সা জমিয়ে একবার মামিকে লন্ডন নিয়ে যেতে। ইংলিশ চ্যানেলের ঠান্ডা পানিতে মামির রাগ-ফাগ দলাবেঁধে জমাটবদ্ধ হয়ে যাবে।’ এবার নাসিমের মনে হয়, তার খাওয়া তো হয়ে গেছে অনেক আগেই। কিন্তু চা আসছে না? সে বলে, ‘কই, চা কই? চা-ফা খাবো না? কেউ চা দিচ্ছে না কেন?’ নতুন বউ। স্বামীর খেদমতও করা দরকার। একটু পরেই চলে যেতে হবে। একদমই সেবা করা হলো না। এই বিবেচনা থেকে তাহেরা খাতুন ফেরদৌসীকে বলেন, ‘বোন, তুমি যাও তো, চা-টা নিয়ে এসো।’ এ-কথা শুনে প্রায় আঁতকে ওঠে নাসিম। বলে, ‘না, না, ওকে আনতে হবে না। রাস্তাঘাট চেনে না। শেষকালে চৌকাঠে পা ঠেকিয়ে চায়ের কাপও ভাঙবে। নিজের ঠ্যাং-ও ভাঙবে। আমাকেও ডাক্তারবদ্যি করে বেড়াতে হবে। আমার একদম ছুটি নেই। কালকেই চলে যেতে হবে।’
ফেরদৌসীদের যাওয়া হচ্ছে না। ফজিলা বানুর সামনে সমস্যা দুটো। এক, নঈম হোসেন এসে পৌঁছাচ্ছে না। বিয়ের ব্যাপার। বউ-ছেলেমেয়ে নিয়েই আসবে। সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ নেই। তিনি বলে দিয়েছিলেন, দরকার হলে একটা জিপ জাতীয় গাড়ি ভাড়া করে যেন আসে। আসবে তো সে বটেই। কিন্তু দেরি হয়ে যাচ্ছে। ফজিলা বানু ভেবেছিলেন, ফেরদৌসী ফিরে যাচ্ছে নতুন বউ হয়ে। একটা বিয়ের শাড়িও পরা থাকবে না?
পাড়া-প্রতিবেশীরা দেখতে আসবেই। ভাবাটা খুবই স্বাভাবিক যে, যতই তাৎক্ষণিক হোক, শ্বশুরবাড়ির লোকেরা একটি বিয়ের শাড়িও দিতে পারেনি। তাই তিনি চেয়েছিলেন বিয়ের শাড়ি পরিয়ে স্যুটকেস সাজিয়ে ফেরত পাঠাবেন। তারও চেয়ে বড় সমস্যা আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে। অনেকেই এসে গেছে, কিন্তু আরো যে আসবে না, সে-বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার কোনো উপায় নেই। সবাই তো সমান দূরত্বের নয়। ঘড়ির কাঁটা ধরে সবাই যে একই সময়ে রওনা দিচ্ছে, তাও নয়। তাদের সংখ্যাও বেশ বেড়ে যাচ্ছে। দুপুরের খাবার নিয়েও প্রশ্ন আছে। সংখ্যাধিক্যের কারণে বাড়ির মেয়েদের এই দায়িত্ব পালন করা মুশকিল। ইতোমধ্যে ডেকে আনা হয়েছে বাবুর্চি ও তার সাঙ্গোপাঙ্গদের। তারও চেয়ে বড় কথা, যারা এসে গেছে, তারা তো এসেছেই। যারা এখনো আসেনি, তারা যদি এসে দেখে, পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে নতুন বউকে। দাওয়াত করে নিয়ে এসে অপমান! আত্মীয়তার সম্পর্কই পড়ে যাবে হুমকির মুখে। বাধ্য হয়ে ফজিলা বানু রহমতুন্নেসাদের সামনে সমস্যাটা তুলে ধরে বলেন, ‘এটা তোমাদেরও পারিবারিক সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে জড়িত। আমার তো আত্মীয়তার সওয়াল। তাই অনুরোধ করছি, তোমরা আজকের দিনটা থেকে যাও। জানি, সবারই কাজকর্ম আছে। ফেরদৌসীর বাবা তো চাকরিজীবী। তার ছুটিছাটার ব্যাপার রয়েছে। নাসিমেরও তাই। এভাবে বলা, হয়তো, তোমরা ভালোভাবে নেবে না। কথারও বরখেলাপ। তবু যদি -।’ রহমতুন্নেসা বিষয়টা উদারভাবেই গ্রহণ করেন। বলেন, ‘ফুপি, এভাবে বলে লজ্জা দেবেন না। আমরা তো দু-চার দিন থাকার জন্যই দরিয়া ভাবিদের বাড়িতে এসেছিলাম। তারপরও ফেরদৌসীর বাবার যদি জরুরি কাজ থাকে, সে না হয় চলে যাবে। তাছাড়া আজকের দিনের পর আর কোনো ঝামেলা কি থাকছে? আপনি শুধু শুধু আমাদের জন্য চিন্তা করবেন না।’
ফেরদৌসীদের যাওয়া তো হচ্ছে না। এটুকুই যদি এই নেতিবাচকতার ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকতো, তবে তো কথাই ছিল না। কিন্তু ঘটনা নতুন মোড় নিতে থাকে। বেলা বারোটা মানে, অন্য সবারও বারোটা বাজিয়ে নঈম হোসেনরা আসে। তারা আসার পর কী আনন্দ, হুড়োহুড়ি পড়ে যায় বিবাহের সওদাপাতি নিয়ে। বিয়ের শাড়ি দেখে সবাই খুশি। স্যুটকেসের আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রও মন কেড়ে নেয়। নাসিমের জন্যও আনা হয়েছে পায়জামা-পাঞ্জাবি। নঈম হোসেনের স্ত্রী জোবায়দা খাতুন জেদ ধরেন, ‘নিয়ে এলাম বিয়ের শাড়ি। এটা পরিয়ে আর দ্বিতীয়বার তো বিয়ে দেবেন না। বিয়ে দেখতে পারিনি তো কী হয়েছে? বাসর তো দেখতে পাবো। কালকে বিয়ে হয়েছে। আজকে বাসর হবে।’ ঘটনা, বোধ করি, ফজিলা বানুর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। রোশেনারা, এমনিতেই নাচুনে বুড়ি, তার পরে তো ঢাকের বাড়ি অর্থাৎ বাসরের প্রস্তাব। সে বলে, ‘ভাবি, আপনি ঠিকই বলেছেন। কালকে ছিল কালরাত্রি। আজকে বাসররাত্রি। এটাই হবে।’ পাত্রপক্ষ আর কন্যাপক্ষ – দুপক্ষেই লক্ষ করা যায় প্রবল উৎসাহ। সবার আনন্দ ফজিলা বানুকেও এনে দিতে থাকে পরম পরিতৃপ্তি। খোলনলচে পালটে দেওয়া হলো নাসিমের ঘরের। গ্রামে ফুলচাষের তেমন রেওয়াজ নেই। মন্দির আছে গ্রামে একটা। পূজার জন্য ফুল আবশ্যকীয়। এজন্য রয়েছে নানা রকমের ফুলগাছ। সেখান থেকে কিছু জোগাড় করা গেল। রোশেনারা চেয়েছিল গোলাপের পাপড়ি বিছানায় ছড়িয়ে রাখতে। সেটা সম্ভব হয়নি। শিউলি ফুলের সময়। শিউলিগাছও আছে বাড়িতে। অগত্যা সেটাই বিছানার শোভা বর্ধনের কাজে লাগানো হলো। এছাড়া রঙিন কাগজ, বেলুন, রাংতা – এসব দিয়ে, মনমতো না হলেও, ঘর সাজানোর কাজটা হয়, আর কি? রোশেনারার কথা ছিল একটাই – আগেই নাসিম যেন জানতে না পারে। সকালের খাবার গলাধঃকরণ করে বেরিয়ে যাওয়ার পর নাসিমেরও আর ঘরে আসা হয়নি। বিশেষ করে ফেরদৌসীদের যাওয়া হচ্ছে না জানার পর, না আসাটা বাধ্যতামূলকই হয়ে যায়। ঘর তো রয়েছে তাদের দখলে। যখন-তখন এসে শাশুড়ি-মাতাদেরও বিরক্ত করা। নিজেও বিব্রত হওয়া। কী দরকার? বাড়িভর্তি অতিথি। দুপুরের খাওয়াটা তাদের সঙ্গেই খেয়ে নিয়েছিল। তবে সাইকেল নিয়ে কোথাও বেরিয়েও যায়নি। তাদের সঙ্গ দেওয়াটাও ছিল সৌজন্যসূচক। তবে সন্ধ্যার পর ঘরে আসাটা ছিল নেশার মাশুল জোগাতে। বাড়ি আসার সময় নাসিম, সব সময়ই বাড়তি সিগারেট নিয়ে আসে। যে ব্র্যান্ড তার পছন্দের, তা কখনো এখানে মেলে তো, কখনো মেলে না। তাই এই সতর্কতা। সুতরাং সিগারেটের সন্ধানে তার না এসে উপায় ছিল না। বাড়ির ভেতরের আয়তকার উঠানের চিত্র আগের সন্ধ্যার মতোই। সামিয়ানা খোলা হয়নি। শরিকান্তদের চেয়ারগুলো ফেরত চলে গেছে। নিজেদেরগুলো আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। হ্যজাক-ট্যজাকও জ¦লছে। আত্মীয়স্বজন যারা এসেছিল, বেলাবেলি তারা অধিকাংশই বাড়িমুখো হয়েছে। উঠানে প্রবেশ করতেই দেখে ফেরদৌসীকে নিয়ে রোশেনারারা বসে আছে একধারে। অন্যধারে আছেন মাতৃস্থানীয়ারা। নাসিম কোনো দিকে না তাকিয়ে পা বাড়ায় নিজের ঘরের দিকে।
সিগারেট-উদ্ধার পর্ব সমাপ্ত করতে হবে। কিন্তু তাকে দেখেই হা হা করে ওঠে রোশেনারা। বলে, ‘না। না। একদম ওদিকে না।’ বাধাগ্রস্ত নাসিম একটু বিরক্ত হয়েই দাঁড়িয়ে পড়ে। বলে, ‘কেন, কী হয়েছে?’ রোশেনারা বলে, ‘এদিকে আয়। কথা আছে।’ বাসরের কথা নাসিমকে বলা হয়নি। শলাপরামর্শও হয়েছে রোশেনারাদের মধ্যে, রহস্যটা যেন না ভাঙে। বিয়েটাও চমক। বাসরটা তারই সম্প্রসারণ। সাজানো ঘর দেখে ফেললে, সেটা হবে না। নাসিম বলে, ‘বল।’ রোশেনারা বলে, ‘এদিকে আয় তো। জরুরি।’ রোশেনারা ওইরকমই। দাঁড়িয়েই থাকে নাসিম। রোশেনারা বলে, ‘বলছি তো জরুরি। আয় না।’ নাসিম আসে। দেখে ফেরদৌসীও ওদের মাঝে। তাই তো, সারাটা দিন কেমন কেটেছে ওর? রোশেনারা বলে, ‘একবার বউকে তো দেখে যাবি? সেই যে সকালে খাবারের পর চলে গেলি। লম্বা চিঠির গল্প শুনিয়ে। তার মর্মার্থ না বললে ওর মনটা কেমন করবে? কী লিখেছিলি, তা জানার অধিকার তো ওর হয়েছে।’ নাসিম বলে, ‘খামোকাই দেরি করিয়ে দিচ্ছিস। আমার কি এত দিন পরে মনে আছে নাকি? গোলাপি ভাবি বলেছে, চিঠিটা সারা জীবন রেখে দেবে। তার সঙ্গে দেখা হলে, দরকার হলে, পড়ে নেবে?’ ‘কার চিঠি?’ কোথা থেকে অবতীর্ণ হলেন রসিদা খাতুন। তিনি তো এত তাড়াতাড়ি যাবেন না। আদ্যোপান্ত খোঁজখবর না নিলে তার চলে? রোশেনারা বলে, ‘কারো না।’ রসিদা খাতুন বলেন, ‘আমি স্পষ্ট শুনলাম চিঠির কথা।’ নিজেকে তো বাঁচাতে হবে! নাসিম তাই বলে, ‘মামি, আমাদের কারো না।’ রসিদা খাতুন বলেন, ‘কার?’ নাসিম বলে, ‘আমাদের পাড়ার যারা লিখতে পড়তে জানে না, অনেক সময় তাদের চিঠি আমি পড়ে দিই। মকশোও করে দিই। রোশেনারা সেই জন্য বলেছিল, আমাদের কারো না।’ মনে হলো, তিনি বিশ্বাস করলেন। কিন্তু নাসিমকে ধরার আসল জায়গাটাও পেয়ে গেলেন রসিদা খাতুন। বলেন, ‘চিঠি মকশো করার ওস্তাদি তোমার কে না জানে।’ রসিদা খাতুনের রোষদৃষ্টি থেকে ঢাল হয়ে নাসিমকে রক্ষা করা চেষ্টা চালায় রোশেনারা। সে বলে, ‘মামি, ওর হাতের লেখাও ভালো। সেজন্য সবাই ওকে দিয়ে চিঠি লেখায়।’ এবার গলা খুলে দিয়ে রসিদা খাতুন বলেন, ‘সেজন্যই তো নবী ওকে দিয়ে চিঠি লেখাতো।’ নবী, মানে নবীরুদ্দিন। তার দেবর। রোশেনারাদের আরেক মামা। চমকে যায় নাসিম। কোথায় পেটের মধ্যে ছিল জমা করা, বের করে এনেছেন রসিদা খাতুন। নিজেও ভুলে গেছে। ঘটনাটা দশ-বারো বছর আগের। নবীরুদ্দিন বিয়ে করেন দু-তিন গ্রাম পার করে। তার শ্বশুর পরিবারের মত ছিল। কিন্তু অনুমোদন ছিল না সেই গ্রামের লোকের। তাদের কথা, ফুঁসলিয়ে-ফাঁসিয়ে আমাদের মেয়েকে বিয়ে করেছে। নবীরুদ্দিনের বাপ-চাচারাও জানত না। তার গ্রামের লোকেরা আরো না। তাদের দাবি, আমাদের ছেলেকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দিয়েছে। রীতিমতো জবরদস্তি। বিয়ের কথা প্রকাশ পাওয়ার পর বেঁধে গেল ঝামেলা। একদল কন্যাপক্ষ। বলে, বিয়ে আমরা মানি না। ছেলেপক্ষের কথা, বিয়ে আমরা মেনে নেব। কিন্তু বিচার হবে জোর করে বিয়ে দেওয়ার জন্য। দেন-দরবার হতে থাকে।। সালিশ বসতে থাকে মাঝে মাঝে। কোনো পক্ষই কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। মানুষের ধৈর্যের শেষ পরিণতি দাঙ্গাহাঙ্গামা। লাঠিসোটা-সড়কি বল্লম নিয়ে। তা-ও হয়। এদিকে শরৎ যায়। হেমন্ত যায়। শীতও যায়। বসন্ত সমাগত। কিন্তু তার বাতাসে বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আসার সম্ভাবনা ক্রমশ তিরোহিত। নবীরুদ্দিন বিরহকাতর। তিনি তো বিয়ে করেছেন। জ্ঞানত স্বমতে। স্ত্রীর প্রতি একটা দায়িত্ব আছে। প্রেমের সুবাস ছড়িয়ে না দিলে – অভয় বাণী না শোনালে – ভরসা না পেলে, সেই বা প্রাণপাখিকে পিঞ্জরের ভেতর রাখবে কি করে? নবীরুদ্দিন প্রায় প্রায়ই আসেন। নাসিমদের একান্নবর্তী পরিবার তখনো আলাদা হয়নি। আঙিনাও পৃথক হয়নি। এক বাড়িতে থাকা। জোহরা খাতুন। নবীরুদ্দিনের বড় বোন। তিনি কোনো আশা দিতে পারেন না। বড় ভগ্নিপতি আজহার হোসেন, চেষ্টা-চরিত্র তিনিও করছেন, কিন্তু কোনো কূলকিনারা হচ্ছে না। আসলে মানুষ যখন বেপরোয়া হয়ে পড়ে, কিছুতেই তাদের লাগাম পরানো যায় না। নবীরুদ্দিন আসেন। নাসিমের সঙ্গে দেখা হয়। একদিন তিনিই বললেন, ‘তোর তো ভাষাজ্ঞান ভালো।
শরৎচন্দ্র-ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাসও পড়া শিখেছিস। আমার নামে তোর মামিকে একটা চিঠি লিখে দে না? বেচারা কী অবস্থায় আছে কে জানে?’ তারপর ফিসফিস করে বলে, ‘কাউকে বলিস না। আমার লোক আছে। গোপনে ঠিক পৌঁছে দেবে।’ সেই নবীরুদ্দিনের হয়ে তার নামে নাসিমের চিঠি লেখা শুরু। মুসাবিদা যাতে প্রেমময়, আবেগময়, হৃদয়ছেঁড়া হয়, সেজন্য তিনি ‘আদর্শ প্রেমপত্র’ ও এই জাতীয় নামের চার-ছ আনা দামের চটি বইও কিনে এনে দিয়েছিলেন। গ্রামেরই হাটে-বাজারে পাওয়া যেত। প্রেম ছিল খাঁটি। ভেজালবিহীন। অন্তত ওদিক থেকে। তা আবার কেউ মুসাবিদা করে দিত কি না, কে জানে? সেগুলো তো নাসিমকে পড়তেই হতো। জবাব তো দিতে হবে সে-মতো। গুপ্তচরবৃত্তিতে লিপ্ত লোকটিই আদান-প্রদান করত এগুলি। চিঠি চালাচালি শুরু হয় বসন্তকালে। তারপর গ্রীষ্ম গেল। তারপর বর্ষা গেল। তারপর শরৎ গেল। তারপর হেমন্ত এলো। দাঙ্গাহাঙ্গামা ও তজ্জনিত ফলাফল – কারো ঠ্যাংয়ের বিচ্ছিন্নতা, কারো চোখের মণি উপরে যাওয়া, কারো ভুঁড়ি বের হওয়া ইত্যাদি থেকে মামলা-মোকদ্দমা হয়ে দাঁড়ায় নিয়তি। রায় যা-ই হোক, দফায় দফায় ডেট পড়া, নিয়মিত উকিল-মোক্তারের পেট ভরানো, পেশকার-আর্দালিদের পারিতোষিক, প্রত্যেক বারের রাহা ও খাওয়া খরচ – সব মিলে প্রায় নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার উপক্রম। সুতরাং উড়ানো হলো সন্ধিপতাকা। প্রেমেরই হলো জয়। আটুনী ফিরুণীতে লোক খাওয়ানোর জন্য আজহার হোসেন পাল থেকে হাফ ডজন এঁড়ে পাঠিয়ে দেন। তার বিরুদ্ধ পক্ষের প্রচারণা হলো, ভবিষ্যতে যদি বড় ইলেকশন করতে হয়, এটি তারই বিনিয়োগ। ঝামেলা যা হওয়ার তা তো শেষ হয়ে গেল বিবাহ-বিবাদ থেকে। চিঠির ব্যাপারটি ধরার মধ্যেই নয়। স্ত্রীকে তো আনা হয়েই গেছে। চিঠি লেখার আর কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু বিপদ যে নবীরুদ্দিনের পিছু ছাড়ল না। ঘটনাচক্রে একদিন বিঘ্নসংকুল পত্নীর চোখে তার মূল হাতের লেখা পড়ে যায়। আগের চিঠিগুলি তিনি রেখে দিয়েছিলেন সযতনে। হাতের লেখা মিলছে না। মাঝেখানে নবীরুদ্দিন একদিন বাড়িতে ছিলেন না। তিনি প্রকাশ্য দিবালোকে সেগুলির সঙ্গে তার হাতের লেখার মিল কল্পনা করেও এক করতে পারলেন না। একবার ভাবেন, আমার দুরবস্থা দেখে কোনো হিতাকাক্সক্ষী কি আমাকে উজ্জীবিত রাখার জন্য লিখত। এমন হিতাকাঙ্ক্ষীও কি আছে? থাকুক। এ-কথা আর ওকে জানানোর দরকার নেই। দুঃখের দিন পার হয়ে গেছে। কী আর হবে অতীত ঘাঁটাঘাঁটি করে। কিন্তু তিনিও তো লিখেছেন। সে তো ওগুলি পড়েছে! ছিঃ ছিঃ। অবশেষে একদিন পতি দেবতাকে পর্যাপ্ত ও কার্যকর আদর-যত্ন করে বললেন, ‘কী দিন গিয়েছে তখন? ভাবতাম এভাবেই বুঝি একদিন জীবন শেষ হয়ে যাবে। না হয় নিজেকে নিজেই শেষ করে দেবো। যখন আর পারছিলাম না, তখনই আপনার চিঠি পাই। মনে হলো, আমি যেন নতুন জীবন ফিরে পেয়েছি।’ এরকম আরো আরো কথা বলে, বাক্যজাল বিস্তার করে, ‘বলতেই হবে, বলেন – ওই চিঠিগুলি কি আপনিই লিখেছিলেন?’ নবীরুদ্দিন যেন অবাক হয়ে যান। বলেন, ‘কেন? আমিই তো লিখেছি। আমি ছাড়া আর কে লিখবে?’ উত্তরে অনেক দ্বিধাজড়িত স্বরে তিনি বলেন, ‘কিন্তু আপনার হাতের লেখার সঙ্গে এ চিঠির লেখা মিলছে না যে।’ নবীরুদ্দিন যেন ধপাস করে সাততলার ছাদ থেকে পড়ে পেলেন। আত্মরক্ষার চেষ্টা ছাড়লে তো চলবে না। তিনি বলেন, ‘কি করে বুঝলে, আমার লেখা নয়।’ আনজুম খাতুন বলেন, ‘আপনার হিসাবের খাতার লেখার সঙ্গে চিঠির লেখাগুলি মিলিয়েছি যে।’ নবীরুদ্দিন বুঝলেন, আর ধানাইপানাই করলে সমস্যা বাড়তেই থাকবে। তিনি সোজা বলেন, ‘হাতের লেখা যারই হোক, চিঠিগুলি আমার। আমার নামই আছে। তোমার আর কি জানার আছে?’ কিন্তু আনজুম খাতুনকে জানতেই হবে যে। ব্যাপার তো এক জায়গাতেই। চিঠি যে-ই লিখুক, সে তো তার চিঠিও পড়েছে। চেনাজানা কেউ হলে জীবনে তার সামনে যাওয়া যাবে না। কি, লজ্জা! প্রথমে আদর-সোহাগ, তারপর অনুনয়-বিনয়, তারপর
মান-অভিমান, তারপর রাগারাগি, তারপর কথা বন্ধ। সবশেষে অনশন। নবীরুদ্দিন তারপরও নিশ্চুপ। স্কুলে পড়া ভাগ্নে লিখে দিয়েছে। মরণ আর কি! মরণ দশা তো তারও ছিল তখন। কিন্তু জানাজানি হয়েই যায়। কেবল কি রোজ কিয়ামতের দিন সব গোপনতা প্রকাশ পাবে? দুনিয়াতেও তার প্রতিযোগিতা চলে! পেটে কথা রাখতে পারে না গুপ্তচর ছোকরাটি। ফজিলা বানু থেকে শুরু করে জোহরা খাতুনসহ কারোরই তা অজানা নয়। রসিদা খাতুন তো জানবেনই। এতোদিন কেউ এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেনি। সেকেন্ডারি ফাইনাল দিয়ে নাসিম বাড়ির বাইরে না যাওয়া পর্যন্ত আনজুম খাতুন এ-বাড়িতে কখনো আসেনওনি।
মামা-ভাগ্নের সম্পর্কও দৃঢ়তর হয়েছে। একটা পরিস্থিতি এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল। তা না বোঝারও নয়। আসলে সবাই তা ভুলেই গেছে। কিন্তু আজকে, এই বিশেষ আনন্দঘন মুহূর্তে রসিদা খাতুন তার উল্লেখ করে যা করলেন, জোহরা খাতুনের কাছে তা অমার্জনীয় বলে প্রতিভাত হয়। বিশেষত আনজুম খাতুন নিজেও যেখানে উপস্থিত। কিন্তু এ নিয়ে কথা বলা থেকে তিনি নিজেকে সংযত করে রসিদা খাতুনকে স্পষ্ট গলায় ডেকে বলেন, ‘ভাবি, এদিকে আসেন। ছেলেমেয়েরা নিজেদের মতো থাকুক। গল্প করছে, করুক। ওদের সঙ্গে আমাদের কথা বলার কী আছে? ওখানে আমাদের বসারও দরকার নেই।’ রসিদা খাতুন চিরকাল কথা বলে সবার ওপর বাহাদুরি করে এসেছেন, সাতঘাট চরিয়েও দেখেছেন, কিন্তু জোহরা খাতুনের এই কণ্ঠস্বর কখনো শোনেননি। তিনি যেন দপ করে নিষ্প্রভ হয়ে গেলেন। নাসিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকায়। রসিদা খাতুন সারাদিনে তার চরিত্রের আরো কী কী উদ্ঘাটন করেছেন, এই চিন্তায় সিগারেট খাওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিল। এক্ষণে মনে হচ্ছে, খাওয়া বোধ হয় ছেড়েই দিয়েছে। রসিদা খাতুন কোনো কথা না বলে ওদিকে চলে গেলেন। রোশেনারা মুখ টিপে আস্তে আস্তে বলে, ‘তোর জন্য দরকার ছিল একটা জাঁহাবাজ দজ্জাল মেয়ে। কি করবি, হলো না।’ নাসিম বলে, ‘মানে?’ রোশেনারা বলে, ‘মানে আবার কী?’ এই বলে ফেরদৌসীকে জড়িয়ে ধরে। বলে, ‘এই শান্ত-শিষ্ট-মিষ্টি মেয়ে তোকে শায়েস্তা করতে পারবে না।’ নাসিম বলে, ‘তাতে, মনে হয়, তুই অখুশি হয়েছিস?’ রোশেনারা বলে, ‘হবো না?’ নাাসিম বলে, ‘আমি কি তোর শত্রু?’ রোশেনারা বলে, ‘শত্রু মানে, তুই আমার জন্মশত্রু।’ তারপর চেঁচিয়ে জোহরা খাতুনকে বলে, ‘মা, মা, নাসিম আমার জন্মশত্রু, না?’ জোহরা খাতুন বলেন, ‘কী বলছিস?’ রোশেনারা বলে, ‘বলবো না? নাসিম তোমার বুকের দুধে ভাগ বসিয়েছে। দোলনায় ভাগ বসিয়েছে। স্নেহ-আদর ভাগ করে নিয়েছে। ওকে জন্মশত্রু বলবো না তো কাকে বলব? তুমিই তো সাক্ষী।’ একথা শুনে মা-চাচিরা সবাই হাসতে থাকে। খোদেজা খাতুন রহমতুন্নেসাকে বলেন, ‘বেয়াইন, নাসিম আর রোশেনারার জন্ম কয়েকদিন আগে পরে। নাসিমের জন্মের পর আমার বুকে দুধ ছিল না। ও বড় বুবুজানের দুধেই মানুষ।’ রহমতুন্নেসা তখন জোহরা খাতুনকে বলেন, ‘বড় বেয়াইন, আপনি তো নাসিমের দুধমা।’ জোহরা খাতুন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই দুই দুধ ভাইবোনের মধ্যে খুনসুটি লেগেই আছে। আবার দুজনের মধ্যে ভালোবাসাও খুব। রোশেনারা আসার জন্য কালকে আমরা দেরি করছিলাম এজন্যই। নাসিমও বাইরে চলে গেছে। রোশেনারাও শ্বশুরবাড়িতে। অনেকদিন পর দেখা। দুজনের লাগালাগিটা জমেছে দারুণ।’ খোদেজা খাকুন বলেন, ‘ওদের তো বোন নেই, কেবল নাসিমের নয়, রোশেনারা আমার সব ছেলেদেরই আপন বোন।’
রাতের রান্নাবান্নাটা বাবুর্চিই করেছে। বাকি রয়েছে পরিবেশন। ঠান্ডাও নেমে আসছে। সঙ্গে কনকনে বাতাস। জোহরা খাতুন বলেন, ‘খাওয়াটা সেরে ফেলতে হবে। রোশেনারাদের কি সব ঠিক আছে?’ তাই তো, রোশেনারার মনে হয়, নাসিম তো আবার ঘরের দিকে হাঁটা দেবে। ওকে তো এখনই যেতে দেওয়া যাবে না। গেলেই সব রহস্য ফাঁস। সে তাড়াতাড়ি বলে, ‘তুই কি কিছু একটা নিতে এসেছিস?’ নাসিম বলে, ‘ঠিক আছে, আমি নিয়ে চলে যাচ্ছি। আমার খাওয়া তো বাইরে। অতিথিদের সঙ্গে।’ রোশেনারা বলে, ‘না, না, তোর যেতে হবে না। কী বল, আমি এনে দিচ্ছি।’ নাসিম বলে, ‘কী হবে আমি গেলে?’ রোশেনারা দেখে রসিদা খাতুন চলে গেছে। সে বলে, ‘তোপের মুখ থেকে বেঁচে গেলি। তাতে হচ্ছে না। খালি কথা বলিস। বলছি তো অসুবিধা আছে।’ নাসিম বলে, ‘আমার সিগারেট?’ ঘর গোছানোর সময় রোশেনারা সিগারেটের প্যাকেটগুলি দেখেছিল। বলে, ‘তুই দাঁড়া। আমি এনে দিচ্ছি।’ রোশেনারা ফিরে আসে একটা বড় প্যাকেট নিয়ে। নাসিমের হাতে দিয়ে বলে, ‘নঈম ভাই-ভাবিরা আসার সময় তোর জন্য পায়জামা-পাঞ্জাবি নিয়ে এসেছেন। এরপর যখন তোকে ডাকব, এগুলি পরে ভেতরে আসবি। চিন্তা করিস না। এর ভেতরেই সিগারেট ভরে দিয়েছি, যা খাবার খেয়ে নিবি। আসার পর খাওয়া কিন্তু একদম বারণ। তোকে পছন্দ করেছে বলে যে সিগারেটের গন্ধ আমার লক্ষ্মী ভাবি পছন্দ করবে, তা তো নয়।’ রহস্যের তো মনে হয় অর্ধেক ফাঁস হয়েই গেল। তাই মুখ টিপে হেসে রোশেনারা বলে, ‘কালরাত্রি তো শেষ করতে হবে।’ নাসিম ধরেই নেয় আজকেও নানা রকম জ্বালা-যন্ত্রণা সহ্য করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কথাগুলো বলেই রোশেনারা পাশে বসা ফেরদৌসীকে নিয়ে রওনা দেয়। তাকে বলে, ‘তোমাকে দাদিমার ঘরে রেখে আসবো। এখন সেখানে কেউ নেই। সারা দিন আমাদের সঙ্গে ছিলে। একটু একা থাকো। ভালো লাগবে।’
ফেরদৌসী একা হয়ে যায়। এরপর তো বাসর। সে নিজেও তো নারী হয়ে যাবে। ‘নিশীথে ঘুমালে কুমারী বালিকা, প্রভাতে জাগিলে বঁধু।’ জীবনে প্রথমবারের মতো একজন পুরুষের সঙ্গে শয্যাগ্রহণ করতে হবে। বিয়ে তো হয়েছে, কিন্তু মনটাকে কি তাকে দিতে পেরেছে? একটি নির্বস্তুক জিনিস। অশরীরী। ইন্দ্রিয়ের মধ্যে থাকা অতীন্দ্রিয়তার বোধ। একবারে কি তা কাউকে দেওয়া যায়? নাসিম বলেছে, তার ভাগ্যটাকে একটু একটু করে দিতে। মনটাকেও কি ওভাবে একটু একটু করে দেওয়া যাবে? আর ভাগ্যটাই বা কি? যা ঘটছে, তাই ভাগ্যের হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর শরীর? তাও তো দিতে হবে। মন ছাড়া শরীর কি দেওয়া যাবে? পুরুষেরও কি তাই? নাকি তা কেবল তাদের জৈবিকতা? না হলে তারা ধর্ষণ করে কি করে? খারাপ জায়গাতেও তো তারা যায়। সেখানে নারী তো কেবল দেহ। টাকা থাকলে বুঝি মন লাগে না! নারীকে তুলনা করা হয় কৃষিক্ষেত্রের সঙ্গে। আসলে কি তাই? সমাজে সন্তান জন্মের বৈধতা দেওয়ার জন্যই বিয়ে। তাই তারা বুঝি ফসলের জমি! হয়তো প্রকৃতি রাজ্যে দেহগতভাবে নারীরা অরক্ষিত বলেই বোধ করি নৈতিক বিধিনিষেধের খাঁড়া উঁচিয়ে রাখা হয়েছে তাদের ওপর। ভাবতে পারে না ফেরদৌসী। তার অনেক বান্ধবীই বাসররাত পার করেছে। অনেক অনাস্বাদিত রোমাঞ্চের গালগল্পও তারা করেছে। কিন্তু এই শরীর প্রসঙ্গটি আসেনি। তা কি বান্ধবীদের লজ্জাবশত? তারাও কখনো জানতে চায়নি। তা-ও কি লজ্জাবশত? বিষয়টি চিরন্তন, আনন্দেরও বটে। কিন্তু কতটা আনন্দের, তার পরিমাপই বা হবে কীভাবে? একা একা বসে ফেরদৌসী যখন এসব ভাবছিল, তখন নাসিমও না ভেবে বসে ছিল না। বসে বসে সে-ও ভাবছিল,
প্রেম-ভালোবাসা ঠিকই আছে। কিন্তু নপুংশতার অপবাদ নিয়ে ঘরসংসার টালমাতাল হলে নিরর্থক হয়ে যাবে বিবাহিত জীবন। তবে প্রেম-ভালোবাসার কথাটা যত সহজে বলা যায়, ওই কাজটা কি ততই সহজ হবে? তার জন্য কি কোনো প্রস্তুতির ব্যাপার জড়িত নেই? সন্দেহ নেই, প্রকৃতিগতভাবেই নারীর ভূমিকা অপ্রত্যক্ষ। তা না হলে তারাও পুরুষের মতো যত্রতত্র মিলিত হতো। তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে যেমন পুরুষেরা ধর্ষক সেজে যায়। নারীরা তেমন পারে না। সমাজ-সংসারের অবস্থানই তাদের রক্ষণশীলতার সংস্কারে আবদ্ধ করে দিয়েছে। বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরের যা কিছু – সবই পাপপুণ্যের বাটখাড়ায় আছে তুলে দেওয়া। সেজন্যই কি মন না জাগলে তাদের দেহ জাগে না? তাই মনটাকে জাগাতে হবে আগে। আবার এটাও ভাবে, তারা তো জীবনের ধাত্রী। জীবজগতের অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটায় তারা। তা তো অন্তর্ভুক্ত শারীরবিদ্যার। সে-শিক্ষা কী করে হবে? এদিকে বেশি সময় নিলে তো জুটে যেতে পারে নপুংশতার অপবাদ! সমাধান কোনো খুঁজে পায় না তাৎক্ষণিকভাবে।
সে-রাত ছিল স্বস্তির। জোগাড়যন্ত্রেরও না। উৎকণ্ঠারও নয়। ঘরের ভেতর হ্যাজাক বাতি। একটি নয়। দুটো। শহরের উজ্জ্বল বিদ্যুৎবাতির চেয়েও উজ্জ্বলতর আলো। ঝলকিত হয়ে ঠিকরে এসে পড়ে চোখে। ফেরদৌসীকে নতুন করে গোসল করানো হয়নি। সাজপোশাক আগের দিনের চেয়ে ভিন্ন। পরানো হয়েছে বিয়ের শাড়ি। তৎআনুষঙ্গিক অন্যান্য বস্ত্র। গহনাগাটিও জড়ানো সর্বাঙ্গে। কালকে যাওয়ার সময়ও নিশ্চয়ই এগুলি এভাবেই পরতে হবে। নাসিম ভাবে, নারী-জন্মের কি বিড়ম্বনা পদে পদে! সে তো কেবল মেজোভাই-মেজোভাবির কিনে আনা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে আছে। তার পোশাকাদি নিয়ে যায়নি কেউ খবরদারি করতে। ধীরেসুস্থে খাওয়াদাওয়া সেরে মন্থরতা বাড়ির সবার মধ্যে। বাসরঘর। এখানে সঁপে দেওয়ার কোনো ব্যাপার নাই। সালাম-আশীর্বাদেরও কোনো ঝামেলা নাই। সবার প্রবেশাধিকার নাই জুটে যাওয়ার।
দাদি-নানিদের জন্য অবশ্য একটা ব্যবস্থা আছে। কিন্তু ফজিলা বানুর ধরনই অন্যরকম। আর আসতে পারতেন তাহেরা খাতুন। কিন্তু দেখলেন, একাকী হয়ে যান। কি দরকার, অল্পবয়সীদের এই হই-হট্টগোলে থাকার? দরিয়ার থাকার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু নতুন সম্পর্কই দাঁড়ায় বাধা হয়ে।
নাসিমকে খবর পাঠানো হয়। সে আসে। দেখে, রোশেনারারা ঘিরে ধরে বসে আছে ফেরদৌসীকে। নাসিম ঢুকতেই একদল বলে, ‘ঢুকতে দেবো না। ঢুকতে দেবো না।’ আরেকদল বলে, ‘কাছে আসা চলবে না। চলবে না।’ সংখ্যায় অনেকেই হয়েছে। চাচাতো-মামাতো-খালাতো-ফুপাতো বোনেরা তো আছেই। পাড়তোরাও এসে ভিড় করেছে। নাসিম ভাবে, অনুষ্ঠান করে বিয়ে হলে কী হতো! আসলে, গ্রামের মেয়েদের আনন্দ-উৎসবের তেমন ব্যবস্থা নাই। বাইরে যেতে পারে না। যাত্রা-পালাগান-থিয়েটার – এসব দেখা তো একদম নিষেধ। সিনেমা কাকে বলে, তাই বোধ করি, জানে না। বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানই হাতের পাঁচ। নাসিমকে এনে বসানো হয় ফেরদৌসীর পাশে। সে ব্রীড়াবনত হয়ে নেই। তার দৃষ্টি স্মিতমুখে প্রসারিত। রোশেনারা একটি কিশোরীকে নিয়ে আসে সামনে। এরই মধ্যে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে কায়সার। রোশেনারা বলে, ‘তুই কেন? তুই কেন? বেরো। বেরো। ছেলেদের থাকা নিষেধ।’ কায়সার বলে, ‘কিসের নিষেধ? আমি তো ভাবিকে সালাম করতে এসেছি।’ রোশেনারা বলে, ‘তুই কেন সালাম করবি?’ কায়সার বলে, ‘ভাবি সবাইকে সালাম করলো। তাকেও তো সালাম করতে হবে?’ রোশেনারা বলে, ‘তুই করবি?’ কায়সার বলে, ‘কে করবে? আমি তো করবোই।’ তারপর রোশেনারার সঙ্গে করে নিয়ে আসা কিশোরীটিকে দেখিয়ে বলে, ‘পেয়ারাও করবে ওর বোনকে।’ রোশেনারা উঠে গিয়ে কান ধরে বলে, ‘একা হচ্ছে না? দল গোছাচ্ছিস? বাহানা একটা ভালোই বানিয়েছিস! বেরো।’ রুবা বলে, ‘রণিভাইয়ের বাসরঘরে আমার ভাইয়েরাও ছিল যে। ছেলেরা বড় না মেয়েরা বড়, তাই নিয়ে দুপক্ষ হয়ে আমরা গান করলাম।’ জলজ্যান্ত নজির সামনে। রুলিং আনভ্যালিড হয়ে যায়। রোশেনারা বলে, ‘ঠিক আছে। থাক তুই। হংস মাঝে বক যথা।’ এবার সেই কিশোরীটিকে দেখিয়ে নাসিম বলে, ‘কাকে এনেছিস?’ রোশেনারা বলল, ‘চিনতে পারলি না?’ নাসিম তাকায় তার দিকে। ভালো করে তাকিয়ে থাকে। বলে, ‘না. চিনতে পারছি না।’ রোশেনারা বলে, ‘ওর বোনকে চিনতে পারলি। আর ওকে চিনতে পারছিস না?’ নাসিম এবার বোঝে – ফেরদৌসীর বোন। ঘোরাফেরা করতে দেখেছে।
এ-পর্যন্তই। বলে, ‘তা এখানে কেন? বাড়িতে কি ঘরদোরের অভাব পড়ে গেছে?’ রোশেনারা বলে, ‘তার মানে?’ নাসিম বলে, ‘তার মানে হলো, নিয়ে তো এসেছিস। ওকে কি রাতে আমাদের সঙ্গে রাখতে হবে?’ রোশেনারা বলে, ‘কেন? বউয়ের সঙ্গে ওকেও কি রাখতে চাস?’ নাসিম বলে, ‘না, রাখা যাবে না। জানিস তো, চা খাওয়ার পর সিগারেট খেতে হয়।’ রোশেনারা বলে, ‘এর মধ্যে সিগারেটের কথা কেন?’ এ-কথা বলে ফেরদৌসীকে বলে, ‘খবরদার, সিগারেট খেতে দেবে না। দেখবো তোমার শাসনের শুরু।’ নাসিম বলে, ‘আগে শোনই না? বউ হলো চা। আর শ্যালিকা হলো সিগারেট। একটা খেয়ে আরেকটা খেতে হয়। দুটো একসঙ্গে খেতে নেই। ক্ষতি হয়।’ এ সময় কথায় ঢুকে পড়ে কায়সার। সে বলে, ‘রবীন্দ্রনাথ কি বলেছিলেন জানেন?’ রোশেনারা বলে, ‘না, জানি না তো।’ কায়সার বলে, ‘মৈত্রেয় দেবীর বোনকে দেখে তার স্বামীকে নাকি তিনি বলেছিলেন, তুমি তো দেখছি, বউয়ের সঙ্গে একটা ফাও-ও পেয়েছো।’ রোশনারা বলে, ‘তুই কি রবীন্দ্রপিডিয়া হয়ে গেছিস?’ কায়সার বলে, ‘আমি রবীন্দ্র্রনাথকে নিয়ে পড়বো যে।’
রোশেনারা বলে, ‘সেজন্যই, বুঝি এখন থেকেই দম লাগাতে শুরু করেছিস? কিন্তু সাবধান, যেখানেই পড়তে যাস, চুল যেন কেটে না দেয়।’ কায়সার বলে, ‘ওহে, বুবু! তুমি মোরে কি দেখাও ভয়, সে ভয়ে কম্পিত নয় আমার হৃদয়। – ছাঁটুক। আমি কি সে জন্য করতোয়ায় ঝাঁপ দেবো?’ রোশেনারা বলে, ‘লাভ হবে না। করতোয়াতে ডুবে মরার মতো পানি নাই।’ এবার নির্মল হাসি দেখা যায় কায়সারের মুখে। সে বলে, ‘আমি মরবো কেন? শোনেন বুবু, চুল ছাঁটবে। চুল বাড়বে। চুল ছাঁটবে। চুল বাড়বে। চুল ছাঁটবে। চুল বাড়বে। ছাঁটবে। বাড়বে। ছাঁটবে। বাড়বে। ছাঁটবে। বাড়বে। তার অগ্রগতি অপ্রতিরোধ্য। কারো সাধ্য নাই দাবায়ে রাখার।’ রোশেনারা বলে, ‘ঠিক আছে, এখন থেকেই বাড়াতে থাক। কথা বললে বাড়া বন্ধ হয়ে যায়।’ তারপর নাসিমকে বলে, ‘আগে বল, তোর বউ সুন্দরী, না শ্যালিকা?’ নাসিম বলে, ‘আমি কি বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতার বিচারক?’ রোশেনারা বলে, ‘তা না হয় না-ই হলি, অন্ততপক্ষে একবার বউ-শ্যালিকার প্রতিযোগিতার হয়ে দেখ, কেমন লাগে?’ নাসিম পড়ে যায় বিপদের মধ্যে। একদিকে স্ত্রী। আরেকদিকে শ্যালিকা। ছোটবেলায় দাদিমা কবিতা শোনাতেন। এখনো কিছুটা মনে আছে, যৌতুকাদির লোভে মন না ভুলিয়ে, কবি বলছেন – ‘শ্যালী যেথা নেই সেথা বিয়ে করো না।’ কৌতূহল ছিল, কে লিখেছেন? বড় হয়ে দেখেছে, গোলাম মোস্তফা। তাই একটু ভেবে-চিন্তেই বলে, ‘দেখ, একেক বয়সের সৌন্দর্য একেক রকম। কৈশোরের যেমন কৈশোরোত্তীর্ণ দিনের তেমন না। কাজেই, এ নিয়ে কোর্ট বসানোই অবৈধ। আইনগত ভিত্তি নাই। তাই, ওদের মধ্যে কোনো তুলনা হয় না।’ রোশেনারা বলে, ‘ভারী জ্ঞানের কথা! আবার পিঠ বাঁচানোরও।’ তারপর মেয়েটিকে বলে, ‘পেয়ারা, দেখলে তো, এ-ঘরে তোমার কোনো জায়গা হবে না। আপাতত গিয়ে দুলাভাইয়ের পাশে কিছুক্ষণ বসো।’ পেয়ারা নাসিমের পাশ দিয়ে গিয়ে ফেরদৌসীর পাশে বসে। নাসিম বলে, ‘এটা কী হলো?’ রোশেনারা বলে, ‘ওর বোন তোকে পছন্দ করেছে বলে ও-ও করবে? বিচারে রায় দিলে না হয় বিবেচনা করতো। আমাদের থেমে থাকলে চলবে না। গানের কথা উঠেছে। মেয়েপক্ষ ছেলেপক্ষ সাজানো না গেলেও গান হতে বাধা নেই।’ রোশেনারা বলে, ‘কে কে গাইবে, হাত তোলো।’ কেউ তোলে না। এদিক-ওদিক চেয়ে রোশেনারা বলে, ‘নাসিম, তুই গা।’ নাসিম বলে, ‘আমিও তাই চিন্তা করছিলাম।’ রোশেনারা বলে, ‘তুই তো চিঠি লিখতে জানিস। গান তো কখনো শুনিনি?’ নাসিম বলে, ‘শুনিসনি। এবার শোন।’ রোশেনারা বলে, ‘শুরু কর।’ নাসিম বলে, ‘ঠিকঠাক বলছিস তো?’ রোশেনারা বলে, ‘এতে বেঠিকের কি আছে?’ নাসিম বলে, ‘পরে দোষ দিবি না তো?’ রোশেনারা বলে, ‘কিসের দোষ?’ নাসিম বলে, ‘তোদের তাড়ানোর জন্য যে বুদ্ধি বের করেছি -।’ রোশেনারা বলে, ‘দেখি, বুদ্ধির দৌড়।’ নাসিম বলে, ‘জানিস তো, ‘গান জুড়েছেন গ্রীষ্মকালে ভীস্মলোচন শর্মা/ আওয়াজ খানা দিচ্ছে হানা দিল্লি থেকে বর্মা’। আমার গলার জোর তার চাইতেও বেশি। আমি দেখলাম, আমি গাইতে শুরু করলে তোরা কি আর বসে থাকতে পারবি? ভেগে যেতে হবে এখান থেকে।’ রোশেনারা বলে, ‘সেটাই সুবিধা বউকে একা পাওয়ার? আমরা তা হতে দেবো না।’ রুবা বলে, ‘দরকার নাই ভাইয়ার গান গাওয়ার। আমরা এখান থেকে যাবো না।’ নাসিম বলে, ‘তাহলে তুই গা।’ রুবা বলে, ‘দিলু তখন হাত তোলে নাই। আব্বা ওর জন্য গানের মাস্টার রেখে দিয়েছেন। স্কুল ফাংশনেও গায়। ওই গাইবে।’ নাসিম বলে, ‘একজন পাওয়া গেল। আরো পাওয়া যাবে। এটা হোক, প্রতিভা স্ফুরণের রাত। দিলু, তুই শুরু কর। কী বলিস, রসুন।’ ধমকে ওঠে রোশেনারা। বলে, ‘ফাজলামি করবি না?’ নাসিম বলে, ‘তুই তো দেখছি, ডিক্টেটর হয়ে গেছিস। দে না বের করে ঘর থেকে। যা শুরু করেছিস! আমি বাঁচি।’ রোশেনারা বলে, ‘এটাই তোর শাস্তি। দিলু শুরু কর।’ দিলু বলে, ‘খালি গলায়?’ রোশেনারা বলে, ‘গলায় কি গামছা বাঁধবি?’ দিলু বলে, ‘হারমেনিয়াম লাগবে না?’ হারমোনিয়াম একটা ছিল বাড়িতে। কায়সারকে হুকুম করে রোশেনারা, ‘নিয়ে আয়।’ কায়সার তড়িৎগতিতে গিয়ে নিয়ে আসে। দিলু বলে, ‘কে বাজাবে?’ রোশেনারা বলে, ‘কেন, তুই বাজাবি না?’ দিলু বলে, ‘আমি তো বাজাই না।’ রোশেনারা বলে, ‘তাহলে যখন তুই গান করিস, তখন কে বাজায়?’ দিলু বলে, ‘ওস্তাদজি।’ ওদের বাবার পোস্টিং আক্কেলপুরে। ওস্তাদজির বাড়িও সেখানে। তাকে তো এখন সেখান থেকে আনা সম্ভব নয়। কায়সার বলে, ‘ঠিক আছে, কোনো চিন্তা নাই। আমি মাউথ অর্গান বাজাতে পারি। মিলিয়ে দেবো।’ রোশেনারা বলে, ‘তুই তো সকল কাজের কাজী! মেলাতে থাক। দিলু, তুই শুরু কর।’ রুবা তার বোনের গান শোনানোর জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। সে বলে, ‘না, না, মেলাতে হবে না। দিলু, তুই হারমোনিয়াম ছাড়াই গা। তোর আসল গলাও কি কম সুন্দর! শুনিয়ে দে। শুনিয়ে দে।’ ইতোমধ্যে কায়সার মাউথ অর্গানটি দুই ঠোঁটে চেপে মুখে ধরে ছিল। রোশেনারা বলে, ‘বের করে ফেল। মামলা বাতিল হয়ে গেছে।’ দিলু কেশে-টেশে গান ধরে। গলাটি তার আসলেই মিষ্টি। সে গাইতে থাকে, ‘যাও গো এবার যাবার আগে রাঙিয়ে দিয়ে যাও।’ কায়সার এমনিতেই আহত হয়ে ছিল। গানের শুরু শুনে সে চেঁচিয়ে ওঠে। বলে, ‘ভাবিদের বাড়ির গান এখানে কেন? শ্বশুরবাড়িতে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার গান কেন?’ সবার ভেতরেই গান শোনার একটা পরিবেশ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তারাও চেঁচায়, ‘ভাবির বাড়ি শ্বশুরবাড়ি বুঝি না, আমরা গান শুনবো। গান।’ কায়সারের মনঃক্ষুণ্ন হওয়ার কারণ রোশেনারার না বোঝার নেই। তবু সে বলে, ‘কায়সার, আর একটি কথা না। তোকে কিন্তু বের করে দেবো।’ কী করবে কায়সার? এতে তার যেমন রাগ হচ্ছিল, তেমন বিমর্ষও হয়ে পড়ছিল। সবাই মজা করছে। আর তাদের সামনে যত ঝাড়ি যাচ্ছে তার ওপর। একবার ভাবে, থাকবোই না এখানে। হতে থাকে অনেক কিছুই। ট্রেনিং-ফ্রেনিং নাই, পাড়াতো বোনেরা মেহেদি বাটা-গায়ে হলুদের সময় নিজেদের মতো করে নেচেগেয়েও থাকে। এখানে আগাম ঘোষণা ছাড়া কিংবা শীতরাত্রির বৃদ্ধির কারণে, সেসব হয় নাই। তাদেরও দু-একজন ‘হলুদ বাটো মেন্দি বাটো’ এই সব গাইলো আর নাচলো। একপর্যায়ে সবাইকে থামিয়ে দিয়ে রোশেনারা বলে, ‘তোমাদের জন্য একটা ঘোষণা আছে।’ সবাই কৌতূহলী হয়ে এ-ওর মুখের দিকে চায়। কী ঘোষণা আসে? রোশেনারা বলে, ‘তোমরা শোনো, এবার মাউথ অর্গান বাজিয়ে শোনাবে নাসিম আর আমার ছোটভাই কায়সার।’ ফেরদৌসীকে চুপচাপ বসেই থাকতে হয়। সে ছিলও তাই। তাকে কেউ কোনো কথা বলতেও বলেনি। কী আশ্চর্য, হাততালি দিয়ে ওঠে সে। সেইসঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত সবাই। ফেরদৌসীর এই সহজতা দেখে নাসিমের মনে হয়, আগামীদিনের পথটাও বুঝি শুরু হলো সহজ হওয়ার। কায়সারও হতবাক। এতক্ষণ তো বসেছিল গোমড়ামুখে। সে যেন আর কোনো কিছুর মধ্যেই নাই। রোশেনারা বলে, ‘কী রে, আয়। দেখলি না তোর ভাবিও কেমন হাততালি দিলো।’ এ হেন পরিস্থিতিতে ক্রোধ ও বিমর্ষতা কাটিয়ে একধরনের বিমূঢ়তা নিয়েই মুখে মাউথ অর্গান ঠেকায় কায়সার। একটু থেমে, সম্ভবত ভেবে নিয়েই শুরু করে। মাউথ অর্গানে বেজে ওঠে সুর – ‘হ্যায় আপনা দিল তো আওয়ারা।’ নাসিম ভাবে, এই গানটিই তো একসময় শহর-বন্দর তো বটেই, গ্রাম-গঞ্জকেও পাগল করে দিয়েছিল। সে তখন কেবল মহকুমা শহরে গিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছে। পাড়াগাঁ থেকে এসেছে, সিনেমা তো দেখতেই হবে। নায়ক-নায়িকাদের চলাফেরা, কথাবার্তা, পর্দা ফাটানো নাচ – কোনো কিছুরই কি তুলনা আছে? চোখ তো বিস্ফারিত হয়ই, হাঁ হয়ে যায় মুখও। তারপর প্রেম-ভালোবাসা উন্মোচিত করতে থাকে এক নতুন দিগন্ত। আবার নায়িকার দুঃখে অশ্রু বিসর্জন, তাও কি বাদ গেছে? আসলে তা ছিল এক নতুন জগৎ। পরিচয় ঘটেনি আগে। দুটো সিনেমা হল ছিল সেখানে। তার একটিতে আসে সোলভা সাল। প্রথম রজনীতে তেমন দর্শক হয়েছিল কি না, মনে নাই। কিন্তু দিন যতই যেতে থাকে দর্শক পড়তে থাকে উপচে। আর বিকেল শুরু হতেই হলে লাগানো বাইরের মাইকে বাজতে থাকে গানটি। পরে জেনেছে, সিনেমাটি উইলিয়াম ওয়েলারের রোমান হলিডের প্রভাবে দেশীয় পটভূমিকায় নির্মিত। অড্রে হেপবার্নকে ইনট্রোডিউস করা হয়। আর ছিলেন গ্রেগরি পেক। তাতে কিছু যায়-আসে নাই। দেখা থেকে লোকজনকে কি ক্ষান্ত করা গেছে?
কিন্তু হেমন্তের এই গানটি? অলৌকিক জাদুতে ভরা। আরো আরো গান। নাসিম উপলব্ধি করে, কেবল তিনিই নন, সতীনাথ, মানবেন্দ্র, শ্যামলেরাই তার যৌবন গড়ে দিয়েছেন। কথা। সুর। মনের ভুবনকে করেছে দিগন্ত মেখলা। আনুভূতিক ব্যঞ্জনার তাজমহল। এখনো তো তা নিঃশেষ হয়নি। গান শোনাও চলছে কোনো নিয়ম না মেনেই। ভাবে, ফেরদৌসীরও যেন তাই হয়। কতই না রোমাঞ্চের হবে? বরষার মেঘমেদুর দিনে, গ্রীষ্মের অলস প্রহরে, শরৎ-হেমন্তের জ্যোৎস্না প্লাবনে, বসন্ত বাতাসে দুজন বসে সুরের মায়াজালে হারিয়ে যাবে। আবার মাউথ
অর্গান – তারও জোয়ার আসে এই গানটির সঙ্গে সঙ্গে। দখল করে নেয় উঠতি বয়সের ছেলেদের মুখ। কেবল তা শহর-বন্দরের নয়। তার ধাক্কা এসে লাগে পাড়াগাঁতেও। কায়সারই তো, দেখা যাচ্ছে, তার ফলাফল। বাজানো শেষ হয়। কায়সারকে দেখে মনে হয় সে পরিতৃপ্ত। এটা তো ছিল বাসরের প্রস্তাব। রোশেনারা বলে, ‘এবার সবাই চল। কেউ আড়ি পাতবে না।’ কায়সারকে বলে, ‘দেখ তো, খাটের নিচে কেউ লুকিয়ে আছে কি না? আমি কোনো বাঁদরামি সহ্য করবো না।’ পেয়ারাকে বলে, ‘আজকে রাতে বোনকে আর পাহারা নাই বা দিলে? এখন চলো।’ তারপর নাসিম-ফেরদৌসীর সামনে দাঁড়িয়ে বলে, ‘আমার লক্ষ্মী ভাবি, আমার ভাই সব সময়ই বলে জীবনটা একসঙ্গে দুজনের, কিন্তু আমি আপাতত তাকে তোমার জিম্মাতেই রেখে যচ্ছি।’ তার দিকে তাকিয়ে ফেরদৌসীর মনে হয়, এই ননদটিও যেন কি?
‘কোলাহল তো নীরব হলো।’ সবাই বেরিয়ে গেলে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয় নাসিম। এতক্ষণ
হই-হল্লা-কৌতুক-তামাশা সবই চলছিল। অগোছালো হয়ে আছে সবকিছু। শীতের হিম ঘনীভূত হয়ে আছে তাতে। ফেরদৌসী তখনো বিছানার ওপর বসে। নাসিম বলে, ‘কারো কোনো আসল বাসর তো দেখা হয় নাই। সিনেমায় দেখেছি, তুমিও দেখেছো নিশ্চয়। নায়কেরা নয়িকার লজ্জানত মুখ তুলে তাকিয়ে থাকে। তা দেখে আমার খুব হাসি পেতো। নেচে-গেয়ে বনবাদাড়ে ঘুরে, লাফালাফি করে, কত কী করলো। আর এখন এমন একটা ভাব দেখাচ্ছে, যেন কোনো দিন দেখেনি। প্রেমমুগ্ধ হৃদয় দিয়ে আজকে তাকে আবিষ্কার করেছে। তারপর জড়িয়ে ধরে – হেসে বলে – বাকিটুকু শূন্যস্থান হয়েই থাক। তোমাকে অবশ্য খুব বেশি দেখি নাই। তবু মনে হয়, তোমাকে ওভাবে না দেখলেও চলবে। দেখবো তো সারা জীবনই। সুতরাং ও মশকরা না হয় না-ই করলাম।’ ফেরদৌসী এমন একটা ভাব দেখায়, যেন খুব সরলভাবেই বলছে। বলে, ‘তাহলে তুমি কী করবে? আর আমাকেই বা কী করতে হবে?’ নাসিম বলে, ‘কেন, অনেকক্ষণ ধরেই পরে আছো জবরজং কাপড়চোপড়গুলি। পালটাও। তোমার শরীরের গহনাগাটিগুলি, মনে হয়, আমাকে তোমার কাছ থেকে ঠেকিয়ে রাখছে। ওগুলো খোলো।’ ফেরদৌসী মিটিমিটি হাসে। বলে, ‘আর কী কী খুলতে হবে?’ নাসিম বলে, ‘মানে?’ হাসিটা ফেরদৌসী অধরে ধরেই রেখেছে। বলে, ‘না, মানে, কিছু না।’ নাসিম বলে, ‘শোনো, হেঁয়ালি জিনিসটা আমার পছন্দ না। আর যেখানে যাই হোক, তোমার আমার মধ্যে কথা হবে সরাসরি। কোনো গোপনীয়তা-আড়াল-আবডাল থাকবে না।’ ফেরদৌসী বলে, ‘শুনে রাখলাম। এবার কী করতে হবে?’ নাসিম বলে, ‘শয্যাগ্রহণ করতে হবে। তার পূর্বভূমিকাটুকু সেরে নাও। আমি আমার কাপড়চোপড় পালটে নিচ্ছি। তুমিও নাও। হাতমুখ ধুতে হবে। তোমার মুখের রংচংও, বোধ হয়, রাখা যাবে না।’ আরো বলে, ‘সিনেমাতে অবশ্য এসব হয় না। কাপড়চোপড় পালটানো হয়।’ নাসিম দেখে, ফেরদৌসী পরেছে বাসন্তী রঙের একটা সুতি শাড়ি। দু-হাতে রয়েছে কেবল দুটো বালা। নাসিম বলে, ‘তোমাকে কিন্তু খুব সুন্দর দেখাচ্ছে।’ ফেরদৌসী বলে, ‘জানি না, কি দেখে তুমি আমাকে বিয়ে করেছো। তাই এতো রাতে এসব প্রশংসা না করলেও চলবে। এখন শুয়ে পড়ো।’ শোবার আগে মশারি দরকার। ঘরেই তো ছিল। কিন্তু বাসরঘর বানাতে গিয়ে কোথায় যে রেখেছে? সত্যি, আশ্চর্য জীব এই মশারা! খুবই ক্ষীণায়ু প্রাণী। দু-তিনদিন নাকি বাঁচে? কিন্তু জন্মায় কোটি কোটি। সাহেবদের দেশেও অবাধ বিচরণ। না হলে মসকুইটো শব্দ তৈরি হয় কীভাবে? দেশে ম্যালেরিয়া মহামারিতে রূপান্তরিত। পিলে বেড়ে লোকের পেট হয়ে গেছে ঢোপ। সবই ওই মশক দংশনের পরিণতি। ধূপের ধোঁয়া আর স্প্রে করে কিছুতেই তাদের বংশ বৃদ্ধি থামানো যাচ্ছে না। চেষ্টাচরিত্র চলছে, সবংশ উচ্ছেদের। গভর্নমেন্ট একটা আস্ত ডিপার্টমেন্টই দিয়েছে খুলে। কিন্তু হচ্ছে কি? খালি গাড়ি চড়া আর টাকা মারামারি। আবার যদি বিছানায় ছারপোকা থাকে, তবে তো কথাই নাই। সারা রাত্রির মতো ঘুম হারাম হয়ে যায়। মশা আর ছারপোকার মতো জীব পৃথিবীতে কেন এসেছে, নাসিমের কাছে এ এক বিস্ময়। কেঁচো থেকে শুরু করে মৃত্তিকাতে থাকা প্রাণীরা, আর যা-ই করুক, মাটির উর্বরতা শক্তি বাড়ায়। কিন্তু মশা আর ছারপোকা, কোন কাজে লাগে? আর ছারপোকা? সে তো নিঃশব্দ ঘাতক। চাদর সাদা থাকলে সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায়, তারা কি পরিমাণ রক্তপায়ী জীব। বিছানাবালিশ রোদে দিলেও কিছু হয় না। চৌকি-খাটে গরম পানি ঢাললেও বংশ বিলুপ্তি ঘটে না। একবার এক চৌকি পুকুরের পানিতে চুবিয়ে রাখা হয়েছিল প্রায় দু-সপ্তাহ। তোলার পর তারা অস্তিত্বের জানান দিতে দ্বিধা করেনি। জীবিতই আছে! নানা ওষুধও বিক্রি হয় খুব। কাজে আসে না কোনোটাই। একবার এক মজার ঘটনা ঘটেছিল। ট্রেনে এক হকার এসে সগৌরবে ঘোষণা করছিল, ‘ছারপোকা মারা মহৌষধ। ছারপোকা মারা মহৌষধ। নিয়ে যান। নিয়ে যান।’ যাত্রীরা কৌতূহলী হয়ে জানতে চায় কি মহৌষধ। তা নিবারণ করতেই হকারটি বের করে একটি ছোট শিল-পাটা আর হাতুড়ি। বলে, ‘একটি করে ছারপোকা ধরবেন আর শিল-পাটার ওপর রাখবেন। তারপর এই হাতুড়ি দিয়ে পিষে ফেলবেন। দেখবেন নির্বংশ হয়ে গেছে।’ একজন যাত্রী বলে, ‘ভালো ওষুধ বের করেছেন। একটা একটা করে ধরবো আর হাতুড়ি দিয়ে পিষে ফেলবো। সারা রাত ধরে এই কাজ করতে হবে। ঘুম হলো না, এ-কথা বলা যাবে না।’
এটা ঠিক এখানে বিছানায় ছারপোকা নেই। কিন্তু মশারি লাগবে। ঘর সাজানোর সময় কোথায় নিয়ে রেখেছে? তবে কি রোশেনারাকে ডাকতে হবে? কি বিপদ! ফেরদৌসী বলে, ‘দাঁড়িয়ে আছো কেন? শুয়ে পড়ো।’ নাসিম বলে, ‘আমি শোবো। তুমি শোবে না?’ ফেরদৌসী বলে, ‘তুমি না বললেও আমাকে শুতে হবে। কারণ, বিছানাটা দুজনের।’ নাসিম বলে, ‘কিন্তু মশারি? সিনেমায় বাসরঘরে মশারি লাগে না। কিন্তু এখানে লাগবে। আমি মশার কামড় একদম সহ্য করতে পারি না। মশারাই বা কেমন? তাদের কি আর জায়গা নাই, কানের কাছে এসেই গান গাইতে হবে? ঘর সাজানোর সময় কোথায় যে নিয়ে রেখেছে? আমি বরং রোশেনারাকে ডেকে নিয়ে আসি।’
ফেরদৌসী বলে, ‘ডাকা লাগবে না। এতক্ষণে ঘুমিয়েও গেছে নিশ্চয়।’ নাসিম বলে, ‘তাও তো কথা। বাসরঘর সাজিয়েছে, রাত তো আর কাটাতে হচ্ছে না। ঘুমিয়ে পড়াই স্বাভাবিক।’ ফেরদৌসী বলে, ‘কাল রাতেও তো আমি এ-ঘরেই থেকেছি। মশারি ছিল। টাঙানোও হয়েছিল। হালকা-পাতলা জিনিস। বের করে ফেলার দরকার পড়েনি। আছে নিশ্চয়ই কোথাও। আমি খুঁজে দেখছি।’ নাসিম হেসে বলে, ‘হায় রে, কপাল! বাসরঘর করতে এসে মশারি খুঁজতে হচ্ছে। এখন থেকেই দেখছি শুরু হয়ে যাচ্ছে কাজকর্ম। ঠিক আছে, মশারি খোঁজাও দুজনেরই হোক।’ বেশি খোঁজাখুঁজি করতে হলো না। একটা কাঠের আলমারি ছিল। অতিরিক্ত চাদর-বালিশ ইত্যাকার জিনিস রাখা হয়। পাওয়া গেল সেখানেই। তারপর ধরাধরি করে টাঙানো হলো। দুজনে গিয়ে ঢুকলো মশারির ভেতর। ‘এবার কথা কানে কানে।’ নাসিম আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল, আজকে রাতে কোনো শারীরিক ব্যাপার নয়। ফেরদৌসীর তো এখানে থাকারই কথা নয়। তার চেয়েও বড় কথা, বিয়েতে সম্মতি যতই থাক, প্রবেশ তো নতুন জীবনে। সেটা ঘটেছে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণেই। সময় নিয়ে ফেরদৌসীর নিজেরও মনের সঙ্গে বোঝাপড়া করার সুযোগ থাকা দরকার। আর শরীর? এমন তো নয় যে একটা সুযোগ পেয়ে গেছি, এখনই তার সদ্ব্যবহার করতেই হবে। এটা হয়তো হয়, দুজন দুজনের কাছে ঘনিষ্ঠ হতে থাকলে, একটা আবেগের সৃষ্টি হয়, তখন শরীরই বলে দেয়, কী করতে হবে? তবে সেজন্য তো সারা জীবনই পড়ে আছে। যদিও এমন বিখ্যাত ব্যক্তি, নাম মনে করতে পারে না, বলেছেন, একসঙ্গে রাতে ওই কর্ম সম্পাদন করার পর স্বামী-স্ত্রী সকালবেলাতে পরস্পর পরস্পরের মুখ দেখাদেখি কী করে করে, সেটা এক আশ্চর্য বিষয়। কিন্তু কাবিননামাতে আছে, ‘স্বামী নপুশংক হলে স্ত্রী তালাক পাওয়ার অধিকারী।’ সেই নপুশংকতার একটা প্রাথমিক বীজ রোপিত হয়ে থাক, সেটা কি হতে দেওয়া ঠিক? কিন্তু কীভাবে তা দূর করা সম্ভব? নাসিম অনেক ভেবেচিন্তে বলতে থাকে, ‘শোনো, আমি একটু আগেই বলেছি, আমাদের মাঝে কোনো গোপনীয়তা থাকবে না।’ ফেরদৌসী বলে, ‘প্রমাণ তো সময়ের হাতে। আমরা আমাদের কিছু গোপন করছি কি না, তা কি আজকে রাতেই বুঝতে হবে? তেমন কোনো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে কি?’ নাসিম বলে, ‘না, তেমন কিছু হয়নি।’ ফেরদৌসী বলে, ‘তবে আর বলছো কেন?’ নাসিম বলে, ‘আমার কথাটা শোনোই না আগে।’ ফেরদৌসী বলে, ‘ঠিক আছে, বলো।’ নাসিম শুরু করে, ‘এই গোপনীয়তার বিষয়টা যেমন মনের, তেমন দেহেরও বটে। মনের কোনো বস্তুগ্রাহ্য রূপ নেই, কিন্তু শরীরের তো হাত-পা আছে। মনের মিলন ছাড়া দৈহিক মিলন বলাৎকার। সেটা অপরাধ। কখনোই তা কাম্য হতে পারে না। এখন দেহটা হলো একটা প্রাকৃতিক বস্তু। তাতে যেমন অস্থি-মজ্জা-মাংস আছে, তেমনই আছে নানা কলকব্জা। তা সবই চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। দৈহিক মিলনের জন্য তার কিছু জ্ঞান থাকাটা আবশ্যক। তাকে সাধারণভাবে বলি যৌন বিজ্ঞানের জ্ঞান। বিয়ে করে আমরা যৌন মিলনের সার্টিফিকেট পেয়ে গেছি। তাই আমার মনে হয়, সে-বিষয়ে আমাদের, কিছুটা হলেও, জানা থাকাটা আবশ্যক। এজন্য, দৈহিক মিলনের আগে, বাৎসায়নের কামসূত্র না হলেও, যৌন বিজ্ঞানের দু-একটা বই পড়ে নিলে ভালো হয়।’ ফেরদৌসী বলে, ‘তুমি তো পড়েছো?’ নাসিম বলে, ‘আমার পড়াই তো সব নয়। তোমাকেও পড়তে হবে। তোমার পড়াটাই বেশি জরুরি। কারণ, তুমি হলে জীবনের ধাত্রী। আমাদের অনাগত সন্তানকে তুমিই বহন করে নিয়ে আসবে পৃথিবীতে। তোমাদের শারীরবৃত্তও বেশ জটিল। পুরুষদের চেয়ে তো বটেই।’ ফেরদৌসী বলে, ‘থাক। থাক। বাসররাতে আর তোমাকে যৌন বিজ্ঞানের ক্লাস নিতে হবে না।’ এ-কথা শুনে নাসিম থেমে যায়। সময় নেয়। তারপর হঠাৎ করেই ফেরদৌসীকে জড়িয়ে ধরে। বলে, ‘ক্লাস নিচ্ছি না। বইপত্র কিছু আমাদের বাড়িতেও আছে। তোমাকে দিয়ে দেবো। ততোদিন নিশ্চয়ই আমরা অপেক্ষা করতে পারি?’ ছোটবেলায়
বাবা-চাচা-মামার জড়িয়ে ধরে আদর করেছে। সে অনুভূতি ছিল একরকম। কিন্তু আজ এই গভীর শীতরাত্রিতে, একই লেপের ভেতরে, লণ্ঠনের মৃদু আলোকে, একজন পুরুষ মানুষ, যাকে মাত্র একদিন আগে জীবনের সাথি রূপে গ্রহণ করেছে, সে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। বাধা দেওয়ার কোনো প্রশ্ন নয়। বাধা ফেরদৌসী দেয়ওনি। এটা অপ্রত্যাশিতও নয়। কিন্তু অনভ্যস্ততা? শরীরটা ঠিক সাড়া দেয় না। জড়িয়ে ধরেই নাসিম থেমে থাকে না। ফেরদৌসীর অধরে আলতো করে চুমু খায়। একেবারেই ক্ষণিক ব্যাপার। এজন্য নাসিমও, বোধহয়, প্রস্তুত ছিল না। ফেরদৌসী নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে থাকে। বলে, ‘তবে আর এসব কেন? এবার ঘুমাও।’ পাশ ফিরে উল্টোদিকে মুখ করে শোয় সে।
পাঁচ
পরদিন ফেরদৌসীদের যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসে। তাকে আবারো সাজানো হয়েছে। নববধূর বেশ। গায়ে যথারীতি গহনাগাটি। এই নববধূর বেশ ধরে, গহনাগাটি পরেই, সে ফিরে যাবে। সেখানে সবাই দেখবে। তার আগে কোনো নিস্তার নাই। যারা যাওয়ার, তারা তো আছেই। বাড়ির সবাই এসে একত্রিত হয়। ফজিলা বানু মুখে হাত ঠেকিয়ে আদর করে দেন ফেরদৌসীকে। রোশেনারা আর ইয়াসমিন আরা তাকে তুলে দেয় যথাপূর্বং গরুর গাড়িতে। বাকিরা সবাই দাঁড়িয়ে থাকে। গরুর গাড়ি তার নিজস্ব ঘ্যাচর ঘ্যাচর ছন্দের সূত্রপাত ঘটিয়ে চলতে শুরু করে। মুহূর্তেই নেমে আসে এক অভাবনীয় নীরবতা। স্তব্ধতার কোনো ভাষা নেই। আনুভূতিক ব্যঞ্জনময়তা ঘিরে ধরে প্রকৃতিকে। কন্যা বিদায় নয়। তাকে ঘরে আনারই নতুন প্রস্তুতি। তবু বিদায়েরই সুর যেন ভেসে বেড়ায় অন্তরীক্ষে-পাতালে-চরাচরে।
গরুর গাড়ি সড়কের নিরিখ ধরে এগিয়ে চলেছে তার মৌলিকতা নিয়ে। ছইয়ের ভেতরে রহমতুন্নেসা। ফেরদৌসী আর পেয়ারা – দুই মেয়েকেও ইচ্ছে করেই সঙ্গে রেখেছেন। বাদ্যি না বাজুক, তার মনটা আনন্দে পরিপূর্ণ। প্রত্যশার চেয়েও বেশি ঘর-বর পেয়েছেন মেয়ের জন্য – এটা তার দৃঢ় প্রত্যয়। কোনো অমঙ্গল যেন না হয় – একাগ্রচিত্তে এই প্রার্থনা তিনি অবিরত করে চলেছেন। তার মুখে কোনো কথা নাই। ভগ্নিপতির সঙ্গে যদিও পেয়ারার এখনো কোনো আলাপচারিতা হয় নাই। কিন্তু সে-ও, বলা যায়, অভাবিত এই ঘটনায় হতবাক। সে-ও চুপচাপ। নিজের বিয়ে নিয়ে ফেরদৌসীরই বা কী বলার আছে? তার তো নিশ্চুপই থাকার কথা। নানা বিষয়েই কথাবার্তা হতে পারতো। প্রথম দর্শনেই একটা স্বতঃসিদ্ধ বোধ তৈরি হয়। কে কেমন, তার প্রাথমিক মূল্যায়নও মনের ভেতর কাজ করে। আচারব্যবহার – যা মানুষজনের চরিত্রের নানা দিকও উদ্ঘাটিত করে, তা-ও হতে পারে আলোচনা-সমালোচনার বিষয়বস্তু। ঘটা করা আদর-আপ্যায়নের ভেতর দিয়ে যে অহংবোধ অন্তর্বয়িত হয়, তা-ও আহত করতে পারে মনকে। সেসব কিছুই হয় না। ফজিলা বানু, খোদেজা খাতুন, জোহরা খাতুন, ইয়াসমিন আরা – এদের সবার ছবি এসে জড়ো হতে থাকে রহমতুন্নেসার মানসচক্ষে। এক বৃদ্ধা মহিলা একটি পরিবারকে ধারণ করে আছেন। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে গেছে, কিন্তু তার কর্তৃত্ব রয়েছে অটুট। সেই কর্তৃত্ব-দণ্ড হাতে করেই তিনি এই বিবাহকর্ম সম্পাদন করলেন। তার কি কোনো তৃতীয় নয়ন আছে? প্রথম দেখাতেই তিনি যেভাবে ফেরদৌসীকে আপন করে নিলেন, তার চারপাশে ঘিরে যে সম্মোহন জাল বিছিয়ে দিলেন, তা থেকে ফেরদৌসীও কি নিজেকে মুক্ত করতে পারল? বরং তার অভিভূত রূপটাই উঠল প্রবল হয়ে। ফেরদৌসীর নিস্তব্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে একবার তার মনে হলো, তিনি বলেন, – এভাবে বরের বাড়িতে এসে বিয়ে হলো বলে অসন্তুষ্ট হোস না। আমরাও চাই, মেয়ের বিয়ে হোক নিজেদের বাড়িতে। এতোকাল যা হয়ে এসেছে। তোর বোনদের যেভাবে বিদায় দিয়েছি। পক্ষকাল আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু হবে। আত্মীয়স্বজনেরা আসতে থাকবে। কত আনন্দ-উল্লাস হবে গায়ে হলুদ মাখাতে। একে একে, তোর গুরুজন থেকে সবাই – হলুদের ছোপ দিয়ে তোর নতুন জীবনের শুরুকে রঙে রঙে রাঙিয়ে দেবেন। বিয়ের দিন বাড়ির চেহারাটাই হয়ে যাবে অন্যরকম। বরযাত্রীরা আসবে বরকে নিয়ে। তার পরণে থাকবে আচকান-শেরোয়ানি। মাথায় পাগড়ি। বাড়ির ভেতর তারা পাঠিয়ে দেবে বিয়ের স্যুটকেস। গহনাপত্র, হয়তো, আমাদেরকেই দিতে হতো। তাতে কি? তারাও তো কিছু দিত। তবু বিয়ের স্যুটকেস বলে কথা।
আয়না-চিরুনি-রুমাল থেকে আরো আরো প্রসাধনী-সম্ভার। তা খোলার আনন্দই আলাদা। তারপর সাজানো হতো তোকে। আমাদেরও তো সাধ-আহ্লাদ আছে। না, সেসবের কিছুই হলো না। রহমতুন্নেসা ভাবছেন অনেক কিছু। কিন্তু কিছুই বলতে পারলেন না। এসব ছাপিয়ে পরিতৃপ্তিটাই হয়ে ওঠে প্রবল। তার ঘনীভূত রূপটা যেন চৈতন্যলোককে পূর্ণ করে দিলো।
পেয়ারাও ভাবলো, কী বিয়ে হলো? বোনের বিয়ে। সাজানো হবে ঘরবাড়ি। বানানো হবে তোরণ। তারা আটকাবে গেট। বিয়ের অর্ধেক, না হলেও, সিকি আনন্দ তো সেখানেই। দরদস্তুর চলতে থাকবে। বরপক্ষ হয়েছো তো কী হয়েছে? আমরাই বা কম কিসে? কথার পিঠে কথা। থাকবে চলতে। তারা আটকিয়ে রাখবে বর। এদিকে বরযাত্রীরা একে একে, বরকে রেখেই, দড়ির ফাঁক গলে ঢুকে পড়বে ভেতরে। তারপর মামা-টামা জাতীয় লোকজন এসে করে দেবেন রফা। বরের দেওয়া টাকা ভাগ করা নিয়েও কি কম কাড়াকাড়ি? টাকার খেলা তো আরো আছে। বরের চকচকে জুতা-নাগরা লুকানো। খাবার পর হাত না ধুইয়ে বসিয়ে রাখা। এসব হলো না। হলো না কবিতা লিখে প্রীতি উপহার ছাপানো। – বলবে নাকি এসব? কিন্তু কিছুই বলা হলো না। তবে মনের আনন্দটারও ব্যাপ্তি কত, তারও কোনো সীমা ধরা সম্ভব হয় না।
আর ফেরদৌসী? তারও ভাবনা হচ্ছিল। কিন্তু কী নিয়ে?
বেরোবার আগে ফেরদৌসী আর নাসিমকে ডেকে পাঠান সাদাত হোসেন। ফেরদৌসীরও মনটা কেমন করছিল, বিয়ের আগেও না, পরেও না, শ্বশুর-আব্বাকে দেখা হলো না। বিয়ের রাতে উঠানে যখন তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সে শুনেছে, তখনো তিনি সেখানে ছিলেন না। তিনিও তাকে দেখেননি নিশ্চয়। তার আশীর্বাদ নেওয়া হলো না। তা হলে কি তিনি প্রসন্ন মনে এই বিয়ে মেনে নিতে পারেননি? তাই তিনি ডেকেছেন শুনে মনটা প্রফুল্ল হয়ে যায় ফেরদৌসীর। একটা আলাদা পড়ার ঘর আছে সাদাত হোসেনের। ছেলেরা যেখানেই যাক, খাওয়াদাওয়া করুক আর শুয়ে থাকুক, তাদের লেখাপড়াটা এ-ঘরে করাটা বাধ্যতামূলক করেছিলেন। টেবিল ছিল। সেখানেই থাকতো তাদের বই-খাতাপত্র। সাদাত হোসেন চিন্তা করে দেখেছিলেন, সমুদ্র না হোক, পাগাড় হোক, বইপত্র, যাই থাক, তা দেখে যদি তাদের মনে নানা কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। কৌতূহল হলো মানবজন্মের একটা বড় সম্পদ। এই কৌতূহল থেকেই সে পাখা মেলে ধরে কল্পনার। কল্পনাই শেষ পর্যন্ত বাস্তব ভিত্তি পায় নতুন নতুন সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। কেবল ক্লাসের লেখাপড়া নয়, তার ছেলেরা এখন থেকে যদি, আর কিছু না হোক, কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে বিশ^ রূপ যে পাঠশালা আছে, সেখান থেকেও শিক্ষা নেয়, সেটা তাদের জন্যই হবে গৌরবের। বই কেনাটা তার নেশা নয়। পড়ার আগ্রহটাও তৈরি হয়েছে ধীরে ধীর। একবার মহুকুমা সদরে গিয়েছিলেন। ফেরার সময় বসেছিলেন স্টেশনে। আগের কোনো একটা স্টেশনে ক্রসিংয়ের কারণে ট্রেন আসতে বিলম্ব হচ্ছিল। বড় বড় স্টেশনে বুকস্টল থাকে। সেখানেও ছিল। শুধু শুধু বসে থাকাও বিরক্তিকর। তাই পায়চারী করতে করতে এসে দাঁড়ান বুকস্টলটির সামনে। বিনা কারণেই একটি বই দেখতে থাকেন নেড়েচেড়ে। একসময় শুরু করেন পড়া। নিশ্চয়ই সেটা শরৎচন্দ্রের উপন্যাস কিংবা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোয়েন্দা কাহিনি। কিছুক্ষণ পড়ার পর ট্রেন চলে আসে। ততোক্ষণে শেষ করার আগ্রহ জন্মে গেছে। কিন্তু পড়া হয়নি এক-চতুর্থাংশ। তখন তিনি কিনেই ফেলেন বইটা। এভাবেই তার বই কেনার শুরু। হয়তো একটা বই পড়েছেন। তার ভেতরের কোনো বিষয় তাকে আকৃষ্ট করেছে। কৌতূহল মেটানোর জন্যই কিনেছেন সেই বিষয়ের বই। এখন তো তিনি নিয়মিত পাঠক। অনেক সাহিত্য পত্রিকারও তিনি গ্রাহক। দীর্ঘদিন ধরে একটি পত্রিকার গ্রাহক থাকার কারণে সেই পত্রিকার কর্তৃপক্ষ তো লিখেই জানিয়েছে, আপনার আর টাকা পাঠানোর দরকার নাই; এরপর থেকে আমরা বিনামূল্যে নিয়মিত পাঠাবো। ভূমিতান্ত্রিক পরিবারের শ্রমবিযুক্ত পুরুষদের বিনা কাজে ঘুরে বেড়ানোই কাজ। তিনি সেটা না করে বসে বসে বই পড়েন। তাই, বিন্দু বিন্দু জল জমে মহাসাগর হয়, তেমন বিশাল না হলেও একটা একটা করে অনেক বই-ই এখন তার বাড়িতে। ফেরদৌসী গিয়ে দেখে নানা রকমের বইপত্র সাজান রয়েছে ঘরে। তার শ্বশুর-আব্বা বই হাতে বসে আছেন একটি টেবিলের সামনে। তাদের দেখে ফিরে বসেন। বলেন, ‘তোমাদের জন্যই অপেক্ষা করছি।’ ওরা এগিয়ে আসে। নতমুখী ফেরদৌসী সালাম করে। সাদাত হোসেন বাধা দেন না। কোনো কথাও বলেন না। শুধু মাথার ওপর হাতটা স্থাপন করেন। ফেরদৌসী সালাম করে উঠে দাঁড়ালে মৃদু কৌতুকের সুরে নাসিমকে বলেন, ‘তুই-ও সালাম করবি নাকি? কোনো দিন তো করিসনি।’ ফেরদৌসীকে বলেন, ‘মা, যা সালাম করার আজকেই করলে। ভবিষ্যতে আর কোনো দিন করবে না। মানুষের ভক্তি-শ্রদ্ধা থাকে অন্তরে। পায়ে হাত দিয়ে তা প্রকাশ করতে হবে, তার কোনো মানে নেই।’ অনেকটা চমকে ওঠে ফেরদৌসী। তাহলে কথাবার্তা বলার রীতিটা নাসিম ওর বাবার কাছ থেকেই পেয়েছে! তিনি ওদের দুটা চেয়ার টেনে বসতে বলেন। ওরা বসে। খোদেজা খাতুন ওদেরকে নিয়ে এসেছেন। তিনি তখনো দাঁড়িয়ে। তা দেখে সাদাত হেসেন তাকে বলেন, ‘দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে চলে যাওয়া ভালো।’ খোদেজা খাতুন বলেন, ‘চলে তো যাবোই। আমি তো আপনার জ্ঞানের কথা শুনতে আসিনি। বেয়াইন সাহেবারা চলে যাবেন। তাদের বিদায় দিতে হবে।’ বলে তিনি চলে যান। তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে সাদাত হোসেন নাসিমকে বলেন, ‘তোর মা তার চেনা বৃত্তের বাইরে কখনো যেতে চাননি। গ্রামকেন্দ্রিক
আচার-সংস্কারের জন্য যে পরিস্থিতি-পরিবেশের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, বাস্তবিক অর্থেই তার বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়। তার জন্য যে সাহসের দরকার, তা সৃষ্টির কোনো সুযোগও এখানে নেই। পুরুষেরাই পারে না। সেখানে পরনির্ভরশীল মেয়েদের দোষ দিয়েও লাভ নেই।’ বাবার কথা শুনে নাসিম তো বিস্ময়ে হতবাক। ছেলের সামনে তার মা সম্পর্কে এমন কথা! আগে তো কখনো বলেননি। সাদাত হেসেন বলে চলেন, ‘তুই হয়তো বলবি, বাবা আপনি তো ছিলেন? এর উত্তরটাও খুব সহজ। আমার কথা বল আর তোর দাদাদের কথা-চাচাদের কথা বল, আমরা একটা অবস্থানে আছি। এই অবস্থানের বাইরে যেতে হয়তো আমরা চাইনি। যাওয়ার সুযোগও ছিল না। আজকে সে-সুযোগের দুয়ার খুলে গেছে। তোর বড়ভাইদের আমি বাধ্য করিনি, আমাদের সঙ্গে এখানে থাকতে। লেখাপড়াও সেজন্য করাইনি। তুইও তার বাইরে নস।’ একটু থেমে, তারপর হেসে বলেন, ‘নিজের বিয়ে নিয়ে, শুনেছি, তুই অনেক কথাই বলেছিস। আমার কানেও কিছু এসেছে। সেই কথাগুলির মর্মার্থকে সারা জীবন ধরে সত্যি করে তুলতে পারিস কি না, সেই চেষ্টা কর।’ তারপর তিনি ফেরদৌসীকে বলেন, ‘মা, জীবনে-সমাজে-সংসারে তোমার নিজের একটা জায়গা আছে। সেই জায়গাটা চিনে নেওয়াই তোমার সবচেয়ে বড় কাজ। আমি চাই, তুমি সেই জায়গাটা চিনে নেবে। এই চিনে নেওয়ার কাজটা কিন্তু তোমাকেই করতে হবে।’ তারপর নাসিমের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘আমি বউমাকে যে কথাগুলো বললাম, সেটা দেখার জন্য তোরও একটা দায়িত্ব আছে। সেই দায়িত্ব তোকে পালন করতে হবে জীবনভর। আমি যেন তার অন্যথা না দেখি।’ সাদাত হোসেনের কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় নাসিম। ফেরদৌসীও বিস্ময়াভূত। মনে পড়ছে, তার আসার সময় সাদাত হোসেন দাঁড়িয়েছিলেন দূরে।
এরপর গরুর গাড়িতে ওঠার আগে যা হয়, সেটা তো সবার সামনে।
তাহেরা খাতুন নাসিমকে বলেন, ‘আমার নাতনিকে কত তাড়াতাড়ি নিয়ে আসবে?’ নাসিম বলে, ‘নাতনি বুঝি আপনাদের ঘাড়ে ভীষণ ভার হয়ে আছে। অর্ধেক নামিয়েই দিয়েছেন। এখন বাকিটা কত দ্রুত নামানো যায়, তার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছেন।’ তাহেরা খাতুন বলেন, ‘তা কেন হবে? তুমি একা থাকো। রান্নাবাড়া-খাওয়াদাওয়া – এসব দেখতে হবে না?’ নাসিম বলে, ‘আমি তো বিয়ে করছি রান্নাবান্না করার লোকের জন্য নয়। আর ও যদি লেখাপড়া চালিয়েই যেতে চায়?’ রহমতুন্নেসা বলেন, ‘তুমি করতে দেবে? লেখাপড়া?’ নাসিম বলে, ‘কী বলছেন, মা? কেন দেবো না?’ মনসুর রহমান কথা শুনে ফেলেন। বলেন, ‘তুমি যেখানে থাকো, সেখানে তো অনেক ভালো কলেজ আছে। ট্রান্সফার করিয়ে নেবে।’ নাসিম বলে, ‘সে তো ঠিকই আছে। কিন্তু তাতে সংসার হবে।
চাল-ডাল-নুন-তেলের হিসাব হবে। কিন্তু লেখাপড়াটা হবে না।’ ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘নাসিম যা বলেছে, তাতে কিন্তু যুক্তি আছে।’ তাহেরা খাতুন বলেন, ‘তাহলে, কী হবে?’ নাসিম বলে, ‘ও তো পরীক্ষাটা দিক। বেশি দেরিও নাই। বিয়ের বাদবাকি আনুষ্ঠানিকতা পরীক্ষার পড়ে করলে খুব কি অসুবিধা হবে? আমি অবশ্য সিদ্ধান্ত দেওয়ার কেউ নই। আপনারা, মুরুব্বিরা ভেবেচিন্তে যেটা হয় করবেন।’ তারপর তাহেরা খাতুনের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘নানি, আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন, ততোদিন কোনোভাবেই আপনাদের ডিস্টার্ব করার জন্য আমি ওর কাছে যাবো না। ও মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করতে পারবে। অধিকন্তু ওর হাতখরচের সুবিধার জন্য, যে বেতন পাই, তার অর্ধেকটা ওর কাছে পাঠিয়ে দেবো।’ দরিয়া যেন খুব চিন্তিত হয়েছে এমনভাবে বলে, ‘আর লেখাপড়া শেষ হওয়ার পর?’ নাসিম বলে, ‘লেখাপড়া? সবে তো গ্র্যাজুয়েশন। ও চাইলে সেটা মাস্টার্সেও গড়াবে। তবে, খালা, তোমরা দুশ্চিন্তা করো না, এসব শেষ হলে, সবটাই তুলে দেবো ওর হাতে। পারলে সংসার চালাবে। না পারলে না খেয়ে থাকবে।’ সবাই হাসতে থাকে একথা শুনে।
তাই, ফেরদৌসী ভাবে, লেখাপড়া যা হওয়ার হবে, কিন্তু জীবনে-সমাজে-সংসারে নিজের জায়গাটা চিনে নেওয়ার কথাটাই জুড়ে থাকে তার সারা মন।