মুরতজা আলী: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৮৯৪ সালে, কাঁচড়াপাড়ার কাছে মামাবাড়ি মুরাতিপুর গ্রামে (অবিভক্ত বাংলার যশোহর জেলায়)। তাঁর পিতা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়, মাতা মৃণালিনী দেবী। বিভূতিভূষণ পিতামাতার জ্যেষ্ঠ সন্তান। মহানন্দর দুই পক্ষ – প্রথম স্ত্রী হেমাঙ্গিনী, দ্বিতীয় স্ত্রী মৃণালিনী। নিঃসন্তান হওয়ায় সন্তানলাভের আশায় মহানন্দ প্রথম স্ত্রী হেমাঙ্গিনীর আগ্রহ ও সম্মতিতে দ্বিতীয় বিবাহ করেন। বলা বাহুল্য, দ্বিতীয় স্ত্রী মৃণালিনী দেবী বিভূতিভূষণের মাতা।
বিভূতিভূষণ নিতান্ত দরিদ্রঘরের সন্তান। পিতা মহানন্দর পেশা ছিল কথকতা। গলা ভালো ছিল, নিজে গান লিখে সেই গান দরাজ গলায় গাইতেন ও তার সুরে নিজে যেমন আনন্দ পেতেন, তেমনি অপরকে বিমোহিত করতেন। বিভূতিভূষণ কি পিতার এ মিস্টিক তথা মরমিভাব ও সৃজনশীলতা লাভ করেছিলেন? সন্তান হিসেবে সেটা একদম অমূলক নয়। পিতার কবিত্বশক্তিতে হয়তো প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু যে-কথাশিল্পী বিভূতিভূষণকে আমরা জানি, যাঁর অসামান্য কৃতিত্বে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ ও সমুজ্জ্বল হয়েছে, তাঁর সঙ্গে পিতার কবিত্বগুণের সম্পর্ক সামান্যই। সৃষ্টিশীল প্রতিভা উত্তরাধিকারসূত্রে পিতা থেকে পুত্রে সঞ্চারিত হয় না, সেটা একান্তই স্বোপার্জিত বিষয়। ব্যক্তি আপনশক্তি ও ক্ষমতাবলে নিরন্তর প্রতিকূলতার সঙ্গে সংগ্রাম করে, একনিষ্ঠ সাধনার দ্বারা তা অর্জন করেন।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাকার। বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু হয়ে রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র পরবর্তী যে তিন বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা কথাসাহিত্যকে সবচেয়ে বেশি পরিপুষ্ট ও বৈচিত্র্যমণ্ডিত করেছেন, তিনি তাঁদের একজন। বিভূতিভূষণ নতুন ধারার দিশারী কি না কিংবা চিন্তাচেতনায় মৌলিক ধারার স্রষ্টা কি না, এ-বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু হৃদয়প্রধান সরস প্রকাশভঙ্গিতে তিনি অনন্য সাহিত্যরস সৃষ্টি করেছেন, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কিন্তু বিভূতি-সাহিত্যের মূল্যায়ন কিংবা শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করা এ-প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। আজ এটা প্রতিষ্ঠিত বিষয়, সুতরাং তা অনেকটা চর্বিতচর্বণ ও অপ্রাসঙ্গিক। আমাদের অনুসন্ধান অন্যত্র।
প্রথমদিকে, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির কোনো নিদর্শন আমরা পাই না। এর অনেক পরে আমরা তাঁকে সাহিত্যে আত্মনিয়োগ করতে দেখি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সাহিত্যরচনার প্রায় প্রাথমিক পর্যায়েই তিনি পথের পাঁচালীর মতো অমর উপন্যাস সৃষ্টি করে বসেন। এটি কি আকস্মিক দৈব কোনো ঘটনা, নাকি জীবনের কোনো অনিবার্য বড় ছন্দপতনের ধারাবাহিকতা ও তিক্ততার ফল, তা খুঁজে দেখা দরকার। এক্ষেত্রে প্রধান সহায়ক হতে পারে লেখকের ফেলে আসা ব্যক্তিগত জীবনবিন্যাস। বিভূতিভূষণের জীবনের অতীত ঘটনাবলির দিকে তাকালে এর সদুত্তর মিলতে পারে।
মহৎ লেখকমাত্র জীবনে কোনো অদ্ভুত অবস্থা, প্রতিকূল ও অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। কোনো বিরাট ব্যর্থতা, জীবনে কোনো ঘটে যাওয়া ট্র্যাজেডি, কোনো দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতি, যেগুলো শুধু অপূরণীয় দুঃখই বয়ে আনে। কিংবা এমন কোনো ঘটনা, যা জীবনকে প্রায় ছিন্নভিন্ন করে জীবনের গতিপ্রকৃতিই বদলে দেয় – এসবই একজন প্রকৃত লেখকের মানসভূমির ভিত্তি রচনা করে। সুন্দর, সুস্থ, সন্তোষজনক জীবন কখনো কোনো বড় লেখকের জীবন হওয়া সম্ভব নয়। ফরাসি লেখক আঁদ্রে জিদ অন্তত এভাবেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। ক্রমাগত বিফলতা, সীমাহীন তিক্ততা, একটানা বিরূপ ঘটনার মোকাবিলা করা – এসবই একজন মানুষকে ভিন্নভাবে তৈরি করে, সমাজ-সংসার থেকে আলাদা করে দেয়, তাঁর জন্য গড়ে ওঠে এক স্বতন্ত্র মানসজগৎ। আর মানসিকভাবে এমন বিচ্ছেদবিদীর্ণ না হলে, এমন সিঃসঙ্গ দ্বীপের অধিবাসী না হলে, সাহিত্যসাধনায় উত্তীর্ণ হওয়ার উপাদানই তৈরি হতে পারে না, সফলতাও অর্জন করতে পারেন না। বিভূতিভূষণের জীবনে বিচ্ছিন্নতার এমন উপাদান তৈরি হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বড় লেখক, মহৎ রসস্রষ্টা। তাঁর জীবনবোধ, তাঁর বৈশিষ্ট্য, তাঁর উচ্চতা-সীমাবদ্ধতা, কোনো কিছুই বাংলা সাহিত্যে কম আলোচিত বিষয় নয়। কিন্তু বিভূতিভূষণের এই একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়, বিচ্ছিন্ন বিবিক্ত অন্তর্লোকের আলো-আঁধারি অদ্যাবধি তেমন আলোচনায় আসেনি। অথচ বিভূতিভূষণের মানসসন্ধানে, তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় এটি জরুরি বলে আমি মনে করি। সাধারণ স্বাভাবিক মানুষের মতো বিভূতিভূষণের প্রথমদিকের জীবন ছিল বৈচিত্র্যবর্জিত, গতানুগতিক। আর দশজন বাঙালি ছেলের মতো লেখাপড়া শেখা, চাকরি-বাকরি করে জীবিকা অর্জন করা, সংসারী হওয়া – এই চেনা ছকে বাঁধা ছিল তাঁর জীবন। লেখক হওয়ার পূর্বপ্রস্তুতি কি তাঁর জীবনে আদৌ লক্ষ করা যায়? এর সহজ জবাব – মোটেও না। সোনারপুর হরিনাভিতে অ্যাংলো সংস্কৃত ইনস্টিটিউশনের সহকারী শিক্ষক থাকাকালে তিনি যে ‘উপেক্ষিতা’ গল্পটি লিখেছিলেন, (যা প্রবাসীতে প্রকাশিত হয়) সেটি নিজের তাগিদে নয়, এক ছাত্রের অপপ্রচার (!) থেকে আত্মরক্ষার জন্য মাত্র। পাঁচুগোপাল নামে ওই ছাত্র (পাঁচুগোপাল বালক কবিও বটে) একদিন বিভূতিভূষণের কাছে তাঁর উপন্যাস প্রকাশ নিয়ে আলোচনা করে, পরে বিভূতিভূষণের অনুমতি না নিয়েই তাঁর অজ্ঞাতে স্কুলের নোটিশবোর্ডে, দেয়ালে, নারকেল গাছে বিভূতিভূষণের আসন্ন উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার বিজ্ঞাপন দিয়ে বসে। বিভূতিভূষণ স্বভাবত বিব্রত – কোনোদিন এক লাইন না লিখেও তাঁর উপন্যাস প্রকাশের অদ্ভুত প্রচার।
পাঁচুগোপালকে ডেকে স্নেহভরে বকুনি দিলেন বটে, কিন্তু তাতে প্রচার তো আটকে থাকল না। এখন কী করবেন বিভূতিভূষণ? ‘জীবনে কখনও গল্প লিখিনি, কি করে লিখতে হয় তাও জানা নেই।’ মরিয়া হয়ে লাজুক, অপ্রস্তুত বিভূতিভূষণ লোকলজ্জার হাত থেকে বাঁচতে কোনোরকমে ‘উপেক্ষিতা’ নামে একটা গল্প লিখে ফেললেন, ভাবটা এমন – খাতায় তো তবু একটা লেখা থাকুক। ‘লোকে যদি দেখতে চায়, খাতাখানা দেখিয়ে বলা যাবে আমার তো লেখা রয়েছেই, ছাপা না হলে আমি কি করব।’
প্ররোচিত হয়ে লিখতে বাধ্য হয়েছেন বটে, কিন্তু লেখার প্রেরণা তথা শক্তি তো বিভূতিভূষণের ব্যক্তিগত, পাঁচুগোপালের ধার দেওয়া নয়। এই শক্তি, লেখার জন্য দরকার যে আর্টিস্টিক ডিটাচমেন্ট, তা না থাকলে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের মতো মনস্বীর প্রশংসা পেত না আনকোরা নতুন ‘উপেক্ষিতা’ গল্পটি। কিন্তু এই নৈর্ব্যক্তিকতা তথা শৈল্পিক শক্তি, আঘাতে বিপর্যয়ে যার সার্থক প্রকাশ ঘটে, তা এলো কোথা থেকে? সেই যে সবাই জানে, ‘crisis brings out the real worth of a man’ – সেই crisis-এর উৎস কোথায়, কোথা থেকে এলো? আমরা খুব সচেতনভাবে তা খুঁজে দেখব।
বিভূতিভূষণের প্রথম জীবন নিতান্ত সাধারণ, সাদামাটা। বিভিন্ন স্থানে পাঠশালার প্রাথমিক পাঠ শেষ করে বিভূতিভূষণ বনগ্রাম ইংরেজি হাইস্কুলে পড়তে গেলেন। এখান থেকে ১৯১৪ সালে তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। পড়াটা হয় প্রধান শিক্ষক চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কৃপা ও বদান্যতায় – দরিদ্র বিভূতিভূষণকে বিনাবেতনে পড়ার সুযোগ করে দেন তিনি। কিন্তু ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফরম পূরণের কি হবে? উপায় না থাকায় শেষমেশ মায়ের কোমরের রুপার বিছা বেচে টাকার জোগাড় করতে হলো। এরপর কলকাতায় রিপন কলেজে। কিন্তু এবার টাকা কে দেবে? ছোটমামা বসন্তকুমারের অর্থসাহায্যে কলেজে ভর্তি হলেন। এই মামা পরেও সাহায্য করেছেন। তবে টিউশনি করে প্রধানত সব চলতো। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রও অর্থ দিয়ে মাঝেমধ্যে সাহায্য করেছেন। ১৯১৬ সালে বিভূতিভূষণ এ-কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। পরে ওই কলেজেই বি.এ ক্লাসে ভর্তি হন। কিন্তু অর্থাভাব কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না, কলকাতায় থেকে পড়া চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। বিভূতিভূষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কী করবেন, স্থির করতে পারছেন না। কিন্তু মানুষের জীবন তো থেমে থাকে না, উপায় একটা হয়ই, হলোও শেষমেষ। উপায়টা একটু বিচিত্রধরনের।
বিবাহ ঠিক হলো। পড়ার খরচ জোগাবেন – এই শর্তে বিভূতিভূষণের বিবাহ ঠিক হলো। কনে চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার পানিতর গ্রামের জমিদার তথা মোক্তার কালীভূষণ মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে গৌরী। পানিতর কোনো অচেনা গ্রাম নয়, তাঁর পূর্বপুরুষদের আবাসস্থল এ-গ্রাম। পিতামহ তারিণীচরণ এই পানিতর গ্রাম থেকে একদিন যশোরের বর্তমান বারাকপুরে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন। যাই হোক, তেইশ বছরের যুবক বিভূতিভূষণের বিবাহ মোটেও শুধু বিবাহের জন্য নয়। উদ্দেশ্য সর্বতোভাবে আর্থিক, অর্থাভাবই মুখ্য। বি.এ পরিক্ষার্থী বিভূতিভূষণ পরবর্তীকালে নিজে সে-কথা প্রকাশ করেছেন, ‘গৌরীর সঙ্গে যখন আমার বিয়ে হলো, তখন গৌরী কেমন দেখতে ইত্যাদি কোন কথাই আমার মনে উদয় হয়নি, শুধুমাত্র তারা আমায় পড়াবেন, ব্যস এতেই আমি রাজী হয়েছিলাম।’
অর্থের প্রয়োজনে এমন অনিশ্চিত বিয়ে হলেও বিয়েটা কি তাঁর মনঃপুত হয়েছিল? দাম্পত্যজীবন কি সুখের হয়েছিল? পরে আমরা দেখতে পাই, আশা না করেও ভাগ্যক্রমে অনেক কিছু পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি। চৌদ্দ বছরের কিশোরী গৌরী গৌরবর্ণা ছিলেন, সুন্দরী ছিলেন। সুশ্রী স্বল্পবুদ্ধি কিশোরী সংস্কৃতিমনাও কম ছিলেন না। বই পড়তে ভালোবাসতেন, গান শুনে আনন্দ পেতেন। বলা নিষ্প্রয়োজন, বিভূতিভূষণ নিজে গান-গল্প-কবিতার সমঝদার। তাই কলকাতা থেকে কিশোরী স্ত্রীর জন্য নিয়ে যেতেন রবীন্দ্র কাব্য, গল্পের বই ইত্যাদি আনন্দের নানা উপকরণ। গানে যে বিভোর হতেন গৌরী, সে-কথা বিভূতিভূষণকে নিজেই বলেছেন। গৌরীর মৃত্যুর অনেক পরে, গত শতাব্দীর তিনের দশকের মাঝখানে একবার শ্বশুরবাড়ি বসিরহাট গিয়েছিলেন বিভূতিভূষণ। সেখানে তাঁর বেদানাবিধুর স্মৃতিচারণ, ‘‘বাঁধানো জেটির ঘাটে বসে রাঙা রোদ মাখানো ইছামতীর ওপারে দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে হয়েছিল, এই স্থানটিতে দাঁড়িয়ে একদিন গৌরী বলেছিল, ‘গাড়িতে কেমন কলের গান হচ্ছিল, শুনছিলাম মজা করে’।’’
ধনীর মেয়ে গৌরী দেমাকী ছিলেন না; স্বামীর দারিদ্র্য, দীনতাকে অবলীলায় মেনে নিয়েছিলেন। একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। এমন হীনদশা যে, বিভূতিভূষণরা শুধু দরিদ্র নন, গ্রামের বাড়ি বারাকপুরে তাঁদের শোবার ঘর ছিল মাত্র একটি। সুতরাং যা হতো, গৌরী থাকতে বিভূতিভূষণ বাড়ি এলে রাতে মা মৃণালিনীকে পাশের সইবাড়িতে গিয়ে ঘুমাতে হতো। গৌরী কি কখনো এতে অপ্রস্তুত হয়েছেন, অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন? বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনো জীবনীগ্রন্থে কিংবা তাঁর নিজের ভাষ্যে এর কোনো পরিচয় নেই। বরং সত্য হলো, গৌরী আপন মহিমাবলে সব অনায়াসে হাসিমুখে জয় করে নিয়েছিলেন, স্বামীর সব সীমাবদ্ধতাকে গ্রহণ করেছিলেন স্বাভাবিকভাবে।
এ তো গেল গৌরীর রূপগুণের কথা, সারল্যের কথা। মোক্তারকন্যা গৌরী অল্প সময়ে ভালোবাসা দিয়ে স্বামীকে কতটা আপন করে নিয়েছিলেন? সে-কালে এ-কালের মতো ফোন-মোবাইলে যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল না, চিঠিই ছিল ভাববিনিময়ের একমাত্র মাধ্যম। গৌরী চিঠি লিখতেন স্বামীকে, সেসব চিঠিতে কতটা ভালোবাসা আর অনুরাগের উত্তাপ ছড়িয়ে আছে, দেখা যেতে পারে। বলতে দ্বিধা নেই, সেসব চিঠি ভালোবাসা আর ব্যাকুলতায় ভরা। একটা চিঠির কথা ধরা যাক। গৌরী চমৎকার কাগজে লিখতেন, চিঠির কাগজেই যেন উষ্ণতার হাতছানি, প্রতীকী ভালোবাসার প্রকাশ কাগজের বিবরণে লক্ষণীয়। খুব পাতলা পাজির কাগজের মতো সাদা প্যাডের কাগজ, তার ওপর একটা ডানা মেলে উড়ে যাওয়া পাখির ছাপ, আর তার নিচে লেখা, ‘যাও পাখি বল তারে। সে যেন ভোলে না মোরে।’ তারপর সে-চিঠিতে গৌরীর নিবেদন, ‘শ্রীচরণকমলেষু, আপনাকে অনেকদিন দেখিনি। আপনাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আপনি এসে মাকে যেন বলবেন না যে আপনাকে আমি চিঠি লিখেছি। আপনি বলবেন, আমি নিজেই এসেছি। গুরুজনদের প্রণাম। ছোটদের আশীর্বাদ। ইতি গৌরী।’
কি আকুলতাভরা নিটোল পত্রাঘাত! নববিবাহিত এক যৌবনদীপ্ত নারীর হৃদয়ের কামনাবাসনা এর ক’টিমাত্র ছত্রেই যেন উপচে পড়ছে – প্রিয়তম মানুষের জন্য আত্মনিবেদনের আকাঙ্ক্ষা এর বর্ণে বর্ণে যেন আকুলবিকুলি করে ফুটছে।
অথচ সতর্কতাও কম নয়, রক্ষণশীল মূল্যবোধের জন্য প্রেমময়ী সে-নারীর অন্যের কাছ থেকে নিজেকে লুকাবার প্রয়াস সমান সক্রিয়। লক্ষণীয়, স্বামীকে গৌরী এ-কালের মতো ‘তুমি’ নয়, ‘আপনি’ বলছেন। তার ওপর স্ত্রীর পক্ষে, সে-পরিবেশে সরাসরি আসার আহ্বান জানানা তো আরো গর্হিত, নিন্দনীয় কাজ। সতর্কতা হিসেবে তিনি তাই স্বামীকে এ-সত্য গোপন রাখার কথা বলেছেন।
সব মিলে আমরা বুঝতে পারি, গৌরীকে নিয়ে বিভূতিভূষণ সুখী ছিলেন, পরিতৃপ্ত ছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এ-সুখ স্থায়ী হয়নি, গৌরীর ভালোবাসাও বেশিদিন টেকেনি। বিবাহের মাত্র এক বছর তিন মাসের মাথায় গৌরী মৃত্যুবরণ করেন। পিত্রালয়ে তাঁর মৃত্যুর তারিখটি ১৩২৬ সনের ৬ই অগ্রহায়ণ (ইংরেজি ১৯১৮ সাল)। মৃত্যুর কারণ সম্ভবত কলেরা। গৌরীর মাতাও একইসঙ্গে কলেরায় মারা যান।
গৌরীর মৃত্যু বিভূতিভূষণের জীবনে কি পরিবর্তন এনেছিল, তা ভালোভাবে অনুসন্ধান করে দেখা যাক। মাত্র পনেরো মাসের দাম্পত্যজীবনে গৌরী এমন একটা স্থান অধিকার করেছিলেন, বিভূতিভূষণের অস্তিত্বে এমন অনপনেয় ছাপ রেখে গিয়েছিলেন, যা কোনোকালে কোনো কিছুতে পূরণ হওয়ার নয়। আমরা একে একে এর সপক্ষে ঘটনা সন্নিবেশিত করার চেষ্টা করবো। গৌরীর অসুস্থতার সংবাদ শুনে (টেলিগ্রামে সংবাদ পেতে বেশ দেরি হয়েছিল) বিভূতিভূষণ পানিতর গ্রামের উদ্দেশে রওনা হলেন। পৌঁছাতেও বিলম্ব হলো, বাড়ির নিকট গিয়ে ভগ্নহৃদয়ে শুনলেন সব – গৌরী মারা গেছেন এবং তাঁর সৎকারও হয়ে গেছে। বিভূতিভূষণ এমন অযাচিত দুঃসংবাদে স্তব্ধ হয়ে গেলেন, বিভ্রান্ত মানুষটি আর অগ্রসর হলেন না, শ্বশুরবাড়ি প্রবেশ না করে ফিরে এলেন। প্রকৃত অবস্থাটা বিভূতিভূষণের কনিষ্ঠ ভ্রাতা নুটুবিহারী বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী যমুনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে শোনা যাক, ‘ওদের বাড়িতে কলেরা দেখা দেয়, পাঁচজনের কলেরা হয়। গৌরীদির মা ও গৌরীদি দু’জনে কলেরাতেই মারা যান। অতর্কিত আঘাতের জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। শ্বশুরবাড়ি না ঢুকেই তিনি উদ্ভ্রান্তের মত বাড়ি ফিরে এলেন। মা উৎকণ্ঠিত হয়ে অপেক্ষা করছিলেন, বাড়ি আসতেই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘খোকা, বৌমা কেমন আছে?’ … একটু ম্লান হেসে বলেছিলেন, ‘গৌরী মারা গেছে মা।’’
অসহনীয় আঘাত নিঃসন্দেহে কিন্তু প্রকাশ সংযত – অধিক শোকে যেন পাথর। এই বিয়োগব্যথা শুধু রক্তাক্ত করেনি, হৃদয়কে দুমড়েমুচড়ে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। জীবনকে আর ভালো লাগে না, জীবন কিছুতেই কাছে টানতে পারে না। গৌরীর সান্নিধ্যে
যে-জীবন সহসাই সুন্দর, সুরভিত হয়ে উঠেছিল, ঝড়ের এক ঝটকায় সব লুটিয়ে পড়লো। গৌরীর মৃত্যুর মাত্র দু-মাসের মাথায় আমরা তাঁর রক্তাক্ত হৃদয়ের আর্তনাদ শুনতে পাই, ‘… ১৯১৯ সালের জানুয়ারী মাসে আমার জীবনে বড় শোকাবহ দুর্দিন – হাতে নেই পয়সা, মনেও যথেষ্ট অবসাদ ও হতাশা। গৌরী সেবার মারা গিয়েছে।’
অন্তরঙ্গ বন্ধু নীরদ সি চৌধুরীও তাঁর শোকাচ্ছন্নতা লক্ষ করেছিলেন। নীরদ চৌধুরীর দাই হ্যান্ড, গেট অ্যানার্ক নামক আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে তার স্বাক্ষর আছে, ‘ছাত্রাবস্থায় এবং স্ত্রীবিয়োগের পর যে জীবনের কথা বলিতেন, তাহাতে আমি অতি বিপন্ন বোধ করিতাম।’ একই গ্রন্থে অন্যত্র, ‘সর্বোপরি ছিল তাহার শোকের তিক্ততা। তিনি আমাকে বলিয়াছিলেন কীভাবে তিনি তাহার বিষণ্ন ঘরটিতে বসিয়া থাকিতেন মৃদু তৈলপ্রদীপের আলোকে, কলিকাতা হইতে আগত শেষ ট্রেনের বাঁশি মনে করাইয়া দিত যে ঘুমাইবার সময় হইয়াছে। স্ত্রীর মৃত্যু তাঁহাকে তেইশ বৎসর বিবাহ করিতে দেয় নাই।’
বিভূতিভূষণের নিজের জবানীতেও ঘুরেফিরে গৌরীপ্রসঙ্গ। ‘উৎকর্ণ’ দিনলিপিতে এরকম, ‘তারপর বহুকাল কেটে গেল। আর তেমন কোন দিনের কথা আমার মনে হয় না। এল গৌরী, ওকে বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে প্রথম যখন বারাকপুরে আনলুম, আষাঢ় ও প্রথম শ্রাবণের সেই দিনগুলির কথা … রজনীকাকার সঙ্গে তাস খেলতে খেলতে সেই অধীরভাবে সন্ধ্যার প্রতীক্ষা, টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে বাঁশবনে, মাটির প্রদীপের আলোয় আমি ও গৌরী, তখন সে মাত্র চোদ্দ বছরের বালিকা – এ ছবিটি, দিনের আশাআকাঙ্ক্ষাগুলি চিরদিন-চিরদিন মনে থাকবে।
সে চলে গেল। দিনগুলি নিরানন্দময় হয়ে গেল, আশা নেই, আকাক্সক্ষা নেই। প্রহরগুলি মৃত।’
অকাল পত্নীবিয়োগ বিভূতিভূষণের জীবনে নানা পরিবর্তন আনে। তিনি অতিমাত্রায় আধ্যাত্মিক হয়ে ওঠেন, আত্মার অনুসন্ধানে আত্মনিয়োগ করেন। সাতচল্লিশ বছর বয়সে তিনি যে কল্যাণীকে দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন (এ-বিয়েতে গৌরীর ছায়া কম কাজ করেনি, সেটা পরে উল্লেখ করবো।), সেখানেও রয়েছে আধ্যাত্মিকতার ইতিহাস। কল্যাণীর বাবা, তাঁর হবু শ্বশুর ষোড়শীকান্ত ছিলেন ‘ভৈরবীর কাছে দীক্ষা নেওয়া তান্ত্রিক, পরলোকতত্ত্বে তাঁর অবিচল বিশ্বাস।’ আমরা জানি, প্রয়াত গৌরী বিভূতিভূষণকেও অন্ধভাবে প্রেততত্ত্বে তথা পরলোকতত্ত্বে বিশ্বাসী করে তুলেছিলেন। ফলে ষোড়শীকান্ত ও কল্যাণীসহ তাঁর পরিবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল নানামুখী। গৌরীর নিরবচ্ছিন্ন বিয়োগব্যথা তো পরলোকতত্ত্বে ছিলই। তীব্র এ-বিয়োগব্যথা তাঁকে উদাসীন করেছিল, উন্মনা করেছিল। ভিড়, কোলাহল ভালো লাগে না, ভালো লাগে না মানুষের নৈকট্য, সংস্রব। নির্জনে, একাকিত্বে অবগাহন করে মনের ব্যথাকে সর্বদা প্রশমিত করার প্রয়াস। সে-প্রয়াসেই, ‘এভাবে একা একা হাঁটার সময়ই বিভূতিভূষণ একদিন টালিগঞ্জ খালের পুলটা পেরিয়ে পুঁটিয়ারির দিকে হাঁটতে হাঁটতে এক সন্ন্যাসীর সাক্ষাৎ পান। পরপর ক’দিন সন্ন্যাসীর কাছে গিয়ে একদিন বলে ফেললেন, আমি গৌরীকে দেখতে চাই।’
সন্ন্যাসী তাঁকে বললেন, তার একমাত্র পন্থা মণ্ডল – অর্থাৎ প্ল্যানচেটে আত্মঅবগাহন। সন্ন্যাসী তাঁকে প্লানচেটে আত্মা আনয়ন পদ্ধতি শিক্ষা দিলেন।’ (বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়, সুব্রত বড়ুয়া)।
নীরদ চৌধুরীর উক্তি যথার্থ, ‘… পরলোকে বিশ্বাস তাঁহার বিশ্বাস নয়, কুসংস্কার হইয়া উঠিয়াছিল।’ অনুপস্থিত, অদৃশ্য গৌরী তাঁকে কেবল তাড়িয়ে বেড়াচ্ছেন, অস্থির করে তুলছেন। বিভূতিভূষণের এই দহনে, মানসিক নৈরাজ্যে শুভাকাক্সক্ষী বন্ধুরা উদ্বিগ্ন, চিন্তিত। তাঁরা চান, তিনি আবার দার পরিগ্রহ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুন, সুস্থ জীবনযাপন করুন। কিন্তু গৌরীকে ছেড়ে তিনি কি করে আবার বিবাহ করবেন, অন্য নারীকে ভালোবাসবেন? গৌরী ইহলোকে নেই সত্য, কিন্তু মনে? মনে তো গৌরীর সর্বক্ষণ
আসা-যাওয়া, অন্য কোনো নারী কি করে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন? নীরদ চৌধুরীর দাই হ্যান্ড, গ্রেট অ্যানার্ক গ্রন্থে তার যথার্থ ভাষ্য ও প্রতিফলন, ‘… আমি ও অন্যান্য বন্ধুরা বারবার তাঁহাকে পুনরায় বিবাহ করিয়া স্থিত হইতে বলিতাম, সম্বন্ধও আনিতাম। তিনি আগ্রহভরে সব দেখিতেন, পাত্রী দেখিতেও যাইতেন। একদুইবার কথা অগ্রসরও হইয়াছিল। কিন্তু শেষে তিনি এড়াইয়া যাইতেন। আমি তিনবার তাঁহার সহিত পাত্রী দেখিতে গিয়াছিলাম।’
সুতরাং স্পষ্ট, গৌরী কেবল একা মরেননি, ভালোবাসার স্বামীকেও মেরে রেখে গেছেন। তখন কেবল না পাওয়ার বেদনা, না থাকার হা-হুতাশ। দিক্ভ্রান্ত হয়ে এলোমেলো ছুটে চলার সেই শুরু বিভূতিভূষণের জীবনে – তাতে কোনো কমতি নেই, নেই কোনো অবসান। গৌরীর অবর্তমানে অন্তহীন হাহাকার যেমন পিছু ছাড়ছে না, তেমনি ছাড়ছে না চরম দারিদ্র্যও। অগত্যা বাঁচার তাগিদে মাত্র পঞ্চাশ টাকা বেতনের চাকরি নিলেন হুগলির জাঙ্গিপাড়ায় দ্বারকানাথ হাইস্কুলে। পদটা সহকারী প্রধান শিক্ষকের, মোটামুটি সম্মানজনক পদ। কিন্তু বিভূতিভূষণ এক বছর ক’মাসের বেশি টিকতে পারলেন না জাঙ্গিপাড়ায়, চাকরিতে ইস্তফা দিলেন। নতুন প্রধান শিক্ষক হিসেবে রাজকুমার ভড় নির্বাচিত হওয়ায় বিভূতিভূষণের পদাবনত হলো, সহকারী প্রধান শিক্ষক থেকে এখন সাধারণ শিক্ষক। চাকরির এ-গ্লানি, পদাবনতির অপমান তিনি মেনে নিতে পারেননি; কিন্তু এতে গৌরীর অনুপস্থিতি কি কোনো ভূমিকা রাখেনি? রেখেছে বইকি। ‘হেথা নয়, হোথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে।’ জীবিত গৌরীর চেয়ে মৃত গৌরী মোটেও কম শক্তিশালী নন। গৌরী তাই তাঁর সঙ্গে সঙ্গে যেমন আছেন, তেমনি গৌরীর চিরবিদায় তাঁকে কিছুতেই একস্থানে স্থিত হতে দিচ্ছে না।
জীবিকার প্রয়োজনে আবার শিক্ষকতা – এবার সোনারপুর হরিনাভির সেই বিখ্যাত স্কুলে। সহকারী শিক্ষক হিসেবে এখানে একটু বেশিদিন টিকলেন বিভূতিভূষণ – ১৯২০-এর জুন থেকে ১৯২২-এর জুলাই পর্যন্ত, দুই বছর এক মাস। কিন্তু এ-স্কুল থেকেও তিনি সরে এলেন ব্যক্তিগত একটা স্পর্শকাতর কারণে। স্মরণীয়, এখানেও গৌরীর উপস্থিতি স্পষ্ট। হরিনাভির একটা ব্রাহ্মণ পরিবারে তাঁর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল। এই পরিবারেরই একজন কিশোরীকন্যা তাঁর প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দেখানো শুরু করলো। বিভূতিভূষণ স্কুলে থাকাকালে মেয়েটি তাঁর জামাকাপড় গুছিয়ে রাখে, বিছানা পরিপাটি করে রাখে, ঘরদোর সুচারুরূপে পরিষ্কার করে। মেয়েটি আবার ধীরে ধীরে তাঁকে চিঠি লেখাও শুরু করলো – যার সুর শুধু আত্মনিবেদনের, আকুলতার, শুধু সেবা করার।
অন্যকথায় প্রচ্ছন্নভাবে প্রেম নিবেদনের আভাস। প্রমাদ গুনলেন বিভূতিভূষণ, অপ্রস্তুতও হলেন হয়তো। ঘটনা যাতে আরো জটিলতার দিকে না গড়ায়, সেজন্য বিভূতিভূষণ চাকরি ছাড়ার সিদ্বান্ত নিলেন। এখানেও কি গৌরীকে খুঁজে পাওয়া যাবে না? গৌরীই যেহেতু তাঁর ধ্যানজ্ঞান, আরাধ্য দেবী, সেখানে অন্য মেয়ের স্থান হওয়া তো সম্ভব নয়। হয়ওনি।
ফুলি নামে ওই কিশোরীকন্যা বিভূতিভূষণের জামার পকেটে বাসি ফুলের পাপড়িতে ঢাকা কিছু চিঠিও আবিষ্কার করেছিল। বলা বাহুল্য, সে-চিঠি গৌরীর। মৃত্যুর তিন বছর পরও যাঁর হৃদয়ে গৌরী, পকেটে সযত্নে রাখা গৌরীর চিঠি, তিনি কি করে অন্য নারীর আহ্বানে সাড়া দেবেন? সুতরাং পদত্যাগের সহজ সমাধান বেছে নিলেন, ওই কিশোরীর সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন।
ফুলি ছাড়া আর কি কোনো নারী বিভূতিভূষণের জীবনে পদার্পণ করেননি?
বিভূতিভূষণের জীবনে আমরা আরো তিনজন নারীর সন্ধান পাই – প্রীতিলতা ওরফে খুকু, সুপ্রভা দত্ত ও কল্যাণী ওরফে রমা। এঁদের ওপর আমরা পর্যায়ক্রমে আলোকপাত করার চেষ্টা করবো।
খুকু জন্মভূমি বারাকপুরের মেয়ে, বিভূতিভূষণের প্রতিবেশী ও হাইস্কুলে তাঁর শিক্ষক যুগল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেয়ে। দশ-এগারো বছরের কিশোরী খুকুর সঙ্গে প্রথম তাঁর পরিচয়, পরে খুকু ষোড়শী তরুণীতে উপনীত। স্লেট-পেনসিল নিয়ে পড়তে আসা খুকুকে তিনি একসময় মেটে প্রদীপের আলোয় একা একা পড়াতেন, আর নিজে লিখতেন দৃষ্টিপ্রদীপ উপন্যাস। খুকু সুন্দরী, সেবাময়ী, অকপট, সরলপ্রাণ। নীরদপত্নী অমিয়া চৌধুরীর কলমের এক আঁচড়ে খুকু এভাবেই উদ্ভাসিত। বিভূতিভূষণ তাঁকে নিয়ে একদিন নীরদ চৌধুরীর বাসায় গেলে অমিয়া, ‘বন্ধুপত্নী অমিয়া মুগ্ধদৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন খুকুকে। এই সেই খুকু। নিটোল স্বাস্থ্য, দোহারা গড়ন, মাজা রঙ। চোখেমুখে গ্রাম্য সরলতার ছাপ, পরনে লালপেড়ে টিয়ারঙ শাড়ি। হাতে বেলোয়ারি বালা। খালি পা ধুলোমাখা।’ (কিশলয় ঠাকুরের বিভূতি-জীবনী)।
চেহারাই শুধু সুন্দর নয় খুকুর, সেবায়ও সুন্দর, অনন্যা। চা করে দেন, বাড়ি থেকে মাংস রান্না করে আনেন, রান্না ডাল এনে দেন। রান্নায় কাঁচা নিঃসঙ্গ বিভূতিভূষণকে বলতে গেলে নানাভাবে সাহায্য করেন। সংস্কৃতিমনাও কম নয় মেয়েটা। সুপ্রভাকে লেখা চিঠিতে বিভূতিভূষণ, ‘তাকে বই পড়ে শোনাই, আমার কাছ থেকে বই পত্রিকা নিয়ে পড়ে। তারও নিঃসঙ্গ জীবন, সে একটু অন্যধরনের মেয়ে, পাড়াগাঁয়ের পাঁচজন মেয়ের মত নয়।’
তবু খুকু নারী, একদিন উদ্ভিন্নযৌবনা ষোড়শী, তাঁরও চাওয়া-পাওয়া আছে, হৃদয় আছে, আকাঙ্ক্ষা আছে। ওই চিঠিতেই জানতে পারছি খুকুর মাধুর্য ও নারীত্বের বাঁকবদলের ইঙ্গিতও, ‘পাড়ায় এখন কেউ নেই, … খুকু আছে, তাও রক্ষে। খুকু আজকাল বড় হয়েছে, যখন তখন আগের মত আসতে পারে না, পাড়াগাঁয়ের ব্যাপার তো জান। তবু সে সময় পেলেই আসে, গল্প করে, চা করে দেয় … নানা ছলছুতায় সে আসে – তাও বুঝতে আমার দেরি হয় না।’
একজন যুবক পুরুষের কাছে নারীরহস্য কি করে অনুদ্ঘাটিত থাকবে? বিভূতিভূষণ যেমন নিজের মনের স্পন্দন অনুভব করেন, তেমনি খুকুর নারীহৃদয়ের আলোড়নও কম উপলব্ধি করেন না। ১৯৩৪ সালের ১০ই জুন লেখা দিনলিপিতে তার খোলাখুলি সমর্থন আছে, ‘খুকুর সঙ্গে সন্ধেবেলা কত কথা হোল। আমি বললুম, তুই বাড়ুজ্যে না হলে তোকে বিয়ে করতুম। ও হাসলে – বললে, আপনি চলে গেলে আমার মন পালাই পালাই হবে।’
পরে দেখতে পাই, খুকুকে খুকুর মায়ের সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় বেড়াতে যান বিভূতিভূষণ। নানা দর্শনীয় স্থান দেখান, সঙ্গে সিনেমাও বাদ যায় না। আরো বিশেষভাবে লক্ষণীয়, খুকুর ইচ্ছেয় পরদিন একা তরুণী খুকুকে নিয়ে আবার কলকাতায় গমন (সেদিন তারা নীরদ চৌধুরীর বাসায় উঠেছিলেন)। বলা নিষ্প্রয়োজন, এতে তাঁদের মানুষী দুর্বলতা ও পারস্পরিক আকর্ষণের বিষয় গোপন থাকেনি।
বিয়ে তবু হয়নি, বিভূতিভূষণ খুকুকে বরণ করে নিতে পারেননি। এখানেও পুরনো সমস্যা, দুজনের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছিলেন গৌরী, সেই অদৃশ্য, শক্তিমান, অবিনশ্বর গৌরী। খুকুর শেষমেশ অন্যত্র বিয়ে হলো (যে-বিয়েতে তিনি খুকুর বাবাকে পাঁচশো টাকা দিয়ে সাহায্যও করেছিলেন)। বিভূতিভূষণ কি আন্দোলিত না হয়ে সানন্দে সে-বিয়েকে স্বাগত জানাতে পেরেছিলেন? সন্ধের পর বিয়েতে অনেকটা দেরি করে আসায় ও পরে সবার অজ্ঞাতে অসময়ে রাত তিনটেয় কলকাতা প্রস্থানে তা মনে হয় না। বরং সত্য হলো, খুকুকে গ্রহণ করেননি ঠিক, অকাতরে তা মেনেও নিতে পারেননি – মনে মনে বিপর্যস্ত হয়েছেন। মানুষ হিসেবে এ-আত্মদ্বন্দ্ব স্বাভাবিক। পরে খুকুকে চাঁদের পাহাড় উৎসর্গ করার মধ্য দিয়ে সে কর্তব্যবোধ ও দ্বন্দ্ব একসঙ্গে ফুটে উঠেছে।
এ-সংকট সুপ্রভার ক্ষেত্রেও লক্ষ করা যায়। সুপ্রভা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী, সিলেটের সুনামগেঞ্জর মিরাশী গ্রামের ধনী পরিবারের মেয়ে। আর একটা পরিচয়, তিনি নীরদ-স্ত্রী অমিয়া চৌধুরীর ব্রাহ্ম গার্লস স্কুলের সহপাঠী। সুপ্রভা শিক্ষিতা, সুসংস্কৃতা, সাহিত্যবোদ্ধা, নিজে কবিও। সুপ্রভার হাতে লেখা নির্ঝর পত্রিকা প্রকাশের সুবাদে বিভূতিভূষণের সঙ্গে যোগাযোগ। শিগগিরই দুজনের সম্পর্ক আমরা ঘনিষ্ঠ হতে দেখি। সিনেট হলে বিজ্ঞান কংগ্রেসে, আশুতোষ হলে জাপানি কবি ইয়োনে নোগুচির কবিতাপাঠ – সবখানে দুজন একত্রে উপস্থিত। সুপ্রভার আগ্রহে বিভূতিভূষণ একসঙ্গে ‘চিত্রা’ হলে মুক্তি সিনেমা দেখলেন। ঘনিষ্ঠতা না কমে বাড়তে থাকল, ‘নিজের হাতে কাজ করা একখানা রুমাল দিলেন সুপ্রভা বিভূতিকে।’ সুপ্রভা শিলংয়ে চলে গেলে বিভূতিভূষণ দেখা করতে একাধিকবার শিলং যাচ্ছেন, বেড়িয়ে আসছেন। নিয়মিত চিঠিপত্র বিনিময়ের মাধ্যমে যোগাযোগ নতুন পর্যায়ে উন্নীত হচ্ছে, বোঝাই যায়। নৈকট্য বাড়ার সুবাদে সুপ্রভা বিভূতিভূষণকে বিভিন্ন উপহার পাঠিয়ে অভিভূত করছেন। পূজার সময় পাঠানো একটা পার্সেল সম্বন্ধে বিভূতিভূষণ, ‘তোমার পার্সেলটা গত বৃহস্পতিবার হাটে পেয়েছিলুম। জিনিসগুলো ভারী চমৎকার হয়েছে … বালিশ ঢাকনিটা বেজায় সৌখিন, ও বালিশ যে কোথায় পাতবো বুঝতে পারছি না। রুমাল ভারী সুন্দর, তোমার হাতের কাজ বলে জিনিসগুলি আমার কাছে এত মূল্যবান হয়ে উঠবে যে ওসব আমি আর ব্যবহার করতে পারবো না। পাছে এটা ছিঁড়ে যায়, পাছে এটা ধোপার বাড়ি কাচতে গেলে হারিয়ে যায়। মাঝে মাঝে ব্যবহার করবো।’
সুপ্রভার অনায়াস আত্মনিবেদন, উষ্ণ সম্প্রীতি বিভূতিভূষণকেও কম আপ্লুত করছে না।
১৯৩৮ সালে সুপ্রভাক লেখা স্মরণীয় চিঠি, ‘কত লোকের অর্থাৎ কত মেয়ের সঙ্গে তো তারপর আলাপ হলো – কিন্তু তোমার সঙ্গে প্রথম আমলের যে ভালবাসা, এমনটি আর হোল কৈ আর কারো সঙ্গে? তা হয় না। একজায়গায় একবার হোলে দু’জায়গায় হয় না। আমি কথাটা এতদিন ভাল বুঝতাম না – আজকাল বুঝি।’
কিন্তু ভালোবাসার এমন অকৃত্রিম, এমন নিখাদ রূপও কি নেহায়েত বায়বীয় হয়ে থাকবে, পরিণতি প্রত্যাশা করবে না? ‘মেয়েটা সত্যি খুব ভাল। বড্ড সেবাপরায়ণা কিনা’ – বিভূতিভূষণের এমন মন্তব্যের পরও প্রশ্ন থেকে যায়। সুপ্রভা তো রক্তমাংসের মানুষ, যৌবনদীপ্ত কোমলপ্রাণ এক নারী, তাঁর কি জৈবিক চেতনা থাকতে পারে না? নারীত্বের বলিষ্ঠ দাবি নিয়ে কি বিভূতিকে নাড়া দেন না? অমিয় চৌধুরী সমস্যা ধরিয়ে দিলে বিভূতিভূষণ সংকটের মুখোমুখি হন সত্য, মানসিক দ্বন্দ্বেও পড়েন, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। বারাকপুর যার শেষ গন্তব্য, স্বপ্নের চূড়ান্ত ভবিষ্যৎ – সে তো অতি সাধারণ, স্থূল, অমার্জিত – জীবন পরিক্রমায় একঘেয়ে ও বৈচিত্র্যহীন গ্রাম – সেখানে পরিশীলিত সুপ্রভাকে অধিষ্ঠিত করবেন কি করে? ‘পারবেন না তিনিও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তীর্ণা একটি ধনীর দুলালীকে শৈলশিখরের রম্য ভিলা থেকে এই দুঃখময় জীবনের মধ্যে নামিয়ে আনতে (কিশলয় ঠাকুরের জীবনী)।’ এটাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না, সুপ্রভা কায়স্থ বলে বর্ণগত সমস্যাও প্রচ্ছন্নভাবে ক্রিয়াশীল থাকতে পারে। সবমিলে, বিভূতিভূষণ বন্ধনে শেষ পর্যন্ত জড়াতে চাননি, ‘মুক্ত মানুষই’ থাকতে চেয়েছেন, তাই থেকেছেন।
গৌরী কি এবারো কোনো ভূমিকা রাখেননি? আমার বিশ্বাস, চিরসাথি গৌরী এখানেও সক্রিয়। গৌরীই পশ্চাতে থেকে বিভূতিভূষণকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাঁর মনের ওপর কলকাঠি নাড়ছেন। সর্বগুণান্বিতা সুপ্রভার সব থেকেও সম্ভবত ছিল না গৌরীর আদল, গৌরীর প্রতিচ্ছায়া। ফলে খুকুর মতো সুপ্রভা বিভূতিভূষণকে মথিত করেও জয়ী হতে পারেননি।
এবার আমরা আবার নীরদ চৌধুরীর কাছে ফিরে যাব, ‘স্ত্রীর মৃত্যু তাঁহাকে তেইশ বৎসর বিবাহ করিতে দেয় নাই।’ গৌরীর ছায়া, গৌরীর ভালোবাসা কি তখনো তাঁকে আবিষ্ট করে রেখেছিল? বিভূতিভূষণের জীবনে এর পরিচয় আমরা শেষ পর্যন্ত পাবো। নীরদ চৌধুরীর বক্তব্যে দেখি, একাধিকবার মেয়ে দেখেও তিনি শেষ পর্যন্ত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেননি। এমন হতে পারে, গৌরীকে হারিয়ে তাঁর অসহনীয় বেদনায় কাতর হয়ে নারীর মধ্যে তিনি শুধু গৌরীর ছায়া তথা প্রতিমূর্তিই খুঁজে ফিরেছেন। আমরা পরেও দেখবো, গাঁয়ে কোনো নতুন বধূর আগমনে নদিদি বিভূতিভূষণের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি অভিন্ন কথাই বলতেন। মোটের ওপর, অন্য কারণ যাই থাক, গৌরীই সর্বত্র নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছেন, তাতে সন্দেহ নেই। খুকুর ক্ষেত্রেও তাই, সুপ্রভার ক্ষেত্রেও তাই। মানুষ হিসেবে তিনি খুব মানবিক ছিলেন, সহানুভূতিশীল ছিলেন – কর্তব্যবিমুখ হৃদয়হীন কখনো ছিলেন না। সেই কর্তব্যবোধেই খুকুকে তিনি চাঁদের পাহাড় উৎসর্গ করেছেন, সুপ্রভাকে গল্পগ্রন্থ জীবন ও মৃত্যু। কিন্তু স্থায়ীভাবে কারো সঙ্গে আবদ্ধ হননি, কষ্ট পেয়েও এড়িয়ে গেছেন।
খুকু কিংবা সুপ্রভা, কারো সান্নিধ্যই তাঁর কাছে কম মূল্যবান নয়। তাঁরা সজীবতা এনেছেন, তাঁকে নতুন জীবনদান করে ধন্য করেছেন। খুকুর বেলায় তাঁর অকপট স্বীকারোক্তি (দিনলিপি থেকে), ‘তার সাহচর্যে যে দিন কেটেছে – তার মধ্যে আমি ‘আইভান হো’ অনুবাদ করছিলুম, শিউলি গাছে ফুল ফুটত – সেই দিনগুলি, আর বনগাঁয়ে ছাদে বেড়ানোর দিনটি, আর গতবছর ছুটিতে বারাকপুরে গ্রামোফোন নিয়ে কাটানোর দিনগুলির কথা ভুললে চলবে না। চিরদিন মনে থাকবে এগুলি।’
সুপ্রভার বেলায়ও দিনলিপিতে একই সুর, ‘সুপ্রভার সঙ্গেও এমন অনেকদিন আনন্দে কেটেছে। বিশেষ করে এবার দেওঘরে ও ঈস্টারের ছুটিতে শিলং-এ বেড়াতে যাওয়ার দিনগুলি। অনেকদিনের কথা হয়তো ভুলে যাব – শিলং-এ যাপিত গত ঈস্টারের ছুটির দিনগুলির কথা চিরদিন মনে থাকবে।’
দুজনই বিভূতিভূষণকে উজ্জীবিত করে স্মৃতিতে অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন।
কিন্তু পরিণত বিভূতিভূষণকে শেষমেশ জয় করলেন জীবনের চতুর্থ নারী – রমা ওরফে কল্যাণী। রমা সেদিক থেকে ভাগ্যবানও বটে। রমা তখন সতেরো বছরের তরুণীমাত্র, বলা চলে নিতান্ত কিশোরী। আর বিভূতিভূষণ? সাতচল্লিশের পরিণত একজন মানুষ, জীবনের বহু ভাঙাগড়া পেরিয়ে এক সফল, প্রতিষ্ঠিত কথাসাহিত্যিক। বয়সে, জ্ঞানে, অভিজ্ঞতায় বিস্তর ব্যবধান সত্ত্বেও কল্যাণী তথা রমা তাঁকে জয় করলেন কি করে? এখানেও কি গৌরীর ক্যারিশমা কাজ করেছে? বাংলাদেশে বিভূতি জীবনীকার সুব্রত বড়ুয়ার মতো আমার ধারণাও তাই। সুব্রত বড়ুয়া সবদিক পরীক্ষা করেই এ-প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন, ‘… তার কারণ কি এই ছিল যে, কল্যাণীর মধ্যে তিনি গৌরীকেই আবার ফিরে পেয়েছিলেন?’
বিভূতিভূষণের জীবনকে আগাগোড়া পর্যালোচনা করলে সুব্রত বড়ুয়ার জিজ্ঞাসার জবাব খুঁজে পাওয়া যায়। একথা ঠিক, বিভূতিভূষণ অনেককিছুর মতো একথাও স্পষ্ট করে বলেননি। না বললেও, তাঁর জীবনে গৌরীর গুরুত্ব, গৌরীর প্রভাব কতখানি তা আমরা বুঝেছি। প্রতিদিনের শ্বাসপ্রশ্বাসের মতোই গৌরী ছিল তাঁর নিত্যসাথি। বন্ধু নীরদ চৌধুরীদের চেষ্টায় কিংবা পরে খুকু-সুপ্রভার ভালোবাসায়ও যে তাঁর দ্বিতীয় বিবাহ হয়ে ওঠেনি, তার কারণ ওই গৌরীই। নারী মানেই বিভূতিভূষণের কাছে গৌরী – তাঁর গুণ, তাঁর আদল, তাঁর অবিকল ছায়া। সেটা যতদিন কোনো নারীতে মেলেনি, ততদিন তিনিও বিমুখই থেকেছেন।
একমাত্র রমা ওরফে কল্যাণীর মাঝেই সে-রূপ পূর্ণতা লাভ করতে দেখি। বিভূতিভূষণ যেসব কথা আভাস-ইঙ্গিতে, অস্পষ্ট করে, পরোক্ষভাবে বলেছেন, তাতে সে-সত্যই ফুটে ওঠে। বিয়ের পরের একটা চিঠি, ‘মনে মনে কতদিন থেকে তোমার মতই মেয়ে চেয়েছিলুম – স্নেহময়ী, ভাবোচ্ছ্বাসময়ী, সেবাপরায়ণা, সুরসাধিকা … হয়তো বা বহুদূর অতীতের কোন জীবনে মধুর অলস দিনগুলিতে, অজ্ঞাত পথতলে, ভুলে যাওয়া গ্রামসীমার বেষ্টনীর মধ্যে তুমি ছিলে আমার জীবনসঙ্গিনী …।’ বিভূতিভূষণের অস্তিত্বে মিশে ছিল গৌরীই – হৃদয়ের পরতে পরতে গৌরীর অনুসরণন – রমার মাঝে যেন নতুন রূপে গৌরীর আবির্ভাব।
এরপর আমরা আরো প্রমাণ সংগ্রহের জন্য বিভূতিভূষণের গৌরী-উত্তর জীবনসংগ্রামের দিকে পুনরায় দৃষ্টি ফেরাব। বিভূতিভূষণের ব্যক্তি জীবনের ও অন্তরের গভীর রক্তপাতের সঙ্গে তাঁর জীবিকার সংগ্রামও ছিল কঠোর, নির্দয়। উপার্জনের পথ তাঁর সহজ ও মসৃণ ছিল না। একটা অবাঞ্ছিত, অপ্রীতিকর অবস্থা এড়াতে তিনি হরিনাভির চাকরি ছাড়লেন, কিন্তু চাকরি ছাড়া তো কপর্দকশূন্য বিভূতিভূষণের চলে না। খুঁজে আবার উপার্জনের পথ ধরতে হলো। এবারকার পথটা বেশ মজার – গোরক্ষিণী সভার প্রচারকের পদে চাকরি, বেতন মাসিক পঞ্চাশ টাকা। কেশোরাম পোদ্দার নামক জনৈক কোটিপতি মাড়োয়ারির অধীনে চাকরি। কাজ হলো, গরু জবাইয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে মুসলমানপ্রধান চট্টগ্রামের দক্ষিণ অঞ্চলে বক্তৃতা করে বেড়ানো। ফলে চাকরিসূত্রে বিভূতিভূষণ ফরিদপুর থেকে বরিশাল, ঝালকাঠি, অন্যদিকে চট্টগ্রাম, চন্দ্রনাথ, সীতাকুণ্ড, মহেশখালি, সোনাদিয়া দ্বীপ, মংডু ব্রহ্মদেশ, ব্রহ্মসীমান্তে আরাকান ইয়োমা, নোয়াখালী, আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা – কোথায় না ঘুরলেন। এসব ভ্রমণের সঙ্গে নতুন নতুন স্থানে গমন, বিচিত্রসব মানুষের সংস্পর্শলাভ, যেসব অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে সাহিত্য-সাধনায় তাঁর কাজে লেগেছিল। বিভূতিভূষণের বিভিন্ন জীবনীকারের বিবরণ থেকে জানা যায়, তিনি ভ্রমণপাগল ছিলেন, ভ্রমণ করতে ভালোবাসতেন। বিভিন্ন অঞ্চলে বনবাদাড়, পাহাড়-জঙ্গল ঘুরে ঘুরে প্রাণ দিয়ে সেসব উপভোগ করতেন। তরুণ বয়সে কি (বিশেষ করে গৌরীর মৃত্যুর আগে) বিভূতিভূষণের ভ্রমণপিপাসার কোনো পরিচয় আমরা পাই? আমি গভীরভাবে পরীক্ষা করে দেখেছি, তেমন নেশা তখন ছিল না। বিভূতিভূষণের অতীত তথা প্রথম জীবনের ঘটনাবলি পরীক্ষা করলে তার পরিচয় মেলে। তাহলে ভ্রমণের নেশা তাঁকে পেয়ে বসলো কেন? এ কি গৌরীর বিচ্ছেদ-দগ্ধ হৃদয়কে প্রশান্তি দেওয়ার প্রয়াস? আমার মনে হয়, গৌরীর অকালমৃত্যুর তাড়নাই তাঁর দেশভ্রমণে ইন্ধন জুগিয়েছে। গৌরীর মৃত্যুতে বিভূতিভূষণের জগৎটাই শূন্য হয়ে গিয়েছিল – তাঁর যৌবনের সব স্বপ্ন,
আশা-আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসা সব কর্পূরের মতো মিলিয়ে গিয়েছে। গৌরীর মৃত্যু-উত্তর বিভূতিভূষণের যে-জীবন, তা পুরোপুরি এলোমেলো, বিশৃঙ্খল, নৈরাজ্যভরা। স্মরণযোগ্য, বিভূতিভূষণের অপরাজিত উপন্যাসেও তার ছাপ আছে। সন্তান প্রসবকালে স্ত্রী অপর্ণার মৃত্যুতে অপুর যে দশা হয়েছিল, জীবন তছনছ হয়ে গিয়েছিল, তা তাঁর নিজের জীবনের ছায়ামাত্র। ফলে গৌরীর অভাবে কিসে দগ্ধ হৃদয়ে একটু শান্তি আসবে, কোথায় বিচ্ছেদব্যথা দূর হবে, মিলবে সুখ – তা উদ্ভ্রান্ত বিভূতিভূষণ ঠাহর করতে পারছেন না। তাই তো ভ্রমণ, দিগ্বিদিক ছুটে চলা – তাই তো বনবাদাড়ে, পাহাড়-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো।
গোরক্ষণী সভার চাকরির পর বিভূতিভূষণ ঢুকেছেন কলকাতার সিদ্ধেশ্বর ঘোষের জমিদারি সেরেস্তায়। প্রথমে জমিদারের ভাগনের গৃহশিক্ষকতা, পরে বিহারের ভাগলপুরের জঙ্গলমহলে এদের খেলাতচন্দ্র ঘোষ এস্টেটের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হয়ে যাওয়া। বিভূতিভূষণের এ-চাকরিটা আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকেই আরণ্যক উপন্যাসের উপাদান সংগৃহীত হয়। প্রকৃতির অপরূপ শোভা নিসর্গমুগ্ধ বিভূতিভূষণকে কি তীব্রভাবেই না টানে! ‘জগতের পেছনের যে নির্জন জগৎটা আছে, তা শুধু শান্ত সন্ধ্যায়, স্নিগ্ধ বনের লতাপাতার সুরভিতে ধরা দেয় – গভীর রাত্রের জোৎস্নায় আসে।’
ভাগলপুরের এই জঙ্গলমহলেই আরণ্যকের সূত্রপাত, মনে মনে তার রূপরেখার উদ্বোধন, যদিও উপন্যাসটি লেখা হয় বেশ পরে। আর বলতে কী, বিভূতিসাহিত্যে পথের পাঁচালী ও অপরাজিতর পর আরণ্যক সবচেয়ে স্মরণীয় কাজ। আরণ্যক মানুষের এক অভিনব জীবনালেখ্য।
বিভূতিভূষণের ওপর গৌরী গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, বিভূতিসাহিত্যের পাঠকমাত্রই তা জানেন। গৌরীর করুণ ও মধুর স্মৃতিকে তিনি নিবিড়ভাবে ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন, বিভূতিভূষণের জীবনের বাস্তব নিদর্শন থেকে তা প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করবো।
বিভূতিভূষণকে গৌরীর স্বহস্তে লেখা চিঠি, গৌরীর হাতে কারুকাজ করা হাতপাখা এসব বিভূতিভূষণ সারাজীবন পরম মমতায় আগলে রেখেছেন, বয়ে বেড়িয়েছেন। বিভূতিভূষণের ‘ঊর্মিমুখর’ দিনলিপিতে গৌরীর কাতর স্মৃতিচারণ, ‘আজ ৩১শে শ্রাবণ বলে মনটা মাঝে মাঝে অনেকদূর চলে যাচ্ছিল, অনেকদিন আগেকার এই সন্ধ্যা গৌধূলীর একটা ছবি পরপর আমার মনে আসছিল।’ স্মরণযোগ্য, ৩১শে (বা, ৩২শে শ্রাবণ) শ্রাবণ (১৩২৪ বঙ্গাব্দ) বিভূতিভূষণের বিবাহের দিন।
গৌরীর চিঠিগুলো এত অমূল্য যে, বিভূতিভূষণ কখনো কি তা খোয়াতে পারেন? এ-বিষয়ে তাঁর অকপট স্বীকারোক্তি, ‘… ওসব কি হারানো যায়।’ অন্তরঙ্গ বন্ধু নীরদ সি. চৌধুরী Biography of an unknown Indian গ্রন্থে তা আরো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন, ‘I always noticed a packet of papers in his breast pocket and an imbroiderd
hand-made fan by his Pillow, He never referred to them, nor did I ask. But I could easily guess that the pocket contained the few letters his wife had written to him and that the fan was made by her.’
সোনারপুর হরিনাভিতে চাকরিকালে যে ব্রাহ্মণ পরিবারে বিভূতিভূষণ থাকতেন, সেখানে জ্ঞান লাহিড়ীর ভাইঝি ফুলি তাঁর পকেটে ওই চিঠি আবিষ্কার করেছিলেন। বলা নিষ্প্রয়োজন, সে-চিঠির লেখিকাও প্রয়াত গৌরী। শুধু কি তাই? চিঠির সঙ্গে আবার শুকনো কিছু ফুলের পাপড়ি – উষ্ণ ফুলেল ভালোবাসা। গৌরী এমনভাবে তাঁকে অধিকার করে আছেন, যেখানে অন্য কোনো নারীর স্থান হওয়া সম্ভব নয়। গৌরীর চিঠি আগলে, গৌরীর হাতের সুন্দর পাখাটি বয়ে বেড়িয়েও সাধ মেটে না বিভূতিভূষণের। গৌরীকে অলৌকিক উপায়ে দেখার জন্য, তাঁর সান্নিধ্যলাভের জন্যও তিনি মরিয়া, থিওসফিক্যাল সোসাইটিতে সেজন্য তাঁর যাতায়াত। প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘অন দ্য সোল’ চক্রাধিবেশনে গৌরীর আত্মাকে ডেকে আনার প্রয়াস চলে নিরন্তর।
বিভূতিভূষণের জীবনটাই যাকে বলে গৌরীময়। যে সুশ্রী, সুন্দরী যুবতী গৌরী তাঁর অষ্টপ্রহরের ধ্যানজ্ঞান, তাঁর অস্তিত্বের অপরিহার্য অংশ, তার কোনো তুলনা নেই। সে একক, সে অদ্বিতীয়। গৌরীর মৃত্যুর কত পরেও গাঁয়ে কোন নতুন বউ এলে ন’দি যদি প্রশ্ন করেন, ‘হ্যারে, কেমন দেখলি বউ?’ বিভূতিভূষণ উত্তরে বলেন, গৌরী যেমন নীচুমুখে সন্ধেবেলায় তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালত, পায়ে তোড়া, মাথায় আঁচল, তেমন মুখ আর দেখলাম কই?’’
বিভূতিভূষণে প্রেম, প্রকৃতি আর সৌন্দর্য একাকার হয়ে আছে। ফুল ভালোবাসতেন বিভূতিভূষণ, সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন চাঁপাফুল। গোলাপ নয়, রজনীগন্ধা নয়, শিউলি, বকুলও নয় – চাঁপাফুল। এর সঙ্গেও একই রহস্য, গৌরীর সঙ্গে বিয়ের পর নবদম্পতির যে-ফুলশয্যা হয়েছিল, তাতে প্রধানত ছিল চাঁপাফুল। চাঁপাফুলের সৌন্দর্য আর সুগন্ধ হয়েই গৌরী বিভূতিভূষণের হৃদয়ে কড়া নাড়ে বারবার। পরিমল গোস্বামীর স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, কলকাতায় থাকতে বিভূতিভূষণ প্রতিদিন চাঁপাফুল কিনতেন। কেনার সময় একদিন পরিমল গোস্বামীর সামনে পড়ে যান, তাতে, ‘বিভূতিবাবু একটুখানি সলজ্জ হাসি হেসে বললেন, ‘রোজ কিনি।” সরল স্বীকারোক্তি, কোন কপটতা কি লুকোচুরি নেই। ভ্রাতৃবধূ যমুনা বন্দ্যোপাধ্যায়ও একইভাবে স্মৃতিচারণ করেছেন, ‘দিদির (রমা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণের দ্বিতীয় স্ত্রী) কাছে শুনেছি, ওঁদের ফুলশয্যার রাত্রে বড়ঠাকুর শুধু মার কথা ও প্রথম স্ত্রী গৌরীদির কথা বলেছিলেন এবং বলতে বলতে তাঁর চোখ জলে ভরে এসেছিল। দিদিও না কেঁদে থাকতে পারেননি। বড়ঠাকুর বলেছিলেন, জান কল্যাণী, গৌরীর ফুলশয্যা প্রচুর চাঁপাফুল দিয়ে হয়েছিল।’
এখানে লক্ষ করার মতো, দ্বিতীয় স্ত্রী রমা ওরফে কল্যাণীর কাছেও এ-দুর্বলতা লুকাতে পারেননি বিভূতিভূষণ, যদিও সেটা স্বাভাবিক না হওয়া সত্ত্বেও। যাই হোক, বিভূতিভূষণের ওই দুর্বলতার কারণেই রমা ও যমুনা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘাটশিলায় চাঁপাগাছ লাগিয়েছিলেন, গ্রামের বাড়ি বারাকপুরেও তা করেছিলেন রমা।
গৌরীর বয়স বাড়েনি, গৌরী বার্ধক্যের দিকে পা বাড়াননি – চিরযৌবনা, চিরতরুণী পনেরো বছরের ওই কিশোরী গৌরী সারাজীবন বিভূতিভূষণকে ব্যথা আর মুগ্ধতা দিয়ে বিবশ করে গেছেন। গৌরীর মৃত্যুই বিভূতিভূষণকে জীবনের সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। জলবেষ্টিত এক নির্জন দ্বীপে অধিষ্ঠিত করেছে, মনের গহিনে আত্মপ্রকাশের শক্তি জুগিয়েছে, আর সবশেষে করেছে লেখক। গৌরীর মৃত্যুর অনেক পরে ন’দির কাছ থেকে গৌরীর নিজের হাতে লেখা যে খাতাখানি তিনি পেয়েছিলেন, সে-খাতাও একইভাবে সারাজীবন রক্ষা করেছেন। এতকিছুর পরও, এতভাবে ভালোবেসে স্মরণ করার পরও, গৌরীর ঋণ যেন শোধ হয় না। তাই তো ঘাটশিলায় বিভূতিভূষণ অশোকগুপ্তের নিকট থেকে যে বাড়িটি কিনেছিলেন, (বাড়িটা ঠিক কেনাও নয়। আদর্শবাদী, জনসেবক ওই অশোক গুপ্ত বিভূতিভূষণের কাছ থেকে পাঁচশো টাকা ধার নিয়েছিলেন এবং তা শোধ করতে না পেরে বিভূতিভূষণকে ঘাটশিলার ওই বাড়িটা স্বেচ্ছায় জোর করে লিখে দিয়েছিলেন।), সে-বাড়িও হলো গৌরীর স্মৃতিতে ধন্য, সেখানেও গৌরী, বাড়িটা নাম পেল – ‘গৌরীকুঞ্জ’। গৌরী না থাক, গৌরীকুঞ্জ তো তবু গৌরীকে হৃদয়ে নিয়ে আসবে বারবার।
চব্বিশ বছর বয়সে যুবক বিভূতিভূষণ হারিয়েছেন পনেরো বছরের তন্বী গৌরীকে। সেই অদৃশ্য গৌরী পনেরো বছরেই আটকে থেকেছেন, পলে পলে বিভূতিভূষণকে পুড়িয়ে ছারখার করেছেন। সে-বেদনা, সে-হাহাকার, তার যেন শেষ নেই, তার কোনো উপশম নেই। এও তো সুবিদিত, আঘাতই অন্তরসত্তাকে জাগ্রত করে, নৈর্ব্যক্তিকতার জন্ম দেয়। সে-আঘাতের অভিঘাতেই আসে বিচ্ছিন্নতার গভীর বোধ, প্রশস্ত হয় শৈল্পিক সৃষ্টিশীলতার পথ। বাংলা সাহিত্যে এর আরো উদাহরণ আছে। মাত্র বিশ বছর বয়সে বঙ্কিমচন্দ্র প্রথম স্ত্রী ষোলো বছরের মোহিনীকে হারান। মোহিনীর অকালপ্রয়াণ বঙ্কিমকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল, আহত করেছিল, তাতে সন্দেহ নেই। পার্থক্য হলো, প্রবল ব্যক্তিত্ববান বঙ্কিম ভেতরে ভেতরে দগ্ধ হলেও বাইরে তাঁর প্রকাশ নিতান্ত অপ্রতুল। মনের সেই বিরামহীন রক্তক্ষরণকে বঙ্কিম প্রায় প্রকাশ্যে আনেননি, একা একাই সয়ে গিয়েছেন। কিন্তু বিঙ্কমেরই উত্তরসূরি, আর এক বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক সে-ব্যথাকে আত্মস্থ করতে পারেননি, পারেননি একাকিত্বে নিমজ্জিত হয়ে সে-যন্ত্রণাকে অতিক্রম করতে। বিভূতিভূষণের সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের পার্থক্য এখানে।
উল্লেখ্য, শরৎচন্দ্রের ক্ষেত্রেও এটি সত্য। বার্মায় বাসকালে স্ত্রী শান্তিদেবী ও পুত্রকে প্লেগে হারিয়ে শরৎচন্দ্রও একইভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলেন, দিশেহারা হয়েছিলেন। তিনিও সারাজীবন সে-বেদনার ভার বয়ে বেড়িয়েছেন।
গৌরী বিভূতিভূষণকে কখনো পরিত্যাগ করেননি – জীবনে নয়, মৃত্যুতেও নয়। জীবিত গৌরীর চেয়ে মৃত গৌরী বরং বেশি দীপ্যমান, বেশি অনুভবযোগ্য। কিছুতে বুঝতে পারেননি বিভূতিভূষণ, কিসে ভালোবাসার প্রতিদান হবে, কোন উপায়ে গৌরীর মৃত্যুকে চিরস্থায়ী করতে পারবেন। গৌরী চিরকালের জন্য চলে গেছেন – দিয়ে গেছেন শোক আর শক্তি, যে-শক্তিতে মানুষ বিভূতিভূষণের পুনর্জন্ম হয়েছে, আমরা পেয়েছি মহৎ জীবনশিল্পী বিভূতিভূষণকে। যে-গৌরী বিভূতিভূষণকে ব্যাকুল করেছেন, শিল্পী করেছেন, সেখানেও গৌরী একটা উজ্জ্বল আসন দাবি করেন বইকি। তাই তো পথের পাঁচালীর পর বিভূতিসাহিত্যে সবচেয়ে অবিস্মরণীয় যে কীর্তি, অপরূপ জীবনসংগীত, সেই আরণ্যক উপন্যাসকেই গৌরীর স্মৃতিতে উৎসর্গ করেছেন, ‘এই উপন্যাসখানি গৌরীকে দিলাম।’
তবু যদি সার্থক হয় গৌরীর স্মৃতিতর্পণ।
তথ্যসূত্র
১. বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় : রুশতী সেন
২. বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় : সুব্রত বড়ুয়া
৩. পথের কবি : কিশলয় ঠাকুর
৪. Thy Hand, Great Anarch : নীরদচন্দ্র চৌধুরী
৫. The Autobiography of an
Unknown Indian : নীরদচন্দ্র চৌধুরী